
ভূমধ্যসাগরের তলদেশে প্রায় দুই হাজার একশ বছর ধরে পড়ে ছিল একটি রোমান বাণিজ্যজাহাজ। তার কাঠের কাঠামোর বড় অংশ হয়তো পলি ও সামুদ্রিক আবরণের নিচে লুকিয়ে গেছে। কিন্তু জাহাজের বহন করা শত শত পোড়ামাটির পাত্র এখনো সমুদ্রের তলায় ছড়িয়ে আছে। সেই পাত্রগুলোই দুই সহস্রাব্দ পর একটি হারিয়ে যাওয়া বাণিজ্যযাত্রার গল্প বলতে শুরু করেছে।
ইতালির সিসিলি দ্বীপের পশ্চিম উপকূলের মাজারা দেল ভাল্লো শহর থেকে প্রায় তিন মাইল দূরে জাহাজটির সন্ধান পাওয়া গেছে। প্রায় ৪৬ মিটার গভীরে থাকা প্রত্নস্থানটিতে শত শত অ্যাম্ফোরা, দুটি সিসার নোঙরদণ্ড এবং সিসায় তৈরি আরেকটি কাঠামো শনাক্ত হয়েছে।
প্রাথমিক পরীক্ষায় জাহাজটির সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় থেকে প্রথম শতকের মধ্যে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অর্থাৎ এটি রোমান প্রজাতন্ত্রের শেষ দিকের কোনো বাণিজ্যজাহাজ—যে সময় রোম ভূমধ্যসাগরজুড়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তার করছিল।
ইতালির সংস্কৃতিমন্ত্রী আলেসান্দ্রো জিউলি আবিষ্কারটিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পানির নিচের প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, এটি সেই বাণিজ্যপথ ও বিনিময়ব্যবস্থার নতুন প্রমাণ, যা ভূমধ্যসাগরকে বিভিন্ন সভ্যতার মিলনস্থলে পরিণত করেছিল।
কিন্তু জাহাজটির গুরুত্ব শুধু তার বয়সে নয়। এটি এমন এক সময়ের ‘বন্ধ হয়ে যাওয়া মুহূর্ত’, যেখানে একটি বাণিজ্যযাত্রার পণ্য, নৌপ্রযুক্তি এবং সম্ভাব্য গন্তব্য একই জায়গায় আটকে আছে।
পাথর ভেবে শুরু, ইতিহাসে গিয়ে শেষ
জাহাজটির অবস্থান শনাক্ত হওয়ার পেছনে স্থানীয় পর্যবেক্ষণ ও সরকারি অনুসন্ধানের সমন্বয় কাজ করেছে। জেলে ও ডুবুরিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইতালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সুরক্ষা ইউনিট, পানির নিচের Carabinieri দল এবং সিসিলির সমুদ্র প্রত্নতত্ত্ব কর্তৃপক্ষ এলাকাটি পরীক্ষা করে।
প্রাথমিকভাবে সমুদ্রতলের একটি অস্বাভাবিক উঁচু অংশকে পাথর বা প্রাকৃতিক কাঠামো মনে হয়েছিল। ডুবুরিরা নিচে নেমে সারি সারি অ্যাম্ফোরা দেখতে পাওয়ার পর বোঝা যায়, এটি প্রাকৃতিক পাথরের স্তূপ নয়—একটি প্রাচীন জাহাজের ছড়িয়ে পড়া পণ্যসম্ভার।
সরকারি বিবরণ অনুযায়ী, অ্যাম্ফোরার স্তূপটি প্রায় ২১ মিটার দীর্ঘ এবং ৬ মিটার প্রশস্ত এলাকায় ছড়িয়ে আছে। গণমাধ্যমের প্রাথমিক হিসাবে পাত্রের সংখ্যা প্রায় ৫০০। তবে পূর্ণ বৈজ্ঞানিক জরিপ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সঠিক সংখ্যা এবং জাহাজের প্রকৃত মাপ নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
প্রত্নস্থানটিতে পাওয়া দুটি বড় সিসার নোঙরদণ্ড জাহাজটির পরিচয় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কাঠের অংশ নষ্ট হয়ে গেলেও সিসা ও পোড়ামাটির বস্তু সমুদ্রের নিচে দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে। এ কারণেই নোঙর, পাত্র এবং পণ্য রাখার বিন্যাস দেখে প্রত্নতত্ত্ববিদেরা জাহাজটির আকার ও নির্মাণ সম্পর্কে ধারণা করতে পারবেন। ইতালির Carabinieri

অ্যাম্ফোরা আসলে কী?
