
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি দ্রুত সরকার বদলের ইতিহাস নয়। বরং দীর্ঘ সময় ধরে একটি রাজনৈতিক শক্তিকে ক্ষমতা দেওয়া, তার সংগঠন ও শাসনব্যবস্থাকে সমাজের গভীরে প্রবেশ করতে দেওয়া এবং একপর্যায়ে জমে ওঠা ক্ষোভে তাকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে দেওয়ার ইতিহাস।
১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় এসে ৩৪ বছর শাসন করেছিল। ২০১১ সালে ‘পরিবর্তন’-এর প্রতিশ্রুতি নিয়ে তৃণমূল সেই শাসনের অবসান ঘটায়। এরপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় টানা ১৫ বছর রাজ্যের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেন। ২০২৬ সালে বিজেপি ২৯৪টির মধ্যে ২০৭টি আসন জিতে তৃণমূলকে মাত্র ৮০ আসনে নামিয়ে দিয়েছে।
এই তিনটি পালাবদলকে শুধু তিন দলের জয়-পরাজয় হিসেবে দেখলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবর্তনের আসল চরিত্র ধরা যাবে না। কারণ প্রতিটি পরিবর্তনের পেছনে ভিন্ন স্লোগান থাকলেও একটি অভিন্ন প্রবণতা দেখা যায়: যে দল একসময় প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতাকাঠামোর বিরুদ্ধে মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করেছে, সময়ের সঙ্গে সেই দলই নতুন ক্ষমতাকাঠামোয় পরিণত হয়েছে।
তাহলে পশ্চিমবঙ্গ কি বামপন্থা থেকে আঞ্চলিক জনবাদ হয়ে হিন্দুত্বের দিকে স্থায়ীভাবে সরে গেল? নাকি ভোটাররা আবারও দীর্ঘস্থায়ী শাসনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী বিকল্পকে বেছে নিলেন?
১৯৭৭: বামফ্রন্টের উত্থান কেন ঐতিহাসিক ছিল
১৯৭৭ সালে বামফ্রন্টের বিজয় শুধু একটি নির্বাচনী জয় ছিল না। এটি জমি, গ্রামীণ ক্ষমতা, শ্রমিক অধিকার এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের একটি নতুন সামাজিক চুক্তির সূচনা করেছিল।
জরুরি অবস্থার পর কংগ্রেসবিরোধী ক্ষোভ, খাদ্য আন্দোলন, কৃষক সংগঠন, উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠী এবং শ্রমিক রাজনীতি বামফ্রন্টকে শক্ত ভিত্তি দেয়। নির্বাচনে বামফ্রন্ট ২৯৪টির মধ্যে ২৩১টি আসন পায়; শুধু সিপিআই(এম) জিতেছিল ১৭৮টি আসন।
ক্ষমতায় এসে বামফ্রন্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল ভূমিসংস্কার এবং ‘অপারেশন বর্গা’। বর্গাচাষিদের নাম সরকারি নথিতে অন্তর্ভুক্ত করে জমির উৎপাদনে তাদের অধিকার ও নিরাপত্তা বাড়ানো হয়। গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে রাষ্ট্র প্রথমবারের মতো স্থানীয় জমির মালিক ও প্রভাবশালীদের বাইরে একটি সুরক্ষার উৎস হয়ে ওঠে।
নিয়মিত পঞ্চায়েত নির্বাচন এবং স্থানীয় সরকারব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণও বামফ্রন্টের সামাজিক ভিত্তি শক্ত করে। গ্রামের মানুষের কাছে রাজনীতি শুধু কলকাতার প্রশাসন ছিল না; পঞ্চায়েত, কৃষকসভা ও দলীয় শাখার মাধ্যমে তা দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে যায়।
বামফ্রন্টের সাফল্য ছিল শ্রেণি ও জীবিকার প্রশ্নকে ভোটের স্থায়ী পরিচয়ে রূপান্তর করা। কৃষক, বর্গাচাষি, শ্রমিক, নিম্নমধ্যবিত্ত, শিক্ষক এবং সরকারি কর্মচারীদের বড় অংশের কাছে বাম রাজনীতি সামাজিক নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রতীক হয়ে ওঠে।
