বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রতিটি নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ থাকে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ, প্রশাসনিক জটিলতা এবং দুর্নীতির মতো বহুমাত্রিক সমস্যার মধ্যে দায়িত্ব গ্রহণকারী যে কোনো সরকারের জন্য এটি সহজ কাজ নয়। বর্তমান বিএনপি সরকারের ক্ষেত্রেও বাস্তবতা ভিন্ন নয়। নির্বাচনি ইশতেহারে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও খাতভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) সতর্ক করে জানিয়েছে, সুশাসনের ঘাটতি, দলীয় প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং দুর্নীতিবিরোধী দৃঢ় অবস্থানের অভাব সরকারের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পথে গুরুত্বপূর্ণ বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সরকারের প্রথম একশ দিনের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করে টিআইবি যে চিত্র তুলে ধরেছে, তা একদিকে সম্ভাবনার কথা বলে, অন্যদিকে উদ্বেগেরও কারণ সৃষ্টি করে। সংস্থাটির মতে, সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের বার্তা দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন পর্যাপ্তভাবে দেখা যাচ্ছে না। বিভিন্ন হাটবাজার, পরিবহণ খাত, বাসস্ট্যান্ড ও ট্রাকস্ট্যান্ডে চাঁদাবাজির অভিযোগ এখনও বিদ্যমান। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসা, চুরি, ছিনতাই ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। এসব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে চাঁদাবাজি প্রসঙ্গ। সরকারের পক্ষ থেকে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এমনকি একজন মন্ত্রীর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজিকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে বলে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যখন কোনো সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, তখন শুধু বক্তব্য নয়, কার্যকর পদক্ষেপই জনগণের আস্থা অর্জনের মূল উপাদান হয়ে ওঠে। তাই চাঁদাবাজি ও দখলবাজির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগও প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
টিআইবির প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন এবং তথ্য কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠন বা কার্যকর করার ক্ষেত্রে সরকারের দৃশ্যমান উদ্যোগ এখনো পর্যাপ্ত নয়। অথচ এসব প্রতিষ্ঠান একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্নীতি প্রতিরোধ, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং তথ্যপ্রবাহের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে শক্তিশালী ও স্বাধীন কমিশন অপরিহার্য। এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যকর উপস্থিতি না থাকলে দীর্ঘমেয়াদে সুশাসন প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রতিবেদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো তথাকথিত ‘এবার আমাদের পালা’ সংস্কৃতির বিস্তার। সরকার পরিবর্তনের পর ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতা-কর্মী, সমর্থক, আমলা এবং বিভিন্ন পেশাজীবী গোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের সুযোগ হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রাজনৈতিক নিয়োগ, দলীয় বিবেচনায় পদায়ন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে গোষ্ঠীগত প্রভাবের বিষয়টি এ অভিযোগকে আরও জোরালো করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় দলীয় প্রভাবের অভিযোগ নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেই মনে করছে টিআইবি।
শিক্ষা খাতেও একই ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য ও প্রশাসনিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও উপাচার্য নিয়োগে সার্চ কমিটি পুনর্গঠন, পুনরায় ভর্তি ফি বাতিল এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলি নীতিমালা প্রণয়নের মতো পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ সরকার কিছু ক্ষেত্রে সংস্কারমুখী উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু সেসব উদ্যোগের সঙ্গে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রশ্নও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে টিআইবির পর্যবেক্ষণ বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। সরকারের প্রথম দিকে মাত্র দুই মাসে দেশে শত শত খুন, অপহরণ, ছিনতাই এবং ডাকাতির ঘটনা রেকর্ড হয়েছে। পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাও উদ্বেগজনক মাত্রায় রয়েছে। যদিও পুলিশের তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন অভিযান পরিচালিত হচ্ছে, তবুও সামগ্রিক পরিস্থিতিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ছাড়া বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা কঠিন।
প্রতিবেদনে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সহনশীলতার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠী ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ওপর হামলা এবং অসহিষ্ণুতার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ঢাকার শাহ আলীর মাজার এবং কুষ্টিয়ায় এক পীরের ওপর হামলার ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এসব ঘটনা শুধু ধর্মীয় স্বাধীনতার জন্য নয়, বরং দেশের বহুত্ববাদী ঐতিহ্যের জন্যও হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং ধর্মীয় সহনশীলতা রক্ষা না করলে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ দুর্বল হয়ে পড়ে।
তবে টিআইবির মূল্যায়নে শুধু সমালোচনা নয়, ইতিবাচক দিকও উঠে এসেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৭টিকে আইনে পরিণত করার উদ্যোগকে প্রশংসনীয় বলা হয়েছে। এটি প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকারি সুবিধা গ্রহণে সংযম, রাষ্ট্রীয় প্রটোকল পরিহার এবং মন্ত্রীদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের মতো উদ্যোগ সরকারপ্রধানের সদিচ্ছার পরিচয় বহন করে বলে মন্তব্য করা হয়েছে।
তবে একই সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিল বা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। বিশেষ করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার সুরক্ষা, দুর্নীতি দমন এবং গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো বাতিল বা স্থগিত করাকে টিআইবি উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছে। সংস্থাটির মতে, এসব অধ্যাদেশ প্রয়োজনীয় সংশোধন করে আইনে পরিণত করা যেত। কিন্তু তা না করে বাতিল করার মাধ্যমে সরকার গুরুত্বপূর্ণ কিছু ক্ষেত্রে পিছিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সরকারের সামনে দুটি বড় ধরনের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথমটি হলো আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধ। তাঁর মতে, প্রশাসনের একটি অংশ পরিবর্তনের পক্ষে থাকলেও নিজেদের পরিবর্তন চায় না। ফলে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার বাস্তবায়নে নানা ধরনের বাধা সৃষ্টি হতে পারে। দ্বিতীয় ঝুঁকি হলো ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির অভ্যন্তরে এমন কিছু গোষ্ঠীর উপস্থিতি, যারা ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত সুবিধা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে দেখতে চায়। এই দুটি বিষয় নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সরকারের সংস্কার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
অর্থনৈতিক বাস্তবতাও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, বিনিয়োগ সংকট এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে সরকারকে কার্যকর নীতি গ্রহণ করতে হচ্ছে। জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে না পারলে রাজনৈতিক চাপও বাড়তে পারে। ফলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং অর্থনৈতিক সংস্কারকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার বিকল্প নেই।
বাংলাদেশের জনগণ বহু বছর ধরে এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশা করে আসছে যেখানে দলীয় পরিচয়ের চেয়ে যোগ্যতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা বেশি গুরুত্ব পাবে। বর্তমান সরকারের সামনে সেই প্রত্যাশা পূরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে। তবে সুযোগের পাশাপাশি ঝুঁকিও কম নয়। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক সংস্কার, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা ছাড়া কোনো উন্নয়নই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।
টিআইবির গবেষণা মূলত একটি সতর্কবার্তা। এতে যেমন সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, তেমনি ভবিষ্যৎ ঝুঁকির দিকগুলোও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সরকারের প্রথম একশ দিনকে তাই একটি সম্ভাবনাময় সূচনা বলা যেতে পারে। কিন্তু এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হলে শুধু ঘোষণা নয়, কার্যকর পদক্ষেপ, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং জবাবদিহিতামূলক শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ এবং একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য এখন প্রয়োজন সাহসী সিদ্ধান্ত, নিরপেক্ষ প্রশাসন এবং সুশাসনের প্রতি অবিচল অঙ্গীকার।
আপনার মতামত জানানঃ