ইতিহাসের অনেক মহান অভিযাত্রীর নাম আমরা জানি। কেউ নতুন মহাদেশ আবিষ্কার করেছেন, কেউ সমুদ্রপথ খুলে দিয়েছেন, কেউ অজানা ভূখণ্ডের মানচিত্র এঁকেছেন। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় এমনও কিছু মানুষ আছেন, যাদের অবদান বিশাল হলেও তাদের নাম প্রায় হারিয়ে গেছে সময়ের অন্ধকারে। এমনই এক বিস্ময়কর চরিত্র এস্টেভানিকো—একজন আফ্রিকান দাস, যিনি প্রায় পাঁচশ বছর আগে উত্তর আমেরিকার বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড পায়ে হেঁটে অতিক্রম করেছিলেন এবং যাকে অনেক ইতিহাসবিদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মহান অভিযাত্রীদের একজন বলে মনে করেন।
তার জীবনের গল্প যেন রোমাঞ্চ, বেদনা, সংগ্রাম এবং বিস্ময়ের এক অনন্য সংমিশ্রণ। তিনি কোনো রাজা ছিলেন না, কোনো সেনাপতি ছিলেন না, এমনকি স্বাধীন মানুষও ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন দাস। তবুও তার যাত্রা ইতিহাসের বহু বিখ্যাত অভিযাত্রীর গল্পকেও হার মানায়।
১৫২৮ সালের কথা। মরক্কো থেকে আসা এক ব্যক্তি বর্তমান টেক্সাস উপকূলে এসে ভেসে ওঠেন। তিনি তখন প্রায় মৃত্যুর মুখে। তার শরীর ছিল ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত এবং বিধ্বস্ত। কয়েক সপ্তাহ ধরে তিনি মেক্সিকো উপসাগরে একটি অস্থায়ী ভেলায় ভেসে বেড়িয়েছিলেন। সেই ভেলা তৈরি হয়েছিল গাছের গুঁড়ি, ঘোড়ার চামড়া এবং ছেঁড়া কাপড় দিয়ে। তার সঙ্গে ছিলেন কয়েকজন স্প্যানিশ নাবিক।
একটি ভয়ংকর ঝড় তাদের ভেলাকে টেক্সাসের গ্যালভেস্টন অঞ্চলের কাছে একটি দ্বীপে আছড়ে ফেলে। সেখানেই শুরু হয় মানব সহনশীলতার এক অবিশ্বাস্য পরীক্ষা। অভিযানে অংশ নেওয়া প্রায় ছয়শ মানুষের মধ্যে অধিকাংশই ইতোমধ্যে মারা গিয়েছিলেন। কেউ ঝড়ে, কেউ রোগে, কেউ অনাহারে, আবার কেউ স্থানীয় আদিবাসীদের আক্রমণে প্রাণ হারান।
শেষ পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন মাত্র চারজন। তিনজন স্প্যানিশ কর্মকর্তা এবং একজন আফ্রিকান দাস। সেই দাসই ছিলেন এস্টেভানিকো।
তার প্রকৃত নাম কী ছিল, ইতিহাস নিশ্চিতভাবে জানে না। কেউ তাকে এস্টেবান দে দোরান্তেস বলে উল্লেখ করেছেন, কেউ বলেছেন এস্টেবান দ্য মুর। তবে সবচেয়ে পরিচিত নাম এস্টেভানিকো। তিনি ছিলেন উত্তর আমেরিকায় প্রবেশকারী প্রথমদিকের আফ্রিকানদের একজন, প্রথমদিকের আরবি ভাষাভাষী মানুষদের একজন এবং সম্ভবত প্রথমদিকের মুসলিমদের একজন।
ইতিহাসবিদদের মতে, তিনি বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে ইউরোপীয়দের প্রথম স্থায়ী বসতি স্থাপনের প্রায় চার দশক আগেই সেখানে পৌঁছেছিলেন। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, তিনি ১৫২৮ থেকে ১৫৩৬ সালের মধ্যে প্রায় ৩,৬০০ কিলোমিটারেরও বেশি পথ হেঁটে ফ্লোরিডা অঞ্চল থেকে মেক্সিকোর প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল পর্যন্ত পৌঁছান। অনেকের মতে, এটিই উত্তর আমেরিকা মহাদেশ অতিক্রম করার প্রথম নথিভুক্ত ঘটনা।
যে কাজটি পরবর্তীকালে লুইস ও ক্লার্কের মতো বিখ্যাত অভিযাত্রীরা করেছিলেন, এস্টেভানিকো সেটি প্রায় তিনশ বছর আগেই সম্পন্ন করেছিলেন।
কিন্তু তার যাত্রা শুধু ভৌগোলিক অভিযান ছিল না। এটি ছিল বেঁচে থাকার যুদ্ধ।
মরক্কোর আজেম্মুর শহরে জন্ম নেওয়া এস্টেভানিকো ছোটবেলাতেই দাসত্বের শিকার হন। স্প্যানিশ অভিজাত আন্দ্রেস দোরান্তেস তাকে কিনে নেন। পরে তাকে স্পেনের নতুন পৃথিবী জয় করার অভিযানে সঙ্গে নেওয়া হয়।