এই সংগঠিত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই বামফ্রন্ট সাতটি ধারাবাহিক বিধানসভা নির্বাচন জিতেছিল—যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচিত কোনো কমিউনিস্ট সরকারের বিরল দীর্ঘায়ু।
সাফল্যের কাঠামোই যেভাবে দুর্বলতা হলো
বামফ্রন্টের শক্তি ছিল তার সংগঠন। কিন্তু দীর্ঘ শাসনে সেই সংগঠন ধীরে ধীরে রাষ্ট্র, সমাজ ও দলের সীমারেখা অস্পষ্ট করে দেয়।
পঞ্চায়েত থেকে শিক্ষক নিয়োগ, সমবায়, শ্রমিক সংগঠন, স্থানীয় সালিশ এবং সরকারি সুবিধা—বিভিন্ন ক্ষেত্রে দলীয় কাঠামোর প্রভাব বাড়ে। পার্টির সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলে সরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা স্থানীয় ক্ষমতার কাছে পৌঁছানো কঠিন—এমন ধারণা শক্ত হতে থাকে।
প্রথম দিকে যে ক্যাডার নেটওয়ার্ক দরিদ্র মানুষের অধিকার নিশ্চিত করেছিল, পরবর্তী সময়ে তার একটি অংশ স্থানীয় নিয়ন্ত্রণ ও পৃষ্ঠপোষকতার ব্যবস্থায় পরিণত হয়। দলের ভেতরেও নিচ থেকে উঠে আসা সমালোচনার জায়গা সংকুচিত হতে থাকে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও পশ্চিমবঙ্গ বড় সংকটে পড়ে। অতীতের শ্রমিক আন্দোলনকে শিল্পপতিরা বিনিয়োগবিরোধী পরিবেশ হিসেবে দেখেছেন—এমন অভিযোগ রয়েছে। তবে শিল্পপতনকে শুধু বামফ্রন্টের শ্রমনীতির ফল বলা ইতিহাসকে অতিরিক্ত সরল করা হবে; দেশভাগ, পুঁজির স্থানান্তর, কেন্দ্রীয় নীতি, পুরোনো শিল্পের অবক্ষয় এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সরকার শিল্পায়নের মাধ্যমে এই স্থবিরতা কাটাতে চেয়েছিল। কিন্তু সিঙ্গুরে টাটা মোটরস প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ এবং নন্দীগ্রামে শিল্পাঞ্চল তৈরির উদ্যোগ বামফ্রন্টকে তার পুরোনো কৃষকভিত্তির বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দেয়।
যে দল ভূমির অধিকারের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছিল, সেই দলের সরকারের বিরুদ্ধেই কৃষকের জমি রক্ষার আন্দোলন শুরু হয়। নন্দীগ্রামের পুলিশি সহিংসতা ও রাজনৈতিক সংঘর্ষ বামফ্রন্টের নৈতিক কর্তৃত্বে গভীর আঘাত করে।
সেখানেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি কার্যকর রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করেন: বামফ্রন্ট আর দরিদ্র ও কৃষকের দল নয়; সেটি একটি উদ্ধত এবং জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন শাসকগোষ্ঠী।
২০১১: ‘পরিবর্তন’ শুধু সরকার বদল ছিল না
২০১১ সালের নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস একা ১৮৪টি আসন জেতে। মিত্র কংগ্রেসের ৪২ আসনসহ জোটের আসন দাঁড়ায় ২২৮। বামফ্রন্ট নেমে আসে ৬২ আসনে। ৩৪ বছরের শাসন একটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ভেঙে পড়ে। ভারতের নির্বাচন কমিশন—২০১১
মমতার ‘মা, মাটি, মানুষ’ স্লোগান বামফ্রন্টের তিনটি দুর্বল জায়গায় আঘাত করেছিল। ‘মা’ নারী ও পরিবারের নিরাপত্তার প্রতীক; ‘মাটি’ সিঙ্গুর–নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলন; আর ‘মানুষ’ ছিল দলীয় রাষ্ট্রের বিপরীতে সাধারণ নাগরিককে পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি।
তৃণমূল একই সঙ্গে একাধিক সামাজিক গোষ্ঠীকে যুক্ত করে। বামবিরোধী শহুরে মধ্যবিত্ত, কৃষক, নারী, মুসলমান, দলিত, মতুয়া, স্থানীয় ক্লাব ও বামফ্রন্ট থেকে বিচ্ছিন্ন কর্মীরা একই রাজনৈতিক ছাতার নিচে আসে।
