
১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাস নিয়ে আলোচনা হলেই সাধারণত একটি ধারণা সামনে আসে—সমগ্র আরব বিশ্ব নাকি এককাট্টাভাবে এই রাষ্ট্রের বিরোধিতা করেছিল। বাস্তবতা অবশ্য আরও জটিল। অধিকাংশ আরব নেতা ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করলেও তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন, যিনি প্রকাশ্যে না হলেও পর্দার আড়ালে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রাজনৈতিক কৌশল অনুসরণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন ট্রান্সজর্ডানের (বর্তমান জর্ডান) রাজা প্রথম আবদুল্লাহ।
ইতিহাসবিদদের কাছে রাজা আবদুল্লাহ এমন এক বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব, যিনি একদিকে আরব জাতীয়তাবাদের নেতা হিসেবে পরিচিত, অন্যদিকে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় তাঁর ভূমিকা নিয়ে সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে বিতর্ক চলছে। কেউ তাঁকে বাস্তববাদী রাষ্ট্রনায়ক বলেন, আবার কেউ আরব ঐক্যের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ তোলেন।
১৯৪৭: যখন ফিলিস্তিন ভাগের সিদ্ধান্ত হলো
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশরা ফিলিস্তিন শাসন চালিয়ে যেতে ব্যর্থ হয়। বিষয়টি জাতিসংঘে ওঠে। দীর্ঘ আলোচনার পর ১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে রেজোলিউশন ১৮১ গৃহীত হয়। এতে ফিলিস্তিনকে একটি ইহুদি রাষ্ট্র ও একটি আরব রাষ্ট্রে ভাগ করার প্রস্তাব দেওয়া হয় এবং জেরুজালেমকে আন্তর্জাতিক প্রশাসনের অধীনে রাখার কথা বলা হয়।
এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে ভোট দেয় অধিকাংশ আরব ও মুসলিম রাষ্ট্র। তাদের যুক্তি ছিল, ফিলিস্তিনের সংখ্যাগরিষ্ঠ আরব জনগণের মতামত উপেক্ষা করে একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা অন্যায় হবে।
কিন্তু ট্রান্সজর্ডানের রাজা আবদুল্লাহ প্রকাশ্যে কঠোর বিরোধিতা না করলেও গোপনে ভিন্ন হিসাব কষছিলেন।
গোল্ডা মেয়ারের সঙ্গে গোপন বৈঠক
ইসরায়েল রাষ্ট্র ঘোষণার কয়েক মাস আগে রাজা আবদুল্লাহর সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেন ইহুদি নেতৃত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি গোল্ডা মেয়ার, যিনি পরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হন।
সবচেয়ে আলোচিত বৈঠকটি হয় ১৯৪৮ সালের ১০ মে। ইতিহাসবিদদের মতে, সেই বৈঠকে উভয় পক্ষ সম্ভাব্য যুদ্ধ, সীমান্ত এবং পশ্চিম তীরের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করে।
রাজা আবদুল্লাহর প্রধান লক্ষ্য ছিল ফিলিস্তিনের পুরো আরব রাষ্ট্র গঠন নয়; বরং পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমকে তাঁর রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত করা। অন্যদিকে ইহুদি নেতৃত্বও বুঝতে পারছিল, যদি ট্রান্সজর্ডান সরাসরি সর্বাত্মক যুদ্ধ না করে, তাহলে তাদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা তুলনামূলক সহজ হবে।
এই কারণে ইতিহাসে এই বৈঠককে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গোপন রাজনৈতিক আলোচনা হিসেবে দেখা হয়।
কেন অন্য আরব নেতাদের থেকে ভিন্ন ছিলেন?
রাজা আবদুল্লাহর রাজনৈতিক দর্শন ছিল বাস্তববাদী।
তিনি বিশ্বাস করতেন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতনের পর ছোট ছোট আরব রাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাতের চেয়ে নিজের রাজ্যের শক্তি বৃদ্ধি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি দীর্ঘদিন ধরে “গ্রেটার সিরিয়া” গঠনের স্বপ্ন দেখতেন। সেই পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর তাঁর জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে মিশর, সিরিয়া, ইরাক ও সৌদি আরব চাইছিল স্বাধীন একটি ফিলিস্তিনি আরব রাষ্ট্র।
এই ভিন্ন কৌশলই আরব বিশ্বের মধ্যে বিভক্তির সৃষ্টি করে।
১৯৪৮ সালের যুদ্ধ
১৯৪৮ সালের ১৪ মে ইসরায়েল স্বাধীনতা ঘোষণা করে।
পরদিন মিশর, সিরিয়া, ইরাক, লেবানন এবং ট্রান্সজর্ডানসহ কয়েকটি আরব রাষ্ট্র যুদ্ধ শুরু করে।
তবে যুদ্ধের সময়ও ট্রান্সজর্ডানের আরব লিজিয়ন অন্যান্য আরব বাহিনীর তুলনায় অনেক বেশি সংগঠিত ছিল এবং তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম দখলে রাখা।
যুদ্ধ শেষে ঠিক সেটিই ঘটে।
১৯৪৯ সালের যুদ্ধবিরতির পর পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম ট্রান্সজর্ডানের নিয়ন্ত্রণে আসে এবং পরে সেগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে জর্ডানের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
বিশ্বাসঘাতক নাকি দূরদর্শী?
রাজা আবদুল্লাহকে নিয়ে বিতর্কের এখানেই শুরু।
ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদীরা মনে করেন, তিনি আরব ঐক্যের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে নিজের রাজ্য সম্প্রসারণে বেশি আগ্রহী ছিলেন।
অন্যদিকে অনেক গবেষকের মতে, তিনি বুঝেছিলেন যে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ঠেকানো বাস্তবে সম্ভব নয়। তাই তিনি সংঘাতের পরিবর্তে এমন একটি সমাধান খুঁজছিলেন, যাতে অন্তত তাঁর রাজ্যের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা পায়।
এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে বিতর্ক আজও শেষ হয়নি।
হত্যাকাণ্ড
১৯৫১ সালের ২০ জুলাই জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করতে গেলে রাজা আবদুল্লাহ আততায়ীর গুলিতে নিহত হন।
অনেক ঐতিহাসিকের মতে, তাঁর ইসরায়েলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে আপসকামী অবস্থানই তাঁকে হত্যার অন্যতম কারণ ছিল।
তাঁর মৃত্যুর পর জর্ডানের নীতিতেও বড় পরিবর্তন আসে।
ইতিহাসের শিক্ষা
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাত বুঝতে হলে শুধু যুদ্ধের ইতিহাস জানলেই হয় না; জানতে হয় পর্দার আড়ালের কূটনীতির ইতিহাসও।
রাজা আবদুল্লাহ সেই ইতিহাসের এমন এক চরিত্র, যিনি একই সঙ্গে প্রশংসিত, সমালোচিত এবং বিতর্কিত।
তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হয়তো মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস বদলে দিয়েছে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত আজও একটি প্রশ্ন রেখে যায়—রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় বাস্তববাদী আপস কি দূরদর্শিতা, নাকি ইতিহাসের বিচারে তা বিশ্বাসঘাতকতা?
ইতিহাসের উত্তর আজও একমুখী নয়।
তথ্যসূত্র
- United Nations General Assembly Resolution 181 (1947)
- Avi Shlaim, Collusion Across the Jordan
- Benny Morris, 1948: A History of the First Arab-Israeli War
- Eugene Rogan, The Arabs: A History
- Golda Meir, My Life
আপনার মতামত জানানঃ