অ্যাম্ফোরা ছিল প্রাচীন ভূমধ্যসাগরীয় বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত পরিবহনপাত্র। পোড়ামাটির তৈরি এই পাত্রের দুই পাশে হাতল, সরু গলা এবং নিচে সূচালো অংশ থাকত। সূচালো তলা আধুনিক বোতলের মতো সোজা করে দাঁড়ানোর জন্য নয়। জাহাজে পাত্রগুলো কাঠের ফ্রেম, দড়ি বা খড়ের আবরণের মধ্যে স্তরে স্তরে বসানো হতো। একটির সরু তলা নিচের স্তরের পাত্রগুলোর মাঝের ফাঁকে ঢুকে যেত।
এতে জাহাজের সীমিত জায়গায় বিপুলসংখ্যক পাত্র দৃঢ়ভাবে সাজানো সম্ভব হতো। দোলায়িত সমুদ্রেও সেগুলো তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকত।
অ্যাম্ফোরায় মদ, জলপাই তেল, মাছের সস, শস্য, শুকনো ফল এবং বিভিন্ন কৃষিপণ্য পরিবহন করা হতো। পাত্রের আকার ও মাটির রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য অঞ্চলভেদে আলাদা ছিল। ফলে একটি ভাঙা অ্যাম্ফোরাও কোথায় তৈরি হয়েছিল এবং কোন বাণিজ্যব্যবস্থার অংশ ছিল—তার সূত্র দিতে পারে।
সিসিলিতে পাওয়া পাত্রগুলোর অধিকাংশকে প্রাথমিকভাবে Dressel 1A ধরনের বলে শনাক্ত করা হয়েছে। এই ধরনের অ্যাম্ফোরা খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় ও প্রথম শতকে বিশেষভাবে প্রচলিত ছিল এবং সাধারণত ইতালীয় মদ পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত।
তবে শুধু পাত্রের ধরন দেখে প্রতিটি পাত্রে মদই ছিল—এমন সিদ্ধান্ত নিশ্চিত নয়। পাত্র পুনর্ব্যবহার করা হতো এবং কখনো একই ধরনের পাত্রে অন্য পণ্যও পরিবহন করা সম্ভব ছিল। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য ভেতরের জৈব অবশিষ্টাংশ, রজনের আবরণ, পরাগরেণু ও রাসায়নিক চিহ্ন পরীক্ষা করতে হবে।
একটি পাত্র যেভাবে বাণিজ্যপথ দেখায়
প্রাচীন পাত্রে প্রায়ই নির্মাতার ছাপ, চিহ্ন, আঁকা অক্ষর বা পণ্যের হিসাব পাওয়া যায়। কোনো ছাপ থেকে কর্মশালার নাম জানা যেতে পারে। পাত্রের মাটিতে থাকা খনিজ উপাদান থেকে সেটি কোন অঞ্চলের কাদামাটি দিয়ে তৈরি হয়েছিল, তা শনাক্ত করা সম্ভব।
পাত্রটি ইতালির কোনো উপকূলে তৈরি হয়ে থাকলে এবং জাহাজটি সিসিলির পশ্চিমে ডুবে থাকলে গবেষকেরা সম্ভাব্য যাত্রাপথ অনুমান করতে পারবেন। জাহাজটি কি ইতালি থেকে সিসিলি হয়ে উত্তর আফ্রিকা যাচ্ছিল? নাকি স্পেন ও গল অঞ্চলের কোনো বন্দরের দিকে এগোচ্ছিল? অথবা অন্য অঞ্চল থেকে পণ্য নিয়ে ইতালির বাজারে ফিরছিল?
