
পশ্চিমবঙ্গের শিল্পায়নের আলোচনা যতবার ফিরে আসে, সিঙ্গুরও ততবার ফিরে আসে। কখনো একটি সতর্কবার্তা হিসেবে, কখনো রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে, আবার কখনো বিনিয়োগ হারানোর প্রতীক হিসেবে। প্রায় দুই দশক আগে হুগলির উর্বর কৃষিজমিতে টাটা মোটরসের ছোট গাড়ির কারখানা নির্মাণের উদ্যোগ কেবল একটি শিল্পপ্রকল্পকে ঘিরে বিরোধ ছিল না। সেটি হয়ে উঠেছিল জমির অধিকার, উন্নয়নের সংজ্ঞা এবং রাষ্ট্র কত দূর পর্যন্ত নাগরিকের সম্মতি উপেক্ষা করতে পারে—এই তিন প্রশ্নের সংঘাত।
সিঙ্গুর আন্দোলন তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের রাজনৈতিক ভিত্তি দুর্বল করেছিল এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থানের অন্যতম প্রধান পথ তৈরি করেছিল। ২০০৮ সালে টাটা মোটরস প্রকল্পটি পশ্চিমবঙ্গ থেকে সরিয়ে নেয়। পরে ২০১৬ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট প্রায় ৯৯৭ একর জমি অধিগ্রহণ বাতিল করে দেয়। আদালতের পর্যবেক্ষণে অধিগ্রহণের প্রক্রিয়াগত ত্রুটি ও জমির মালিকদের আপত্তি যথাযথভাবে বিবেচনা না করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
ফলে সিঙ্গুরের উত্তরাধিকার দ্বিমুখী। কৃষকের সম্মতি ছাড়া শিল্পায়ন যে রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক এবং আইনগতভাবে টেকসই নয়, সেটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অন্যদিকে, বড় শিল্পের জন্য জমি প্রস্তুত করতে সরকার অনাগ্রহী—এমন একটি ধারণাও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে গড়ে ওঠে। পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার এখন দ্বিতীয় ধারণাটি ভাঙতে চাইছে; কিন্তু প্রথম শিক্ষা ভুলে গিয়ে তা করা সম্ভব নয়।
সরকার ১৫ আগস্টের মধ্যে নতুন শিল্পনীতি আনার কথা জানিয়েছে। নীতির ঘোষিত রূপরেখায় রয়েছে শিল্পের জন্য পৃথক ভূমিনীতি, বিনিয়োগকারীদের প্রণোদনা, বন্ধ কারখানার অব্যবহৃত জমি নতুন উদ্যোগে ব্যবহার এবং অনুমোদনের জন্য একক জানালা বা ‘সিঙ্গল উইন্ডো’ ব্যবস্থা। শিল্পমহলের সঙ্গে আলোচনার পর খসড়া নীতি মন্ত্রিগোষ্ঠী ও মন্ত্রিসভায় যাওয়ার কথাও জানানো হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এক মাসের মধ্যে অন্তত ২৫টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে জমি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
তবে এই লেখা প্রস্তুতের সময় পূর্ণাঙ্গ সরকারি নীতিপত্র প্রকাশিত অবস্থায় পাওয়া যায়নি। অতএব প্রস্তাবিত ব্যবস্থা এবং কার্যকর নীতির মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি। কোন শিল্পকে কত জমি দেওয়া হবে, জমি কীভাবে চিহ্নিত হবে, স্থানীয় মানুষের সম্মতি কীভাবে নেওয়া হবে, প্রণোদনার আর্থিক মূল্য কত এবং প্রতিশ্রুতি না রাখলে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা থাকবে—নীতির প্রকৃত মূল্য এসব খুঁটিনাটিতেই নির্ধারিত হবে।
জমির প্রশ্নে নতুন পথ কতটা নতুন
