প্রাচীন মিসরের ইতিহাস বলতে আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে আকাশছোঁয়া পিরামিড, রহস্যময় মমি, স্ফিংক্স, শক্তিশালী ফারাও এবং অসংখ্য প্রত্নসম্পদের ছবি। কিন্তু এই সভ্যতার আরেকটি অধ্যায় দীর্ঘদিন ধরেই ইতিহাসের আড়ালে রয়ে গেছে। প্রচলিত ধারণা ছিল, রাজপরিবারের নারীরা মূলত প্রাসাদের বিলাসবহুল জীবনে সীমাবদ্ধ ছিলেন। তাঁদের ভূমিকা ছিল ধর্মীয় আচার, রাজকীয় বংশধারা রক্ষা কিংবা কূটনৈতিক সম্পর্কের অংশ হওয়া। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণা সেই ধারণাকেই নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। গবেষণাটি ইঙ্গিত দিচ্ছে, প্রায় চার হাজার বছর আগে প্রাচীন মিসরের রাজকন্যারা শুধু ক্ষমতার প্রতীক ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন প্রশিক্ষিত ধনুর্বিদ, অস্ত্রচালনায় দক্ষ এবং প্রয়োজনে যুদ্ধক্ষেত্রে অংশ নেওয়ার মতো সক্ষম যোদ্ধা।
এই চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে দাহশুরে আবিষ্কৃত পাঁচ রাজকন্যা ও এক রাজার কঙ্কালের পুনঃবিশ্লেষণ থেকে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী Frontiers in Environmental Archaeology-তে। মিসরের বেনি-সুয়েফ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. জেইনাব হাশেশের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক ও শারীরবৃত্তীয় বিশ্লেষণের মাধ্যমে এমন সব তথ্য পাওয়া গেছে, যা প্রাচীন মিসরের সামাজিক ও সামরিক ইতিহাস সম্পর্কে নতুন আলো ফেলেছে।
এই গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি শুধু সমাধিতে পাওয়া অস্ত্রের ওপর নির্ভর করেনি; বরং মানুষের কঙ্কালকে ইতিহাসের সাক্ষ্য হিসেবে ব্যবহার করেছে। দীর্ঘদিন ধরে ইতিহাসবিদেরা সমাধিতে পাওয়া ধনুক, তীর, গদা কিংবা অলংকারখচিত ছুরিকে রাজকীয় মর্যাদার প্রতীক হিসেবেই বিবেচনা করতেন। কিন্তু এবার গবেষকেরা দেখিয়েছেন, সেই অস্ত্রগুলো কেবল প্রদর্শনের জন্য ছিল না। এগুলো নিয়মিত ব্যবহারের বাস্তব প্রমাণ লুকিয়ে ছিল রাজপরিবারের সদস্যদের হাড়ের ভেতরেই।
মানবদেহে দীর্ঘদিন একই ধরনের শারীরিক অনুশীলন করলে তার প্রভাব হাড়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একজন ধনুর্বিদ যখন বছরের পর বছর ধনুক টানেন, তখন শরীরের এক পাশের বাহু, কাঁধ ও কবজিতে অতিরিক্ত চাপ পড়ে। ফলে সেই অংশের হাড় ও পেশির সংযোগস্থলে বিশেষ ধরনের পরিবর্তন তৈরি হয়। গবেষকেরা রাজকন্যাদের কঙ্কালে ঠিক সেই বৈশিষ্ট্যই খুঁজে পেয়েছেন।
বিশেষ করে রাজকন্যা নুব-হোটেপের হাত ও কবজির হাড়ে দীর্ঘদিন ধনুক ব্যবহারের স্পষ্ট চিহ্ন দেখা গেছে। এমনকি তাঁর তালুর একটি হাড়ও দীর্ঘমেয়াদি চাপের কারণে সামান্য বাঁকা হয়ে গিয়েছিল। একইভাবে রাজকন্যা ইতাওয়েরেতের কাঁধ ও বুকের পেশির সংযুক্তিস্থলেও এমন পরিবর্তন ধরা পড়েছে, যা নিয়মিত অস্ত্রচর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অন্যদিকে রাজকন্যা ইতার হাতের শক্তিশালী গঠন থেকে ধারণা করা হচ্ছে, তিনি ছুরি বা কাছাকাছি দূরত্বে ব্যবহৃত অস্ত্র চালনায় পারদর্শী ছিলেন। আশ্চর্যের বিষয়, একই ধরনের অসম হাড়ের বিকাশ রাজা হোরের কঙ্কালেও পাওয়া গেছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে রাজপরিবারের নারী ও পুরুষ উভয়েই একই ধরনের সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতেন।
এই কঙ্কালগুলোর ইতিহাসও কম নাটকীয় নয়। ১৮৯৪ ও ১৮৯৫ সালে ফরাসি প্রত্নতাত্ত্বিক জ্যাক দ্য মরগান দাহশুরে খননকাজ চালিয়ে রাজকন্যা ইতা, খেনমেত, ইতাওয়েরেত, সম্ভবত সাতাথোরমেরিয়েত, নুব-হোটেপ এবং রাজা হোরের সমাধি আবিষ্কার করেন। পরে তাঁদের কঙ্কাল কায়রোর মিসরীয় জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হলেও ধীরে ধীরে সেগুলো বিস্মৃত হয়ে পড়ে। ২০২০ সালে গবেষকেরা জাদুঘরের বেসমেন্টে রাখা দুটি কাঠের বাক্স খুলে আবার এই কঙ্কালগুলো উদ্ধার করেন। বিস্ময়ের বিষয়, কিছু হাড় তখনও ১৮৯০-এর দশকের পুরোনো সংবাদপত্রে মোড়ানো অবস্থায় সংরক্ষিত ছিল।
আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে যখন এসব কঙ্কাল পুনরায় পরীক্ষা করা হয়, তখন ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকে এক বিস্ময়কর অতীত। গবেষকেরা উপলব্ধি করেন, এতদিন যে ইতিহাসকে অসম্পূর্ণভাবে পড়ানো হয়েছে, সেখানে নারীদের ভূমিকা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি।
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রাচীন মিসরের চিকিৎসাব্যবস্থা সম্পর্কে নতুন ধারণা। কঙ্কালগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, রাজপরিবারের সদস্যদের জীবন মোটেও সবসময় আরাম-আয়েশে কাটেনি। তাঁদের অনেকের হাড়ে শৈশবের অপুষ্টি, দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ, হাড় ক্ষয়, বিপাকজনিত চাপ এবং পুরোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। রাজকন্যা ইতাওয়েরেত একসময় পাঁজর ও পায়ের হাড়ে গুরুতর আঘাত পেয়েছিলেন বলেও গবেষকেরা ধারণা করছেন।
তবে এসব আঘাতের আরেকটি দিকও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভাঙা হাড়গুলো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে জোড়া লেগেছিল এবং কোথাও সংক্রমণ বা বিকৃতভাবে জোড়া লাগার কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, প্রায় চার হাজার বছর আগেই প্রাচীন মিসরে এমন উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা ছিল, যা ভাঙা হাড়ের সফল চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সক্ষম ছিল। এটি শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসেই নয়, মানবসভ্যতার বিকাশ সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যোগ করে।
এই গবেষণা ইতিহাসবিদদের কাছে একটি বড় শিক্ষা দিয়েছে। বহু বছর ধরে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা সমাধিতে পাওয়া স্বর্ণালংকার, রত্ন, অস্ত্র কিংবা মূল্যবান সামগ্রীকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু মানুষের কঙ্কাল যে অতীতের জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, স্বাস্থ্য, পেশা, দৈনন্দিন কাজ এবং সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য তথ্য দিতে পারে, এই গবেষণা তার শক্তিশালী উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
নারীর ভূমিকা নিয়ে ইতিহাসে যে একপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গি দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ছিল, সেটিও এই গবেষণার ফলে নতুনভাবে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে। পৃথিবীর বহু প্রাচীন সভ্যতায় নারীদের শুধুমাত্র গৃহস্থালি বা আনুষ্ঠানিক ভূমিকায় সীমাবদ্ধ করে দেখানো হয়েছে। অথচ বাস্তবে তাঁরা প্রশাসন, কূটনীতি, ধর্মীয় কার্যক্রম, এমনকি সামরিক ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন—এমন প্রমাণ ধীরে ধীরে সামনে আসছে।
প্রাচীন মিসরের রাজকন্যাদের এই নতুন পরিচয় শুধু ইতিহাসের একটি হারিয়ে যাওয়া অধ্যায় উদ্ধার করেনি; বরং আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে, অতীত সম্পর্কে অনেক ধারণাই এখনো অসম্পূর্ণ। প্রতিটি নতুন গবেষণা ইতিহাসকে নতুনভাবে লিখতে বাধ্য করছে। আজ যে নারীদের আমরা শুধু রাজমুকুট, অলংকার বা প্রাসাদের সঙ্গে কল্পনা করি, হয়তো তাঁরা বাস্তবে যুদ্ধক্ষেত্রে ধনুক হাতে দাঁড়িয়ে নিজেদের রাজ্য রক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন।
অতীতের প্রতিটি হাড়, প্রতিটি কঙ্কাল এবং প্রতিটি প্রত্নবস্তু যেন নীরবে বহন করে চলেছে হাজার বছরের গল্প। সেই গল্পগুলো পড়তে পারলে শুধু রাজা-রানির ইতিহাস নয়, একটি সভ্যতার বাস্তব জীবন, সংগ্রাম, দক্ষতা এবং মানবিক অভিজ্ঞতাও সামনে আসে। প্রাচীন মিসরের এই গবেষণা আবারও প্রমাণ করল, ইতিহাস কখনো স্থির নয়; নতুন প্রমাণের আলোয় তা প্রতিনিয়ত বদলে যায়। আর সেই পরিবর্তিত ইতিহাস আমাদের শেখায়, অতীতকে বুঝতে হলে শুধু কিংবদন্তি নয়, বিজ্ঞানের ভাষাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হয়।
আপনার মতামত জানানঃ