একটি জাহাজে যদি ভিন্ন অঞ্চলে তৈরি একাধিক ধরনের অ্যাম্ফোরা পাওয়া যায়, তাহলে বোঝা যেতে পারে সেটি পথে বিভিন্ন বন্দরে থেমে পণ্য তুলেছিল। এভাবে জাহাজের পণ্যসম্ভার ভূমধ্যসাগরের একটি অদৃশ্য বাণিজ্যমানচিত্র তৈরি করতে পারে।
প্রত্নতত্ত্ববিদদের কাছে একটি অক্ষত জাহাজের পণ্যসম্ভার তাই বিচ্ছিন্নভাবে পাওয়া পাত্রের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান। কারণ এখানে প্রতিটি বস্তু একই যাত্রা ও একই দুর্ঘটনার অংশ।
রোমের অর্থনীতিতে মদের ভূমিকা
খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় থেকে প্রথম শতক ছিল রোমান প্রজাতন্ত্রের দ্রুত সম্প্রসারণের সময়। যুদ্ধ ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রোম ভূমধ্যসাগরীয় কৃষি, উৎপাদন ও বাণিজ্যের ওপর প্রভাব বিস্তার করছিল।
ইতালির বিভিন্ন অঞ্চলে বড় আকারে আঙুর ও জলপাই চাষ করা হতো। মদ শুধু অভিজাতের বিলাসপণ্য ছিল না; সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস, ধর্মীয় আচার, সৈন্যদের রসদ এবং সামাজিক অনুষ্ঠানের অংশও ছিল।
ইতালীয় মদ সমুদ্রপথে গল, আইবেরীয় উপদ্বীপ, উত্তর আফ্রিকা এবং ভূমধ্যসাগরের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হতো। বিপরীতে এসব অঞ্চল থেকে রোমে আসত শস্য, ধাতু, মাছের সস, দাস এবং নানা ধরনের কৃষিপণ্য।
Dressel 1 ধরনের বিপুল অ্যাম্ফোরা ইউরোপ ও ভূমধ্যসাগরের বিভিন্ন প্রত্নস্থানে পাওয়া যাওয়ায় ইতালীয় মদের বাণিজ্যিক বিস্তার সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেছে। সিসিলির নতুন জাহাজটি সেই বৃহৎ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি নির্দিষ্ট চালানকে ধরে রেখেছে।
সিসিলি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল?
ভূমধ্যসাগরের মানচিত্রে সিসিলির অবস্থান প্রায় কেন্দ্রীয়। দ্বীপটির উত্তরে ইতালীয় উপদ্বীপ, দক্ষিণে উত্তর আফ্রিকা, পশ্চিমে সার্ডিনিয়া ও আইবেরিয়া এবং পূর্বে গ্রিস ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরের বন্দরগুলো।
এই অবস্থান সিসিলিকে প্রাচীনকাল থেকেই সামরিক ও বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছিল। গ্রিক, ফিনিশীয়, কার্থেজীয় ও রোমান—প্রায় সব বড় ভূমধ্যসাগরীয় শক্তি দ্বীপটি নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে।
প্রথম পিউনিক যুদ্ধের পর খ্রিস্টপূর্ব ২৪১ সালে সিসিলি রোমের প্রথম প্রদেশে পরিণত হয়। দ্বীপটির উর্বর জমি থেকে বিপুল পরিমাণ শস্য উৎপাদিত হতো। রোমের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর খাদ্য সরবরাহে সিসিলির বড় ভূমিকা ছিল।
একই সঙ্গে সিসিলির বন্দরগুলো ইতালি, উত্তর আফ্রিকা ও পশ্চিম ভূমধ্যসাগরের মধ্যে যাতায়াতকারী জাহাজের বিশ্রাম, মেরামত ও পণ্য বিনিময়ের কেন্দ্র ছিল। মাজারা দেল ভাল্লোর আশপাশের জলসীমা সেই প্রাচীন যোগাযোগব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সিসিলির পশ্চিম উপকূলে এর আগেও পিউনিক ও রোমান যুগের জাহাজ, নৌযুদ্ধের ব্রোঞ্জের র্যাম, নোঙর, হেলমেট এবং অ্যাম্ফোরা পাওয়া গেছে। মাজারা দেল ভাল্লোর জাদুঘরেও সিসিলি চ্যানেল থেকে উদ্ধার করা বিভিন্ন যুগের পরিবহনপাত্র সংরক্ষিত রয়েছে। সিসিলির প্রত্নতাত্ত্বিক পার্ক কর্তৃপক্ষ
জাহাজটি কেন ডুবেছিল?