তখন মুসলমানদের আমেরিকায় সরকারি অভিযানে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ ছিল। তাই তাকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করা হয় এবং নতুন নাম দেওয়া হয়—এস্টেভানিকো।
১৫২৭ সালে পাঁচটি জাহাজে করে শুরু হওয়া অভিযানের শুরু থেকেই দুর্ভাগ্য যেন তাদের পিছু নিয়েছিল। ক্যারিবীয় অঞ্চলে ঝড়, রোগ এবং দুর্ঘটনায় একের পর এক মানুষ মারা যায়। শেষ পর্যন্ত তারা ফ্লোরিডা উপকূলে পৌঁছালেও পরিস্থিতি আর স্বাভাবিক হয়নি।
অভিযানের নেতা প্যানফিলো দে নারভায়েজ স্থলপথে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেন। জলাভূমি, মশা, রোগ এবং আদিবাসীদের প্রতিরোধের মুখে অভিযাত্রীরা দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে। খাদ্যের সংকটে তারা নিজেদের ঘোড়াও জবাই করে খেয়ে ফেলে।
শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকার আশায় তারা কয়েকটি অস্থায়ী ভেলা তৈরি করে মেক্সিকোর দিকে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু সেই ভেলাগুলোও ঝড়ের মুখে টিকতে পারেনি।
গ্যালভেস্টন অঞ্চলে পৌঁছানোর পর এস্টেভানিকোর জীবনে শুরু হয় নতুন অধ্যায়। তাকে স্থানীয় আদিবাসীরা বন্দি করে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, পুরোনো বিশ্বের সবচেয়ে নিচু সামাজিক অবস্থানে থাকা এই মানুষটিই নতুন পৃথিবীতে সবচেয়ে ভালোভাবে টিকে থাকতে সক্ষম হন।
এর পেছনে ছিল তার ভাষাগত দক্ষতা এবং মানিয়ে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা।
মরক্কোয় বেড়ে ওঠার কারণে তিনি তামাজাইট, আরবি ও পর্তুগিজ ভাষা জানতেন। দাস হিসেবে স্প্যানিশ মালিকের সঙ্গে থাকার ফলে স্প্যানিশও শিখেছিলেন। পরে তিনি আদিবাসীদের ভাষাও আয়ত্ত করেন।
যখন অন্যরা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হচ্ছিলেন, তখন এস্টেভানিকো তাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলছিলেন। তিনি শুধু ভাষা শিখেননি, তাদের সংস্কৃতি, রীতিনীতি এবং জীবনযাত্রাও বুঝে নিয়েছিলেন।
প্রায় পাঁচ বছর বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে শ্রমিক হিসেবে কাটানোর পর তিনি ধীরে ধীরে মুক্তির পথ খুঁজে পান। পরে বাকি তিনজন স্প্যানিশ জীবিত সদস্যের সঙ্গে আবার একত্রিত হন।
এরপর শুরু হয় তাদের দীর্ঘ পদযাত্রা।
তারা এক সম্প্রদায় থেকে অন্য সম্প্রদায়ে ঘুরে বেড়াতে থাকেন। পথ চিনতে, যোগাযোগ করতে এবং নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে এস্টেভানিকোই ছিলেন প্রধান ভরসা। তিনিই ছিলেন দোভাষী, পথপ্রদর্শক, মধ্যস্থতাকারী এবং তথ্য সংগ্রাহক।
ধীরে ধীরে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে একজন চিকিৎসক বা অলৌকিক নিরাময়কারী হিসেবে।
একবার এক অসুস্থ নারী তাদের কাছে চিকিৎসা চাইলে তারা ধর্মীয় আচার এবং স্থানীয় বিশ্বাসের মিশ্রণে তাকে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করেন। ঘটনাটি সফল বলে মনে হলে খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
ফলে বিভিন্ন আদিবাসী গোষ্ঠী তাদের খুঁজে বের করতে শুরু করে। অনেকেই তাদের অনুসরণ করত। এস্টেভানিকো প্রায়ই সবার আগে যেতেন। হাতে থাকত শুকনো লাউ দিয়ে তৈরি ঝুনঝুনি, পায়ে বাঁধা থাকত ঘণ্টা, শরীরে থাকত শাঁসের অলংকার।
তিনি যেন এক ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসক, দূত এবং অভিযাত্রী—সবকিছুর সমন্বয় হয়ে উঠেছিলেন।
১৫৩৬ সালে তারা অবশেষে মেক্সিকো সিটিতে পৌঁছান। কিন্তু এখানেই তার অভিযান শেষ হয়নি।
তখন স্প্যানিশ শাসকেরা উত্তরাঞ্চলে সোনার কিংবদন্তিতুল্য সাতটি শহরের সন্ধান করছিলেন। আদিবাসীদের কাছ থেকে শোনা গল্পে তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন যে উত্তরের মরুভূমিতে বিপুল সম্পদে ভরা শহর রয়েছে।