এই জোট কোনো সুসংহত মতাদর্শের ওপর দাঁড়ায়নি। এর সবচেয়ে বড় ঐক্য ছিল বামফ্রন্টকে সরানোর আকাঙ্ক্ষা এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত নেতৃত্ব।
শ্রেণির রাজনীতি থেকে কল্যাণের রাজনীতি
তৃণমূল আমলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভাষা বদলে যায়। বামফ্রন্ট যেখানে জমি, শ্রেণি ও সংগঠনের মাধ্যমে সামাজিক ভিত্তি তৈরি করেছিল, মমতার সরকার সরাসরি সুবিধা ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক কল্যাণনীতির মাধ্যমে নাগরিকের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে।
কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, সবুজ সাথী, খাদ্যসাথী, স্বাস্থ্যসাথী এবং লক্ষ্মীর ভান্ডারের মতো কর্মসূচি নারী, শিক্ষার্থী ও নিম্ন আয়ের পরিবারের কাছে সরকারের দৃশ্যমান উপস্থিতি তৈরি করে। বিশেষ করে নারীদের ব্যাংক হিসাবে সরাসরি অর্থ পাঠানো তৃণমূলের শক্তিশালী ভোটভিত্তি গড়ে তোলে।
এই মডেলে নাগরিক কোনো শ্রেণি বা সংগঠনের সদস্য হিসেবে নয়, ব্যক্তিগত সুবিধাভোগী হিসেবে রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হন। রাজনৈতিক আনুগত্য তৈরির কেন্দ্রেও আসে নিয়মিত আর্থিক সহায়তা ও পরিষেবা।
তৃণমূলের কল্যাণনীতি বাস্তব জীবনে উল্লেখযোগ্য সুবিধা দিয়েছে। মেয়েদের বিদ্যালয়ে থাকা, নারীর হাতে অর্থ পৌঁছানো এবং দরিদ্র পরিবারের চিকিৎসা ও খাদ্যনিরাপত্তায় এসব কর্মসূচির ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না।
কিন্তু এর রাজনৈতিক প্রভাবও ছিল গভীর। সুবিধাগুলো প্রায়ই সরকারের পরিবর্তে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত উপহার হিসেবে প্রচারিত হয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক কল্যাণরাষ্ট্রের বদলে নেত্রী ও সুবিধাভোগীর সরাসরি সম্পর্ক তৈরি হয়।
বাম ক্যাডারের জায়গায় তৃণমূলের স্থানীয় নেটওয়ার্ক
তৃণমূল ক্ষমতায় এসে বামফ্রন্টের দলীয়করণ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে স্থানীয় রাজনীতিতে অনেক পরিচিত প্রবণতা ফিরে আসে—শুধু নিয়ন্ত্রক দলটি বদলে যায়।
পঞ্চায়েত, পৌরসভা, স্থানীয় ক্লাব, ঠিকাদারি, নির্মাণসামগ্রী, সরকারি সুবিধার তালিকা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় তৃণমূলের স্থানীয় নেতাদের প্রভাব বাড়ে। ‘সিন্ডিকেট’, ‘কাটমানি’ ও নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ রাজ্যের রাজনৈতিক অভিধানের অংশ হয়ে যায়।
বামফ্রন্টের পতনের পর তার বহু স্থানীয় কর্মী তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন। ফলে পুরোনো ক্যাডার সংস্কৃতির একটি অংশ নতুন দলের মধ্যে স্থানান্তরিত হয়। রাজনীতি বদলালেও স্থানীয় ক্ষমতা ব্যবহারের পদ্ধতি পুরোপুরি বদলায়নি।
স্কুলশিক্ষক নিয়োগসহ বিভিন্ন দুর্নীতির মামলায় তৃণমূল সরকারের ভাবমূর্তি বড় ধাক্কা খায়। শিক্ষিত বেকার তরুণদের কাছে সরকারি চাকরি দুর্নীতি ও অনিশ্চয়তার প্রতীকে পরিণত হয়। নারীভিত্তিক কল্যাণ কর্মসূচি শক্তিশালী থাকলেও চাকরি, নিরাপত্তা ও সামাজিক গতিশীলতার আকাঙ্ক্ষা শুধু মাসিক নগদ সহায়তায় পূরণ হচ্ছিল না।