আবিষ্কারের এই পর্যায়ে জাহাজডুবির কারণ জানা যায়নি। ভূমধ্যসাগর শান্ত ও নীল দেখালেও প্রাচীন নাবিকদের জন্য এটি ছিল বিপজ্জনক যাত্রাপথ।
আকস্মিক ঝড়, বাতাসের দিক পরিবর্তন, পাথুরে অগভীর জল, অতিরিক্ত পণ্য, কাঠামোগত দুর্বলতা, নৌচালনায় ভুল কিংবা সংঘর্ষ—যেকোনো কারণে জাহাজটি ডুবতে পারে।
জাহাজে পণ্য কীভাবে ছড়িয়ে আছে, নোঙর কোথায় পড়ে আছে এবং কাঠের কাঠামো কোন দিকে মুখ করে আছে—এসব দেখে দুর্ঘটনার শেষ মুহূর্ত সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে। নোঙর নামানো অবস্থায় থাকলে বোঝা যেতে পারে, নাবিকেরা বিপদের সময় জাহাজ থামানোর চেষ্টা করেছিলেন। পণ্য একদিকে সরে থাকলে জাহাজ কাত হয়ে ডোবার ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে।
তবে এই ব্যাখ্যা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে করতে হবে। দুই হাজার বছরের সামুদ্রিক স্রোত, জালের আঘাত, জীবজগতের চলাচল এবং পলির পরিবর্তন প্রত্নস্থানের মূল বিন্যাস বদলে দিতে পারে।

কাঠের জাহাজ কি এখনো আছে?
প্রকাশিত ছবিতে মূলত অ্যাম্ফোরার স্তূপ দৃশ্যমান। নিচে জাহাজের কাঠের কাঠামো কতটা সংরক্ষিত রয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সমুদ্রের পানিতে খোলা থাকা কাঠ সাধারণত সামুদ্রিক জীব ও রাসায়নিক ক্ষয়ে নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু পলি এবং পাত্রের ভারে চাপা পড়া কাঠ অক্সিজেনস্বল্প পরিবেশে দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে। যদি জাহাজের তলার অংশ সংরক্ষিত থাকে, সেটি রোমান জাহাজ নির্মাণপ্রযুক্তি সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য দেবে।
কাঠের প্রজাতি পরীক্ষা করে নির্মাণে কোন অঞ্চলের গাছ ব্যবহার হয়েছিল জানা সম্ভব। কাঠের বলয় কিংবা রেডিওকার্বন বিশ্লেষণ সময়কাল নির্ধারণে সাহায্য করতে পারে। ধাতব পেরেক, কাঠের সংযোগ এবং পাটাতনের বিন্যাস থেকে বোঝা যাবে জাহাজটি কীভাবে তৈরি হয়েছিল এবং কত ওজন বহন করতে পারত।
সুতরাং দৃশ্যমান অ্যাম্ফোরাগুলো আবিষ্কারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলেও, বৈজ্ঞানিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হয়তো তাদের নিচেই লুকিয়ে আছে।
৪৬ মিটার গভীরে গবেষণার চ্যালেঞ্জ