এই অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আবারও এস্টেভানিকোকেই বেছে নেওয়া হয়।
১৫৩৯ সালে তিনি নতুন এক অভিযানে উত্তর দিকে রওনা হন। এবার তার গন্তব্য বর্তমান নিউ মেক্সিকো এবং অ্যারিজোনা।
গলায় ফিরোজা পাথরের অলংকার, মাথায় পালক আর হাতে অভিযাত্রীর সরঞ্জাম নিয়ে তিনি স্প্যানিশ দলের অনেকটা সামনে থাকতেন। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করতেন এবং বার্তাবাহকের মাধ্যমে পেছনের দলকে খবর পাঠাতেন।
গুরুত্ব অনুযায়ী তিনি বিভিন্ন আকারের ক্রুশ পাঠাতেন। ছোট তথ্যের জন্য ছোট ক্রুশ, গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের জন্য মাঝারি ক্রুশ, আর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খবরের জন্য বড় ক্রুশ।
একদিন তিনি মানুষের সমান উঁচু একটি বিশাল ক্রুশ পাঠান। এতে স্প্যানিশরা উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। তারা মনে করে, হয়তো বহু প্রতীক্ষিত সোনার শহরের সন্ধান মিলেছে।
কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।
বর্তমান নিউ মেক্সিকোর জুনি জনগোষ্ঠীর এলাকায় প্রবেশ করার পর এস্টেভানিকো নিহত হন। ধারণা করা হয়, স্থানীয় আদিবাসীরা তাকে হত্যা করেছিল। তার মৃত্যুর সঠিক কারণ আজও ইতিহাসের রহস্য হয়ে আছে।
তবে মৃত্যুর পরও তার প্রভাব শেষ হয়নি।
তার অভিযানের তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী স্প্যানিশ অভিযানগুলো পরিচালিত হয়। তার পথ অনুসরণ করেই স্প্যানিশরা টেক্সাস, নিউ মেক্সিকো এবং অ্যারিজোনা অঞ্চলে প্রবেশ করে। পরবর্তীকালে এসব অঞ্চল স্প্যানিশ উপনিবেশ বিস্তারের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
তবুও দীর্ঘ সময় ধরে এস্টেভানিকোর নাম প্রায় বিস্মৃত ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত ইতিহাসে তার জন্য খুব বেশি জায়গা ছিল না। কারণ তিনি প্রচলিত নায়ক নন। তিনি কোনো বিজেতা ছিলেন না। আবার পরাজিতদেরও অংশ ছিলেন না।
তিনি ছিলেন মাঝামাঝি কোথাও।
একজন আফ্রিকান। একজন মুসলিম। একজন দাস। একজন অভিযাত্রী। একজন বেঁচে থাকা মানুষ।
সম্ভবত এই কারণেই তার গল্প ইতিহাসের প্রচলিত কাঠামোয় সহজে খাপ খায়নি।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন জাদুঘর, স্মৃতিস্তম্ভ এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান এখন তার অবদানকে নতুন করে তুলে ধরছে। টেক্সাসে তার মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। ইতিহাস জাদুঘরগুলোতে তার যাত্রার গল্প প্রদর্শিত হচ্ছে। গবেষকরা নতুন করে তার জীবন বিশ্লেষণ করছেন।
আজ এস্টেভানিকো শুধু একজন বিস্মৃত অভিযাত্রীর নাম নয়। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে ইতিহাস সবসময় রাজা-সম্রাট বা বিজয়ীদের হাতে লেখা হয় না। কখনও কখনও ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অধ্যায়গুলো রচনা করেন সেই মানুষরা, যাদের নাম প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছিল।
একজন দাস হয়েও তিনি মহাদেশ পেরিয়েছিলেন। একজন বহিরাগত হয়েও তিনি সংস্কৃতির সেতুবন্ধন তৈরি করেছিলেন। আর একজন ভুলে যাওয়া মানুষ হয়েও তিনি উত্তর আমেরিকার ইতিহাসে এমন একটি পথ তৈরি করে গেছেন, যার ওপর দাঁড়িয়ে পরবর্তী শতাব্দীগুলো গড়ে উঠেছে।
এস্টেভানিকোর গল্প তাই শুধু অতীতের নয়। এটি মানব সহনশীলতা, অভিযোজন এবং অজানাকে জয় করার এক অনন্ত কাহিনি।
আপনার মতামত জানানঃ