দীর্ঘ শাসনে মমতাও সেই সমস্যার মুখে পড়েন, যা একসময় বামফ্রন্টকে গ্রাস করেছিল: দল, সরকার ও নেত্রীর মধ্যে পার্থক্য ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে যায়।
বিজেপির উত্থান হঠাৎ ঘটেনি
২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে একটি আসনও জিততে পারেনি; ভোট ছিল প্রায় ৪ শতাংশ। এক দশকের মধ্যে দলটি তৃণমূলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে এবং ২০২১ সালে ৭৭টি আসন লাভ করে। ২০২৬ সালে সেই সংখ্যা ২০৭-এ পৌঁছেছে।
এই উত্থানের পেছনে কয়েকটি পরস্পরসম্পর্কিত কারণ রয়েছে।
প্রথমত, বাম ও কংগ্রেসের পতন বিরোধী রাজনীতিতে বিশাল শূন্যতা সৃষ্টি করেছিল। তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সক্ষম একমাত্র দল হিসেবে বিজেপি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে। অনেক বাম ও তৃণমূলবিরোধী ভোটার বিজেপিকে মতাদর্শগত পছন্দের চেয়ে কার্যকর বিকল্প হিসেবে দেখতে শুরু করেন।
দ্বিতীয়ত, বিজেপির সর্বভারতীয় সাংগঠনিক শক্তি, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, অর্থ এবং নির্বাচনী প্রযুক্তি রাজ্যের বিরোধী রাজনীতিকে নতুন সক্ষমতা দেয়। বুথ সংগঠন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন এবং কেন্দ্রীয় কল্যাণ কর্মসূচিকে একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়।
তৃতীয়ত, বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের বিচ্ছিন্ন হিন্দু সামাজিক গোষ্ঠীগুলোকে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিচয়ে সংগঠিত করতে সক্ষম হয়। মতুয়া নাগরিকত্বের প্রশ্ন, সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অভিবাসন, আদিবাসী অসন্তোষ, উত্তরবঙ্গের আঞ্চলিক বঞ্চনা এবং সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ—বিভিন্ন প্রশ্নকে হিন্দু সংহতির বয়ানের মধ্যে আনা হয়।
চতুর্থত, তৃণমূলের স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামোয় বঞ্চিত বা ক্ষুব্ধ অনেক নেতা-কর্মী বিজেপিতে আশ্রয় নেন। শুভেন্দু অধিকারী নিজেই তৃণমূল সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ও সংগঠক ছিলেন। তাঁর নেতৃত্ব বিজেপিকে শুধু বাইরের দল হিসেবে নয়, তৃণমূলের সাংগঠনিক ভাষা বোঝে এমন স্থানীয় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড়াতে সাহায্য করে।
২০২৬: মতাদর্শের জয়, নাকি শাসনবিরোধী বিস্ফোরণ?
২০২৬ সালের নির্বাচনে বিজেপি ২০৭ এবং তৃণমূল ৮০ আসন পেয়েছে। কংগ্রেস দুটি, সিপিআই(এম) একটি এবং অন্যরা বাকি আসনগুলো পেয়েছে। ভারতের নির্বাচন কমিশন
আসনের হিসাবে এটি নিঃসন্দেহে বিজেপির বিপুল বিজয়। কিন্তু ভোটের চিত্র আরও জটিল। প্রকাশিত হিসাবে বিজেপির ভোট প্রায় ৪৫ দশমিক ৮ শতাংশ এবং তৃণমূলের প্রায় ৪১ দশমিক ৮ শতাংশ। প্রায় চার শতাংশ ভোটের ব্যবধান আসনে ১২৭টির ব্যবধান তৈরি করেছে।
ভারতের একক আসনভিত্তিক নির্বাচনী ব্যবস্থায় সামান্য ভোটের পরিবর্তন বহু আসনের ফল একসঙ্গে বদলে দিতে পারে। তৃণমূলের বিরোধী ভোট বিজেপির দিকে কেন্দ্রীভূত হওয়ায় দলটি আসনের হিসাবে অতিরিক্ত সুবিধা পেয়েছে। বিপরীতে বাম ও কংগ্রেসের সীমিত ভোট বহু জায়গায় প্রতিযোগিতামূলক অবস্থায় পৌঁছাতে পারেনি।