৪৬ মিটার গভীরতায় সাধারণ প্রত্নতাত্ত্বিক খনন চালানো সহজ নয়। এই গভীরতায় পানির চাপ অনেক বেশি এবং ডুবুরিদের অবস্থানের সময় সীমিত। দ্রুত ওপরে উঠলে শরীরে দ্রবীভূত গ্যাস বুদ্বুদ তৈরি করে ডিকম্প্রেশন অসুস্থতা ঘটাতে পারে। তাই প্রতিটি ডাইভ সতর্কভাবে পরিকল্পনা করতে হয়।
প্রত্নতত্ত্ববিদেরা প্রথমে উচ্চমানের ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করবেন। হাজারো ছবি পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে ফটোগ্রামেট্রির মাধ্যমে প্রত্নস্থানটির ত্রিমাত্রিক মডেল তৈরি করা সম্ভব। এতে কোনো বস্তু না সরিয়েই পাত্রের অবস্থান, স্তূপের উচ্চতা এবং জাহাজের সম্ভাব্য আকার পরিমাপ করা যায়।
রোবটচালিত ক্যামেরা বা দূরনিয়ন্ত্রিত যান দীর্ঘ সময় ধরে স্থানটি পর্যবেক্ষণ করতে পারে। প্রয়োজন হলে অল্পসংখ্যক নমুনা তুলে পরীক্ষাগারে মাটির গঠন, জৈব অবশিষ্টাংশ ও উৎপাদনস্থল পরীক্ষা করা হবে।
প্রতিটি বস্তু তোলার আগে তার অবস্থান নিখুঁতভাবে নথিবদ্ধ করা জরুরি। কারণ প্রত্নতত্ত্বে একটি বস্তুর মূল্য শুধু বস্তুটিতে নয়; কোন স্তরে, কোন দিকে এবং কোন বস্তুর পাশে সেটি ছিল—সেই প্রেক্ষাপটেও নিহিত।
সবকিছু তুলে আনা হবে না কেন?
সাধারণ দর্শকের কাছে জাহাজের সব অ্যাম্ফোরা তুলে জাদুঘরে রাখা স্বাভাবিক সমাধান মনে হতে পারে। কিন্তু পানির নিচ থেকে কোনো বস্তু তোলা মানেই সেটিকে নিরাপদ করা নয়।
দুই হাজার বছর সমুদ্রের লবণাক্ত পানিতে থাকা পোড়ামাটি ও ধাতু হঠাৎ বাতাসে এলে দ্রুত ক্ষয় হতে পারে। প্রতিটি বস্তু থেকে লবণ অপসারণ, ধীরে শুকানো এবং রাসায়নিকভাবে স্থিতিশীল করার জন্য দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণব্যবস্থা প্রয়োজন।
কাঠ উদ্ধার করা আরও কঠিন। পানিতে ভেজা প্রাচীন কাঠের কোষগুলো দুর্বল হয়ে যায়। সরাসরি শুকালে কাঠ সংকুচিত ও বিকৃত হতে পারে। বিশেষ রাসায়নিক দ্রবণ, নিয়ন্ত্রিত শুকানো এবং বছরের পর বছর পরিচর্যা প্রয়োজন হয়।
এ কারণেই অনেক পানির নিচের প্রত্নস্থানকে সেখানেই সংরক্ষণ করা হয়। বৈজ্ঞানিকভাবে প্রয়োজনীয় কিছু নমুনা তোলা হলেও অধিকাংশ নিদর্শন মূল অবস্থানে রেখে নজরদারি করা হতে পারে।
একই সঙ্গে লুটপাট, মাছ ধরার জাল ও নোঙরের আঘাত থেকে স্থানটি রক্ষা করতে এর সঠিক অবস্থান নিয়ন্ত্রিত রাখা এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ জরুরি।
