পশ্চিমবঙ্গে কোরবানির ঈদ বরাবরই ধর্মীয় আচার, সামাজিক সম্প্রীতি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। কলকাতার রেড রোডের বিশাল ঈদ জামাত থেকে শুরু করে মুর্শিদাবাদ, মালদা, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগণা কিংবা বীরভূমের পশুর হাট—সব মিলিয়ে ঈদুল আজহা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি একটি বৃহৎ সামাজিক ও অর্থনৈতিক ঘটনাও। কিন্তু ২০২৬ সালের কোরবানির ঈদ পশ্চিমবঙ্গে ছিল কিছুটা ভিন্ন। অনেকের কাছে এটি ছিল নিয়ম-কানুনের মধ্যে সীমাবদ্ধ এক ঈদ, আবার কারও কাছে ছিল পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার এক নতুন অভিজ্ঞতা।
ঈদের আগে থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে আলোচনা চলছিল গবাদিপশু জবাই সংক্রান্ত বিধিনিষেধ, প্রশাসনিক নির্দেশনা এবং পশুর সরবরাহ নিয়ে। বিশেষ করে গরু কোরবানিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। কলকাতার ট্যাংরা কসাইখানা, খিদিরপুর, মোমিনপুর কিংবা ইকবালপুরের মতো এলাকায় বহু বছরের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এবার ঈদের আগে সেই পরিচিত ব্যস্ততা দেখা যায়নি। যে জায়গাগুলোতে অন্যান্য বছর গরু, ছাগল ও দুম্বার অস্থায়ী বাজার বসত, সেসব স্থানে ছিল তুলনামূলক নীরবতা।
পশ্চিমবঙ্গ সরকার ১৯৫০ সালের প্রাণিসম্পদ সংক্রান্ত আইন কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশ দেওয়ার পর পরিস্থিতি আরও বদলে যায়। আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট বয়স, স্বাস্থ্যগত অবস্থা এবং সরকারি সনদের ভিত্তিতে পশু জবাইয়ের অনুমতি দেওয়া হয়। যদিও আইনটি নতুন নয়, তবে এর কঠোর প্রয়োগ বাজারে এক ধরনের সতর্কতা তৈরি করে। অনেক ব্যবসায়ী মনে করেন, আইনগত জটিলতা কিংবা প্রশাসনিক ঝামেলা এড়াতে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয় পক্ষই বেশি সতর্ক হয়ে ওঠেন।
কলকাতার ট্যাংরা এলাকার চিত্র ছিল সেই পরিবর্তনের প্রতীক। কসাইখানার সামনে যেখানে সাধারণত ঈদের এক সপ্তাহ আগে থেকেই ভিড় লেগে থাকত, সেখানে এবার দেখা যায় অনেকটা ফাঁকা পরিবেশ। কর্মীরা জানিয়েছেন, অন্যান্য বছর যে শেডে ডজন ডজন গরু রাখা হতো, সেখানে এবার পশুর সংখ্যা ছিল খুবই কম। বহু বছরের কর্মজীবনে এমন পরিস্থিতি তারা আগে খুব কমই দেখেছেন।
এই পরিবর্তনের আরেকটি কারণ ছিল পশুর সরবরাহ সংকট। পশ্চিমবঙ্গে কোরবানির জন্য ব্যবহৃত অনেক গরু আসে উত্তর প্রদেশসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে। পরিবহন সংক্রান্ত কড়াকড়ি, তল্লাশি এবং প্রশাসনিক নজরদারির কারণে ব্যবসায়ীদের একটি অংশ ঝুঁকি নিতে চাননি। ফলে বাজারে গরুর সংখ্যা কমে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে ক্রেতাদের ওপর। অনেক পরিবার, যারা প্রতিবছর গরু কোরবানি দিতেন, তারা এবার ছাগল বা খাসি বেছে নেন।
ফলে ছাগল ও দুম্বার বাজারে দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। কলকাতার নারকেলডাঙার বিখ্যাত ‘বকরি মার্কেট’-এ ক্রেতাদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। ব্যবসায়ীরা জানান, গরুর পরিবর্তে ছাগলের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দামও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। উত্তর প্রদেশ থেকে আসা ব্যবসায়ীদের অনেকেই বলেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার ছাগল বিক্রি করে তারা বেশি লাভ করেছেন।
তবে শুধু ব্যবসায়ীরাই নন, সাধারণ মানুষও পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিয়েছেন। অনেকেই মনে করেছেন, কোরবানির মূল শিক্ষা ত্যাগ ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। পশুর ধরন নয়, বরং নিয়ত এবং সামর্থ্যই এখানে মুখ্য বিষয়। তাই গরুর পরিবর্তে ছাগল কোরবানি দিয়েও ধর্মীয় কর্তব্য পালনে তারা কোনো ঘাটতি দেখেননি।
এবারের ঈদকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে কলকাতার প্রধান ঈদ জামাতের স্থান পরিবর্তনের ঘটনাও। দীর্ঘদিন ধরে রেড রোডে অনুষ্ঠিত হওয়া বৃহৎ ঈদ জামাত এবার প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে। এই পরিবর্তন নিয়ে শুরুতে নানা আলোচনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত হাজার হাজার মুসল্লির উপস্থিতিতে শান্তিপূর্ণভাবে নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজকরা মাঠজুড়ে লাউডস্পিকার, অস্থায়ী শৌচাগার এবং পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করেন। নিরাপত্তা ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনও বিশেষ উদ্যোগ নেয়।
ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত এই জামাত অনেকের কাছে ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে। একদিকে এটি ছিল নতুন বাস্তবতার প্রতীক, অন্যদিকে মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় চর্চার ধারাবাহিকতাও বজায় রেখেছে। নামাজ শেষে মুসল্লিরা একে অপরকে শুভেচ্ছা জানান, কোলাকুলি করেন এবং পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করেন। ফলে স্থান পরিবর্তন হলেও উৎসবের মূল আবহ অটুট ছিল।
পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায়ও ঈদের চিত্র ছিল প্রায় একই রকম। মুর্শিদাবাদ, মালদা, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগণা এবং বীরভূমের অনেক এলাকায় গরুর হাটে আগের মতো জমজমাট পরিবেশ দেখা যায়নি। অনেক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, তারা যে পরিমাণ বিক্রির আশা করেছিলেন, তা পূরণ হয়নি। বিশেষ করে ছোট ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে জানান।
অন্যদিকে কিছু কৃষক ও পশুপালকও সমস্যার মুখে পড়েন। তারা আশা করেছিলেন ঈদের আগে গরু বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ বা সংসারের প্রয়োজন মেটাবেন। কিন্তু বাজারের অনিশ্চয়তা তাদের পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলে। ফলে কোরবানির ঈদের অর্থনৈতিক দিকটি এবার অনেকের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তবে পুরো চিত্রটি কেবল হতাশার নয়। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সমাজ পরিস্থিতিকে অত্যন্ত সংযম ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে মোকাবিলা করেছে। কোথাও বড় ধরনের উত্তেজনা বা বিশৃঙ্খলা দেখা যায়নি। ধর্মীয় আচার পালনের পাশাপাশি আইন মেনে চলার প্রবণতাও ছিল স্পষ্ট।
কলকাতার নাখোদা মসজিদের ইমামসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ব্যক্তিত্বও মুসলিমদের শান্তিপূর্ণভাবে ঈদ উদযাপনের আহ্বান জানান। তারা জোর দেন সামাজিক সম্প্রীতি, সহনশীলতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ওপর। অনেক মুসল্লি মনে করেন, ঈদের প্রকৃত শিক্ষা হলো আত্মত্যাগ, মানবতা এবং দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো। তাই কোরবানির পশু নিয়ে বিতর্কের চেয়ে উৎসবের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ঈদের দিন পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় পরিবারগুলো একত্রিত হয়, আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে যাতায়াত করে এবং কোরবানির মাংস প্রতিবেশী ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে বিতরণ করে। শহর ও গ্রাম—উভয় ক্ষেত্রেই এই সামাজিক বন্ধনের চিত্র ছিল স্পষ্ট। বহু পরিবার সীমিত সামর্থ্য নিয়েও উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করেছে।
২০২৬ সালের কোরবানির ঈদ তাই পশ্চিমবঙ্গে এক বিশেষ অভিজ্ঞতার নাম। এটি যেমন প্রশাসনিক নীতি, আইন এবং বাজার ব্যবস্থার প্রভাবকে সামনে নিয়ে এসেছে, তেমনি মানুষের অভিযোজন ক্ষমতাও তুলে ধরেছে। গরুর বাজারে মন্দা, ছাগলের চাহিদা বৃদ্ধি, প্রধান ঈদ জামাতের স্থান পরিবর্তন এবং ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ—সবকিছু মিলিয়ে এবারের ঈদ ছিল ব্যতিক্রমী।
তবুও শেষ পর্যন্ত উৎসব থেমে থাকেনি। পরিবর্তিত পরিস্থিতির মধ্যেও মানুষ তাদের ধর্মীয় কর্তব্য পালন করেছে, পরিবার ও সমাজের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করেছে এবং শান্তিপূর্ণভাবে ঈদ উদযাপন করেছে। হয়তো বাজারের চেহারা বদলেছে, হয়তো পুরোনো কিছু ঐতিহ্যে পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু ঈদুল আজহার মূল বার্তা—ত্যাগ, সহমর্মিতা এবং মানবিকতা—পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের জীবনে আগের মতোই অটুট থেকেছে।
এই কারণেই ২০২৬ সালের কোরবানির ঈদ পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব হিসেবে নয়, বরং পরিবর্তিত সামাজিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতার মধ্যে মানুষের মানিয়ে নেওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবেও স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
আপনার মতামত জানানঃ