বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা নামটি শুধু একটি রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বরং কয়েক দশকের ক্ষমতা, আন্দোলন, সংঘাত, রাষ্ট্র পরিচালনা এবং বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। এক সময়ের টানা ক্ষমতাধর প্রধানমন্ত্রী এখন দেশের বাইরে অবস্থান করছেন, তার দল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ, নিবন্ধন স্থগিত, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে, দুর্নীতির মামলাও চলছে। এমন বাস্তবতায় সম্প্রতি ভারতীয় একটি গণমাধ্যমে শেখ হাসিনার “শিগগিরই দেশে ফেরার” ইঙ্গিত নতুন করে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার ঝড় তুলেছে। প্রশ্ন উঠেছে—আসলে কি শেখ হাসিনা ফিরতে পারবেন? আওয়ামী লীগ কি আবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় হতে পারবে? নাকি চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাদের অধ্যায় শেষ হয়ে গেছে?
২০২৪ সালের পাঁচই আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় এক মোড় পরিবর্তনের দিন হয়ে আছে। দীর্ঘদিনের আন্দোলন, গণবিক্ষোভ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে শেখ হাসিনা ক্ষমতা হারিয়ে দেশ ছাড়েন। এরপর দ্রুত বদলে যেতে থাকে রাজনৈতিক বাস্তবতা। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ, দমন-পীড়ন, গুম, হত্যা ও দুর্নীতির নানা অভিযোগ সামনে আসে। অন্তর্বর্তী সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে জুলাইয়ের ঘটনাগুলোর বিচার শুরু করে। একইসঙ্গে নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয় এবং দলটির নিবন্ধন স্থগিত করা হয়। ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি আওয়ামী লীগ।
এই প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে আলোচনা কেবল একটি ব্যক্তির প্রত্যাবর্তনের প্রশ্ন নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণেরও বড় একটি প্রশ্ন। কারণ আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল। স্বাধীনতার ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক ঐতিহ্যের কারণে দলটির একটি বড় ভোটব্যাংক ও সাংগঠনিক ভিত্তি রয়েছে। ফলে আইনি নিষেধাজ্ঞা থাকলেও জনসমর্থনের বাস্তবতা পুরোপুরি মুছে যায়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, আওয়ামী লীগকে ভোটের মাধ্যমে পরাজিত করা হয়নি; বরং প্রশাসনিক ও নির্বাহী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দলটির কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছে। এই জায়গাটিই ভবিষ্যতের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ একটি দলকে রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ করা গেলেও জনগণের সমর্থন পুরোপুরি মুছে ফেলা কঠিন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর আগেও নিষিদ্ধ দল আবার ফিরে এসেছে। জামায়াতে ইসলামী একাধিকবার নিষিদ্ধ হওয়ার পরও রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছে। ফলে আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও “কামব্যাক” অসম্ভব নয় বলে মনে করছেন অনেকে।
তবে শেখ হাসিনার সামনে আইনি বাধা সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। আইন অনুযায়ী, দণ্ডপ্রাপ্ত কোনো পলাতক ব্যক্তি দেশে ফিরলে প্রথমেই তাকে আত্মসমর্পণ করতে হবে। এরপর তিনি আপিলের সুযোগ পাবেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির খালাস পাওয়ার নজির রয়েছে। কিন্তু শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে বিষয়টি শুধু আইনের নয়, বরং রাজনৈতিক আবেগ, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং রাষ্ট্রীয় অবস্থানের সঙ্গেও জড়িত।
বর্তমান বিএনপি সরকার বারবার বলছে, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আইনের মুখোমুখি করতে চায় তারা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকেও জানানো হয়েছে, ভারত সরকারের কাছে প্রত্যর্পণের অনুরোধ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হলো, ভারত কি শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠাবে? কারণ দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে শেখ হাসিনা দীর্ঘদিন ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার সরকারের সময় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছিল। সীমান্ত, নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ, বাণিজ্যসহ নানা ইস্যুতে দুই দেশের সম্পর্ক গভীর হয়েছিল। ফলে শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ওপর নির্ভর করছে না; এটি আঞ্চলিক কূটনীতির সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে।
ভারতে অবস্থান করেও শেখ হাসিনা নীরব নেই। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও ভারতীয় গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে তিনি গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও রাজনৈতিক অধিকারের প্রসঙ্গ তুলছেন। আওয়ামী লীগের নেতারাও দাবি করছেন, বর্তমান বিচার প্রক্রিয়া রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তারা চব্বিশের পর দেওয়া সব রায় বাতিলের দাবিও তুলছেন।