যুদ্ধের ইতিহাস নয়, দৈনন্দিন অর্থনীতির ইতিহাস
প্রাচীন রোম নিয়ে জনপ্রিয় কল্পনায় সাধারণত সম্রাট, সেনাবাহিনী, গ্ল্যাডিয়েটর ও বিশাল স্থাপত্য সামনে আসে। কিন্তু সাম্রাজ্য কিংবা প্রজাতন্ত্র শুধু যুদ্ধের মাধ্যমে চলত না। তাকে চালু রাখত জাহাজ, বন্দর, কৃষক, কুমার, ব্যবসায়ী, নাবিক ও শ্রমিকদের বিশাল একটি নেটওয়ার্ক।
একটি অ্যাম্ফোরা তৈরির জন্য মাটি সংগ্রহ, পাত্র নির্মাণ, পোড়ানো, পণ্য ভরা, সিল করা, গুদামে নেওয়া এবং জাহাজে তোলার প্রয়োজন হতো। এরপর নাবিকেরা আবহাওয়া, জলদস্যুতা ও জাহাজডুবির ঝুঁকি নিয়ে সেটি অন্য বন্দরে পৌঁছে দিতেন।
সিসিলির জাহাজটি সেই দৈনন্দিন অর্থনীতির একটি মুহূর্ত সংরক্ষণ করেছে। এর প্রতিটি পাত্র একজন উৎপাদক, ব্যবসায়ী, নাবিক এবং অজানা ক্রেতার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
জাহাজটি গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেনি। কিন্তু তার ব্যর্থ যাত্রাই আজ সফলভাবে ইতিহাসের কাছে তথ্য পৌঁছে দিয়েছে।
সমুদ্রের নিচের একটি সময়-ক্যাপসুল
স্থলভাগের কোনো বন্দর বা গুদামে বস্তু শতাব্দীর পর শতাব্দী ব্যবহৃত, সরানো ও পুনর্বিন্যাস হয়। কিন্তু হঠাৎ ডুবে যাওয়া জাহাজে একটি নির্দিষ্ট দিনের পণ্য, সরঞ্জাম ও জীবন একই সঙ্গে আটকে যেতে পারে। এ কারণে জাহাজের ধ্বংসাবশেষকে প্রায়ই প্রত্নতাত্ত্বিক ‘টাইম ক্যাপসুল’ বলা হয়।
সিসিলির এই আবিষ্কার এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। জাহাজের নাম, যাত্রার সূচনা, গন্তব্য, মালিক এবং ডুবে যাওয়ার কারণ অজানা। প্রায় ৫০০ অ্যাম্ফোরার হিসাবও পূর্ণ জরিপে পরিবর্তিত হতে পারে।
কিন্তু এতটুকু স্পষ্ট—এই জাহাজ কোনো বিচ্ছিন্ন নৌযান ছিল না। এটি ইতালি, সিসিলি, উত্তর আফ্রিকা, আইবেরিয়া ও ভূমধ্যসাগরের অন্য বন্দরকে যুক্ত করা বৃহৎ বাণিজ্যব্যবস্থার অংশ ছিল।
আজ আমরা ভূমধ্যসাগরকে পৃথক দেশ ও রাজনৈতিক সীমান্তের সমষ্টি হিসেবে দেখি। দুই হাজার বছর আগে একই সমুদ্র ছিল পণ্য, মানুষ, ভাষা, ধর্ম ও প্রযুক্তি চলাচলের একটি বিস্তৃত মহাসড়ক।
মাজারা দেল ভাল্লোর গভীর জলে পড়ে থাকা জাহাজটি তাই শুধু একটি হারানো রোমান নৌযান নয়। এটি প্রমাণ করে, সমুদ্র সভ্যতাকে বিচ্ছিন্ন করেনি—সংযুক্ত করেছে। আর সমুদ্রতলে পড়ে থাকা শত শত অ্যাম্ফোরা সেই প্রাচীন সংযোগের নীরব দলিল।
আপনার মতামত জানানঃ