পশ্চিমবঙ্গে বড় শিল্পের প্রধান বাধা হিসেবে প্রায়ই জমিকে দেখানো হয়। বাস্তবতা কিছুটা জটিল। জমি আছে কি না, শুধু সেটিই প্রশ্ন নয়; জমিটি একটানা কি না, সড়ক–রেল–বন্দর ও বিদ্যুতের সংযোগ আছে কি না, মালিকানা নিয়ে মামলা আছে কি না এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠী প্রকল্পটি গ্রহণ করছে কি না—সবই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন সরকারের আলোচনায় সরাসরি ক্রয়, সরকারি ল্যান্ড ব্যাংক এবং বন্ধ শিল্পের জমি ব্যবহারের কথা এসেছে। সরাসরি ক্রয়ের সুবিধা হলো, রাষ্ট্র জোরপূর্বক অধিগ্রহণের রাজনৈতিক দায় এড়াতে পারে এবং ক্রেতা–বিক্রেতার সম্মতির ভিত্তিতে দাম নির্ধারিত হয়। কিন্তু ছোট ছোট খণ্ডে বিভক্ত জমি একত্র করা কঠিন; কয়েকজন মালিক রাজি না হলে পুরো প্রকল্প আটকে যেতে পারে। আবার দরিদ্র কৃষক ও বর্গাদারের দরকষাকষির ক্ষমতা বড় প্রতিষ্ঠানের সমান নয়। কেবল বিক্রয় দলিলে স্বাক্ষর থাকলেই ন্যায্য সম্মতি নিশ্চিত হয় না।
বন্ধ কারখানার জমি পুনর্ব্যবহার তুলনামূলকভাবে আকর্ষণীয় ধারণা। এতে নতুন কৃষিজমির ওপর চাপ কমতে পারে এবং পুরোনো শিল্পাঞ্চলের বিদ্যমান অবকাঠামো কাজে লাগানো যায়। কিন্তু এসব জমির অনেকটির ওপর ব্যাংকের দাবি, শ্রমিকদের পাওনা, পরিবেশগত দায় কিংবা দীর্ঘদিনের মামলা থাকতে পারে। সরকারকে তাই জমির আয়তনের তালিকা নয়, মালিকানা ও দায়মুক্তির যাচাইকৃত তথ্য প্রকাশ করতে হবে। অন্যথায় ‘ল্যান্ড ব্যাংক’ কাগজে বড় হলেও বিনিয়োগযোগ্য জমি সামান্য হতে পারে।
আরেকটি সম্ভাব্য মডেল হচ্ছে জমির মালিককে এককালীন ক্ষতিপূরণের সঙ্গে উন্নত জমির অংশ, প্রকল্পের শেয়ার, বার্ষিক আয় অথবা পরিবারের সদস্যদের দক্ষতা প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া। এতে জমি বিক্রির অর্থ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও পরিবারটি শিল্পায়নের অর্থনৈতিক সুফলে যুক্ত থাকতে পারে। তবে এমন ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক ও আইনগতভাবে প্রয়োগযোগ্য না হলে তা সহজেই উদ্বোধনী মঞ্চের প্রতিশ্রুতিতে পরিণত হবে।
বিনিয়োগের ঘোষণা আর কারখানার উৎপাদন এক নয়
পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগ নিয়ে সংখ্যার অভাব নেই। বিভিন্ন ব্যবসা সম্মেলনে বিপুল অঙ্কের প্রস্তাব এসেছে; আবার ২০২৪–২৫ অর্থবছরে রাজ্যের শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৩ শতাংশ ছিল বলে সরকারি ও শিল্পমহলের বক্তব্যে দাবি করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণে ৭৫০ কোটি রুপির একটি প্রকল্প এবং নদিয়ার ধুবুলিয়া ও পশ্চিম বর্ধমানের হীরাপুরে ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ শিল্পপার্কের পরিকল্পনাও সামনে এসেছে। এসব ইতিবাচক সংকেত, কিন্তু কোনো বিনিয়োগ প্রস্তাব নিজে কর্মসংস্থান নয়।
প্রথমে সমঝোতা স্মারক হয়, তারপর জমি ও অনুমোদন, অর্থায়ন, নির্মাণ, যন্ত্রপাতি স্থাপন এবং পরীক্ষামূলক উৎপাদন। এই ধাপগুলোর যেকোনোটিতে প্রকল্প থেমে যেতে পারে। তাই সরকারের উচিত প্রতিটি বড় প্রস্তাবের জন্য একটি প্রকাশ্য ড্যাশবোর্ড চালু করা—প্রস্তাবিত অর্থ, বরাদ্দ জমি, নির্মাণের অগ্রগতি, উৎপাদন শুরুর তারিখ এবং প্রত্যক্ষ চাকরির সংখ্যা আলাদা করে দেখাতে হবে। বাতিল বা বিলম্বিত প্রকল্পও তালিকা থেকে গোপনে সরানো যাবে না।
প্রস্তাবের অঙ্ককে সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড করলে আরেকটি সমস্যা হয়। মূলধননির্ভর স্বয়ংক্রিয় কারখানায় হাজার কোটি রুপি বিনিয়োগ হলেও চাকরি তুলনামূলক কম হতে পারে। বিপরীতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগ কম হলেও স্থানীয় কর্মসংস্থান ও সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রভাব বেশি হয়। তাই ‘কত টাকা আসছে’র সঙ্গে ‘প্রতি কোটি রুপি বিনিয়োগে কত চাকরি’, ‘চাকরির কত শতাংশ স্থানীয়’, ‘কতটি স্থায়ী’ এবং ‘নারীর অংশগ্রহণ কত’—এসব সূচক প্রকাশ করা দরকার।