ফলে ২০৭ আসনকে পশ্চিমবঙ্গের সব সামাজিক গোষ্ঠীর হিন্দুত্বের পক্ষে সর্বসম্মত রায় হিসেবে দেখা ভুল হবে। এটি হিন্দু ভোটের উল্লেখযোগ্য সংহতি, তৃণমূলবিরোধী ক্ষোভ, বিজেপির শক্তিশালী সংগঠন এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার আসন-রূপান্তর—সবকিছুর সম্মিলিত ফল।
বিজেপির বিজয়ে মতাদর্শ আছে, কিন্তু শুধু মতাদর্শ নেই। পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা আছে, স্থানীয় ক্ষোভ আছে, চাকরির দাবি আছে এবং ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্রের সন্ধানও আছে।
নারী ভোটের একচেটিয়া মালিকানা হারাল তৃণমূল
মমতার দীর্ঘ শাসনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি ছিল নারী ভোট। কিন্তু ২০২৬ সালে নারীর ভোটদানের হার পুরুষের চেয়ে বেশি হলেও তৃণমূল সেই সুবিধাকে আগের মতো ধরে রাখতে পারেনি।
বিজেপি তৃণমূলের কল্যাণ মডেল বাতিল করার পরিবর্তে আরও বেশি সুবিধার প্রতিশ্রুতি দেয়। পাশাপাশি নারীর নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও মূল্যস্ফীতির প্রশ্ন তোলে। ফলে প্রতিযোগিতা ‘কল্যাণ থাকবে কি না’ থেকে সরে ‘কে বেশি ও ভালোভাবে দেবে’—এই প্রশ্নে চলে যায়।
নতুন বিজেপি সরকারের প্রথম বাজেটেও কল্যাণনীতির ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত রয়েছে। সরকারি শূন্যপদ পূরণ, কর্মচারীদের ভাতা এবং নারীভিত্তিক সহায়তার সঙ্গে প্রশাসনিক পরিবর্তন ও আর্থিক শৃঙ্খলার কথা বলা হয়েছে। PRS Legislative Research
এর অর্থ, বিজেপি তৃণমূলের রাজনৈতিক মডেল সম্পূর্ণ ভেঙে দেয়নি। বরং তার জনপ্রিয় অংশগুলো গ্রহণ করে নিজের পরিচয় ও উন্নয়নবয়ানের সঙ্গে যুক্ত করছে।
তিন শাসনের মধ্যে কী একই রয়ে গেছে?
বামফ্রন্ট, তৃণমূল ও বিজেপি আদর্শগতভাবে এক নয়। তবু পশ্চিমবঙ্গের পালাবদলে কয়েকটি ধারাবাহিকতা লক্ষ করা যায়।
প্রথমটি শক্তিশালী সংগঠনের প্রয়োজন। বামফ্রন্ট কৃষকসভা, শ্রমিক সংগঠন ও ক্যাডারের মাধ্যমে গ্রামে পৌঁছেছিল। তৃণমূল স্থানীয় ক্লাব, জনপ্রতিনিধি ও সুবিধাভোগীর নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। বিজেপি ধর্মীয় সংগঠন, বুথ কমিটি, কেন্দ্রীয় কর্মসূচি এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রচারের সমন্বয় করছে।
দ্বিতীয়টি ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব। জ্যোতি বসুর দীর্ঘ মুখ্যমন্ত্রিত্বের পর বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য; তারপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী কর্তৃত্ব; এখন শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদি ও কেন্দ্রীয় বিজেপির প্রভাব—পশ্চিমবঙ্গে প্রতিষ্ঠান থেকে নেতার দৃশ্যমানতা বারবার বড় হয়ে উঠেছে।
তৃতীয়টি পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি। সরকারি সুবিধা, স্থানীয় কাজ, চাকরি, ঠিকাদারি ও প্রশাসনিক যোগাযোগের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের সম্পর্ক তৈরি হয়। দল বদলালে এই নেটওয়ার্কের অনেক ব্যক্তি নতুন শাসক দলে স্থানান্তরিত হন।
চতুর্থটি বিরোধীদের জায়গা সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি। দীর্ঘ শাসনে প্রতিটি দলই বিরোধী রাজনীতিকে প্রশাসনিক বা সামাজিকভাবে দুর্বল করার অভিযোগের মুখে পড়েছে। বিজেপির বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা সেই একই পরীক্ষাকে নতুনভাবে সামনে আনছে।
কী সত্যিই বদলেছে?