অন্যদিকে বিএনপি ও তাদের মিত্ররা বলছে, আওয়ামী লীগ শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়, বরং “ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার” প্রতীক হয়ে উঠেছিল। তাদের মতে, বিচার ছাড়া আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ দেওয়া উচিত হবে না। জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন ইসলামপন্থী দলও একই অবস্থান নিয়েছে। তারা মনে করে, শেখ হাসিনাকে আগে বিচার ও সাজা মোকাবিলা করতে হবে।
কিন্তু রাজনীতির বাস্তবতা অনেক সময় আদালতের বাস্তবতার চেয়েও জটিল। ইতিহাস বলে, বাংলাদেশে রাজনীতিতে স্থায়ী শত্রু বা স্থায়ী মিত্র বলে কিছু নেই। যে দল আজ নিষিদ্ধ, ভবিষ্যতে তারাই আবার ক্ষমতায় এসেছে—এমন উদাহরণও কম নয়। ফলে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়েও পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে কিছু বলা কঠিন।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনমানস। আওয়ামী লীগের শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ যেমন ছিল, তেমনি দলটির সমর্থকও এখনো বিপুলসংখ্যক রয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ পর্যায়ে দলটির সাংগঠনিক ভিত্তি পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ঝটিকা মিছিল এবং বিভিন্ন অনলাইন প্রচারণায় আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের সক্রিয়তা এখনো দেখা যায়। অনেকেই মনে করেন, যদি রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়, তাহলে আওয়ামী লীগ আবারও সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের সাম্প্রতিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টও নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। সেখানে তিনি দাবি করেছেন, সরকারের ভেতরের দুর্বলতা এবং প্রশাসনিক নির্ভরতা আওয়ামী লীগের সক্রিয় হওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। তার বক্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। কারণ এটি ইঙ্গিত দেয় যে, আওয়ামী লীগের প্রভাব পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত প্রভাবও বড় একটি বিষয়। আওয়ামী লীগের ভেতরে এখনো তার বিকল্প নেতৃত্ব স্পষ্ট নয়। ফলে দলটি যদি আবার রাজনীতিতে ফিরে আসতে চায়, তাহলে শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করেই সেই চেষ্টা হবে—এমন ধারণা অনেকের। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তিনি কি শারীরিকভাবে, রাজনৈতিকভাবে এবং কূটনৈতিকভাবে সেই প্রত্যাবর্তনের অবস্থানে আছেন?
এখানে আরেকটি বাস্তবতা হলো আন্তর্জাতিক চাপ। মানবাধিকার, বিচার এবং রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে আন্তর্জাতিক মহল বাংলাদেশের পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে। কোনো বড় রাজনৈতিক দলকে দীর্ঘমেয়াদে নিষিদ্ধ রাখলে গণতন্ত্রের প্রশ্ন উঠতে পারে। আবার বিচারপ্রক্রিয়া যদি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে দেখা যায়, তাহলে সেটিও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। ফলে সরকারকেও ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে রাজনৈতিক পুনরুত্থানের ঘটনা নতুন নয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন কোণঠাসা ছিল, কিন্তু পরে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে। বিএনপিও বিভিন্ন সময় দমন-পীড়নের মুখে পড়েছে, কিন্তু রাজনীতি থেকে হারিয়ে যায়নি। ফলে আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও “শেষ” শব্দটি এখনই উচ্চারণ করতে নারাজ বিশ্লেষকদের বড় অংশ।
তবে এটিও সত্য যে, আওয়ামী লীগের সামনে এখন সবচেয়ে বড় সংকট বিশ্বাসযোগ্যতা। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, সেটি সহজে মুছে যাওয়ার নয়। গুম, হত্যা, দমন-পীড়ন, ভোট বিতর্ক এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নিয়ে মানুষের একাংশের ক্ষোভ এখনো প্রবল। ফলে দলটি যদি ভবিষ্যতে ফিরতেও চায়, তাহলে তাদের বড় ধরনের আত্মসমালোচনা ও রাজনৈতিক পুনর্গঠন প্রয়োজন হবে।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে এখনকার আলোচনা তাই কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাবর্তনের প্রশ্ন নয়। এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গণতন্ত্র, বিচারব্যবস্থা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার চরিত্র নিয়ে বড় এক বিতর্কের অংশ। তিনি ফিরবেন কি ফিরবেন না, সেটি সময়ই বলে দেবে। কিন্তু এটুকু নিশ্চিত যে, শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে পুরোপুরি মুছে গেছেন—এ কথা এখনো বলা যাচ্ছে না।
রাজনীতির ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, আবার রাজনৈতিক অস্তিত্বও সহজে শেষ হয় না। বাংলাদেশের রাজনীতিও তার ব্যতিক্রম নয়। আজ যে দল নিষিদ্ধ, কাল হয়তো তারাই আবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসতে পারে। আর সেই কারণেই শেখ হাসিনার দেশে ফেরা না ফেরার প্রশ্নটি এখন শুধু একটি সংবাদ নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক মানচিত্রের অন্যতম বড় অনিশ্চয়তার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
আপনার মতামত জানানঃ