চাকরির প্রতিশ্রুতি কোথায় মাপা হবে
পশ্চিমবঙ্গের শিল্পনীতির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা কর্মসংস্থান। রাজ্যের বহু শিক্ষিত তরুণ সরকারি চাকরির দীর্ঘ নিয়োগজট, পরীক্ষা ও মামলা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছে। অন্যদিকে, গ্রাম ও ছোট শহর থেকে শ্রমিকেরা কাজের জন্য গুজরাট, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, কেরালা কিংবা দিল্লিতে যান। নতুন শিল্পনীতি যদি এই বাস্তবতা বদলাতে না পারে, তবে প্রবৃদ্ধির বড় অঙ্ক সাধারণ মানুষের কাছে অর্থবহ হবে না।
কর্মসংস্থানের দাবি যাচাইয়ের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ ও সম্ভাব্য চাকরিকে একসঙ্গে যোগ করা যাবে না। নির্মাণকালে তিন মাসের কাজ এবং কারখানায় স্থায়ী প্রযুক্তিগত পদ একই বিষয় নয়। ঠিকাদারি শ্রমিককে প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী কর্মী হিসেবেও দেখানো উচিত নয়। প্রতিটি প্রকল্পে বেতনসীমা, চুক্তির ধরন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং স্থানীয় নিয়োগের তথ্য প্রকাশ করা হলে সরকার ও শিল্প—উভয়ের দাবি যাচাই করা সম্ভব হবে।
শুধু কারখানা বসানো যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দক্ষতার মিল। ইলেকট্রনিকস, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, রাসায়নিক, লজিস্টিকস বা সবুজ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ এলে স্থানীয় আইটিআই, পলিটেকনিক ও কলেজের পাঠ্যক্রমকে সেই চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে প্রশিক্ষণে অংশীদার করতে হবে এবং প্রশিক্ষণ শেষে কতজন চাকরি পেলেন, সেই হিসাবও রাখতে হবে। দক্ষ শ্রমিক বাইরে থেকে এনে স্থানীয়দের কেবল নিরাপত্তারক্ষী বা দৈনিক মজুরের কাজে রাখলে ‘স্থানীয় কর্মসংস্থান’ প্রতিশ্রুতি পূরণ হবে না।
একই দলের কেন্দ্র ও রাজ্য—সুযোগ, আবার ঝুঁকিও
দিল্লি ও কলকাতায় একই রাজনৈতিক দলের সরকার থাকায় কেন্দ্রীয় অনুমোদন, অবকাঠামো, রেল, বন্দর, শিল্প করিডর এবং অর্থায়নের ক্ষেত্রে সমন্বয় সহজ হতে পারে। ধুবুলিয়া ও হীরাপুরে কেন্দ্রীয় সহায়তাপুষ্ট শিল্পপার্কের পরিকল্পনা এই সম্ভাবনার একটি উদাহরণ। পশ্চিমবঙ্গের অবস্থানও কৌশলগত—হলদিয়া ও কলকাতা বন্দর, উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার, বাংলাদেশ–নেপাল–ভুটানের নিকটতা এবং পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারের সঙ্গে যোগাযোগ রাজ্যটিকে উৎপাদন ও লজিস্টিকস কেন্দ্র হওয়ার সুবিধা দেয়।
কিন্তু রাজনৈতিক সমন্বয় যেন জবাবদিহি কমিয়ে না দেয়। কেন্দ্রীয় প্রকল্প এলেই সেটি রাজ্যের জন্য অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক—এমন নয়। ভূমি, পরিবেশ, কর-ছাড় ও অবকাঠামোর ব্যয় রাজ্য বহন করলে তার বিপরীতে স্থানীয় কর্মসংস্থান ও রাজস্ব কত আসবে, তা প্রকাশ করতে হবে। প্রতিযোগী রাজ্যকে টেক্কা দিতে মাত্রাতিরিক্ত করছাড় দেওয়া হলে বিনিয়োগ এলেও জনসাধারণের জন্য নিট লাভ কম হতে পারে।
কৃষি বনাম শিল্প—ভুল দ্বন্দ্ব থেকে বেরোনোর সময়
সিঙ্গুরের সবচেয়ে ক্ষতিকর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার সম্ভবত কৃষি ও শিল্পকে পরস্পরের শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করা। বাস্তবে টেকসই শিল্পায়ন কৃষিকে ধ্বংস না করেও সম্ভব; আবার কৃষিকে রক্ষা করার নামে গ্রামীণ তরুণদের কর্মসংস্থানের দাবি অনির্দিষ্টকাল উপেক্ষা করাও সম্ভব নয়।
খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, হিমাগার, কৃষিপণ্য পরিবহন, প্যাকেজিং, যন্ত্র মেরামত এবং গ্রামীণ গুদাম—এ ধরনের শিল্প কৃষির উৎপাদনশীলতা ও কৃষকের আয় বাড়াতে পারে। পতিত, দূষিত বা বন্ধ শিল্পের জমিকে অগ্রাধিকার দিলে বহুফসলি জমির ওপর চাপ কমবে। প্রতিটি প্রকল্পের পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন প্রকাশ করা এবং স্থানীয় মানুষের শুনানি অর্থবহ করা দরকার।
ক্ষতিপূরণের প্রশ্নও শুধু জমির বাজারমূল্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। জমি হারালে পরিবারটি ভবিষ্যৎ খাদ্য, বাসস্থান ও আয়-নিরাপত্তার একটি উৎস হারায়। বর্গাদার, কৃষিশ্রমিক, ভাগচাষি এবং জমির ওপর নির্ভরশীল ছোট ব্যবসায়ী দলিলে মালিক না হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হন। পুনর্বাসন নীতিতে তাঁদের নাম না থাকলে সিঙ্গুরের ভুল অন্য নামে ফিরে আসবে।
বিশ্বাস ফিরবে কীভাবে
নতুন শিল্পনীতির সবচেয়ে দুর্লভ উপাদান জমি বা টাকা নয়—বিশ্বাস। কৃষককে বিশ্বাস করতে হবে, তাঁর জমি জোর করে বা কম দামে নেওয়া হবে না। বিনিয়োগকারীকে বিশ্বাস করতে হবে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে অনুমোদন ও চুক্তি বদলে যাবে না। চাকরিপ্রার্থীকে বিশ্বাস করতে হবে, কর্মসংস্থানের সংখ্যা কাগজে ফুলিয়ে দেখানো হবে না। আর নাগরিককে বিশ্বাস করতে হবে, করছাড় ও সরকারি জমি কোনো ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর জন্য গোপন সুবিধায় পরিণত হবে না।
এই বিশ্বাস তৈরির জন্য পাঁচটি ন্যূনতম পদক্ষেপ প্রয়োজন: ব্যবহারযোগ্য জমির যাচাইকৃত ডিজিটাল মানচিত্র; মূল্য ও সম্মতি নির্ধারণের স্বচ্ছ পদ্ধতি; সব বড় প্রকল্পের সময়ভিত্তিক অগ্রগতি প্রকাশ; স্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক চাকরির পৃথক হিসাব; এবং স্বাধীন সামাজিক–পরিবেশগত নিরীক্ষা। শিল্পপ্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন শুরু না করলে জমি ফেরত নেওয়া বা পুনর্বণ্টনের শর্তও স্পষ্ট থাকতে হবে।
সিঙ্গুরকে কেবল অতীত সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে ব্যবহার করা সহজ। কঠিন কাজ হলো সিঙ্গুরের দুই শিক্ষা একসঙ্গে গ্রহণ করা—সম্মতি ছাড়া উন্নয়ন টেকে না, আবার সিদ্ধান্তহীনতা দিয়েও কর্মসংস্থান তৈরি হয় না। পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার যদি জমির অধিকার, দ্রুত প্রশাসন এবং পরিমাপযোগ্য চাকরিকে একই নীতির মধ্যে বাঁধতে পারে, তবে শিল্পায়নের পুরোনো অচলাবস্থা ভাঙার সুযোগ তৈরি হবে। আর যদি ঘোষিত বিনিয়োগের অঙ্ক, জমি বণ্টন ও উদ্বোধনী মঞ্চই সাফল্যের মাপকাঠি হয়, তবে নতুন নীতিও পুরোনো অবিশ্বাসের আরেকটি অধ্যায় হয়ে থাকবে।
শেষ পর্যন্ত ‘শিল্পের বাংলা’ কোনো স্লোগানের নাম নয়। এটি পরীক্ষা করা যাবে খুব সাধারণ কয়েকটি প্রশ্নে: কার জমি নেওয়া হলো, কী শর্তে নেওয়া হলো, কারখানা সত্যিই চালু হলো কি না, কতজন স্থানীয় মানুষ মর্যাদাপূর্ণ কাজ পেলেন এবং সেই হিসাব নাগরিকরা দেখতে পেলেন কি না। সিঙ্গুরের ছায়া তখনই পেরোনো সম্ভব, যখন উন্নয়নের আলো জমির মালিক, শ্রমিক, চাকরিপ্রার্থী ও বিনিয়োগকারী—সবার কাছে বিশ্বাসযোগ্য হবে।
আপনার মতামত জানানঃ