ধারাবাহিকতার পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অক্ষেও মৌলিক পরিবর্তন ঘটেছে।
বামফ্রন্টের রাজনীতি প্রধানত শ্রেণি, ভূমি ও শ্রমকে কেন্দ্র করে ছিল। তৃণমূল সেই রাজনীতিকে সরিয়ে কল্যাণ, আঞ্চলিক পরিচয়, সংখ্যালঘু সমর্থন এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক জনবাদের সমন্বয় তৈরি করে।
বিজেপি এই কাঠামোয় ধর্মীয় পরিচয়, জাতীয়তাবাদ, নাগরিকত্ব ও কেন্দ্র–রাজ্য সমন্বয়কে প্রধান উপাদান হিসেবে যুক্ত করেছে। আগে পশ্চিমবঙ্গের ভোটে হিন্দু পরিচয় থাকলেও তা সাধারণত জাতি, শ্রেণি, ভাষা ও আঞ্চলিক স্বার্থের ভেতরে বিভক্ত ছিল। বিজেপির বড় সাফল্য হলো এই বিচ্ছিন্ন পরিচয়গুলোকে একটি বৃহত্তর হিন্দু ভোটে রূপান্তর করা।
একই সঙ্গে ‘বাঙালি বনাম বহিরাগত’ বিতর্কও নতুন মাত্রা পেয়েছে। তৃণমূল বিজেপিকে উত্তর ভারতীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাহক হিসেবে দেখিয়েছিল। বিজেপি পাল্টা দাবি করেছে, জাতীয়তাবাদ ও হিন্দু পরিচয় বাঙালিত্বের বিরোধী নয়।
নতুন সরকারের সামনে তাই শুধু প্রশাসন নয়, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিচয় পুনর্লিখনের সুযোগ ও ঝুঁকি—দুটিই রয়েছে।
বামপন্থা কোথায় হারাল?
বামফ্রন্টের পতন ২০১১ সালে হলেও তার রাজনৈতিক শূন্যতা পূর্ণ হয় পরবর্তী দশকে। তৃণমূলবিরোধী আন্দোলনের প্রধান জায়গাটি বামরা ধরে রাখতে পারেনি; বিজেপি তা দখল করেছে।
বাম রাজনীতি একদিকে নিজের দীর্ঘ শাসনের সমালোচনামূলক মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের চাকরি, ডিজিটাল অর্থনীতি, সামাজিক পরিচয় ও সাংস্কৃতিক উদ্বেগের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ গড়ে তুলতে পারেনি।
তৃণমূলকে প্রধান শত্রু হিসেবে দেখার কৌশলও বহু বাম ভোটারকে বিজেপির দিকে ঠেলে দেয়। বিজেপি শক্তিশালী হওয়ার পর বাম দলগুলো ধর্মনিরপেক্ষতা ও শ্রেণির রাজনীতি সামনে আনলেও তখন তাদের সাংগঠনিক ভিত্তি অনেকটাই ক্ষয়ে গেছে।
২০২৬ সালে সিপিআই(এম)-এর একটি আসনে নেমে আসা শুধু নির্বাচনী পরাজয় নয়। যে রাজ্য একসময় ভারতের কমিউনিস্ট রাজনীতির সবচেয়ে বড় দুর্গ ছিল, সেখানে বামপন্থা এখন রাজনৈতিক আলোচনার প্রান্তে।
তবে শ্রেণিবৈষম্য, বেকারত্ব, অনানুষ্ঠানিক শ্রম ও কৃষিসংকট বিলীন হয়নি। প্রশ্নগুলো রয়ে গেছে; শুধু সেগুলোর রাজনৈতিক ভাষ্য ও বাহক বদলে গেছে।
বিজেপির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখন শুরু
নির্বাচন জেতা এবং পশ্চিমবঙ্গ শাসন করা এক বিষয় নয়। বিজেপি দীর্ঘদিন কেন্দ্রীয় বঞ্চনার জন্য তৃণমূলকে দায়ী করেছে এবং ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকারে বিনিয়োগ, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের সরকার থাকায় নীতিগত সমন্বয় সহজ হতে পারে।
কিন্তু এর ফল যদি সাধারণ মানুষের চাকরি, শিল্প, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় দৃশ্যমান না হয়, তাহলে কেন্দ্র–রাজ্য সমন্বয়ের স্লোগান দ্রুত রাজনৈতিক দায়ে পরিণত হবে।
দ্বিতীয় পরীক্ষা হলো সংখ্যালঘু নাগরিকের নিরাপত্তা ও আস্থা। বিজেপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে, কিন্তু রাজ্যের বড় মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে দলটির গ্রহণযোগ্যতা সীমিত। ধর্মভিত্তিক কর্মসূচি বাতিল, নাগরিকত্ব, অভিবাসন ও অভিন্ন দেওয়ানি বিধির প্রশ্ন প্রশাসনকে নতুন সংঘাতের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
তৃতীয় পরীক্ষা বাঙালি সাংস্কৃতিক পরিচয়। পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি যদি রাজ্যের ভাষা, ইতিহাস ও সামাজিক বৈচিত্র্যের সঙ্গে নিজস্ব রাজনৈতিক মতাদর্শের সামঞ্জস্য তৈরি করতে না পারে, তাহলে তাকে আবারও বহিরাগত রাজনৈতিক প্রকল্প হিসেবে দেখা হতে পারে।
চতুর্থ পরীক্ষা প্রতিষ্ঠান। তৃণমূল আমলের দলীয়করণ বন্ধ করার নামে যদি শুধু স্থানীয় ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক বদলে যায়, তাহলে ভোটারের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন ঘটবে না। বাম থেকে তৃণমূলে যেমন বহু স্থানীয় নেটওয়ার্ক স্থানান্তরিত হয়েছিল, তৃণমূল থেকে বিজেপিতেও একই প্রক্রিয়া ঘটার ঝুঁকি রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের পালাবদল আসলে কী বলছে?
পশ্চিমবঙ্গের ভোটার দ্রুত সরকার বদলান না। তারা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেন, সুবিধা ও স্থিতিশীলতার মূল্য দেন এবং বিরোধী শক্তির শাসনক্ষমতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চান। কিন্তু একবার পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিলে তা সাধারণত অর্ধেক পথে থামে না।
১৯৭৭ সালে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বামফ্রন্ট, ২০১১ সালে বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে তৃণমূল এবং ২০২৬ সালে তৃণমূলের বিরুদ্ধে বিজেপির বিপুল জয়—এই তিনটি ঘটনায় সেই প্রবণতা দেখা যায়।
এতে পশ্চিমবঙ্গের ভোটার মতাদর্শহীন—এমন নয়। বরং তাদের সিদ্ধান্তে মতাদর্শ, জীবিকার দাবি, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও কার্যকর বিকল্পের প্রশ্ন একসঙ্গে কাজ করে।
বামফ্রন্ট জমি ও গ্রামীণ মর্যাদা দিয়েছিল, কিন্তু দীর্ঘ শাসনে সংগঠনকে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থায় পরিণত করেছিল। তৃণমূল কল্যাণ ও রাজনৈতিক পরিবর্তন এনেছিল, কিন্তু সময়ের সঙ্গে স্থানীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও দুর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত হয়েছে। বিজেপি এখন পরিচয়, উন্নয়ন এবং নতুন প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে।
অতএব ২০২৬-এর ফলকে শুধু পশ্চিমবঙ্গের গেরুয়াকরণ বলা যথেষ্ট নয়। এটি তৃণমূলের বিরুদ্ধে শাসনবিরোধী রায়, হিন্দু ভোটের সংহতি, বাম–কংগ্রেসের পতন, নারী ভোটে নতুন প্রতিযোগিতা এবং কেন্দ্রের ক্ষমতার সঙ্গে রাজ্যের সংযোগ—সবকিছুর ফল।
আসল প্রশ্ন বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে কি না নয়; প্রশ্ন হলো, বিজেপি কি পশ্চিমবঙ্গের পুরোনো ক্ষমতার সংস্কৃতি বদলাতে পারবে?
যদি দলীয় নিয়ন্ত্রণের জায়গায় প্রতিষ্ঠান, পৃষ্ঠপোষকতার জায়গায় অধিকার এবং পরিচয়ের সংঘাতের জায়গায় নাগরিক সমতা প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে ২০২৬ সত্যিকারের রাজনৈতিক পরিবর্তন হতে পারে।
আর যদি শুধু লাল ও সবুজ নেটওয়ার্কের জায়গায় গেরুয়া নেটওয়ার্ক বসে, তাহলে পশ্চিমবঙ্গে সরকার বদলাবে—কিন্তু শাসনের মৌলিক সংস্কৃতি বদলাবে না।
আপনার মতামত জানানঃ