সীমান্তের কাঁটাতারের দুই পাশে দাঁড়িয়ে আছে দুটি রাষ্ট্র। মাঝখানে একটি সরু ফাঁকা ভূখণ্ড—যাকে বলা হয় ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ বা শূন্যরেখা। সাধারণত এটি মানচিত্রের একটি প্রযুক্তিগত শব্দ মাত্র। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় এই শূন্যরেখা পরিণত হয়েছে মানবিক সংকটের প্রতীকে। সেখানে দিনের পর দিন আটকে থাকছেন নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা। তাদের কারও হাতে নেই খাবার, কারও কাছে নেই বিশুদ্ধ পানি, কারও মাথার ওপর নেই আশ্রয়। রোদ, বৃষ্টি, ঝড় আর অনিশ্চয়তার মধ্যে তারা অপেক্ষা করছেন—কোন দেশ তাদের গ্রহণ করবে, কিংবা আদৌ কেউ তাদের মানুষ হিসেবে স্বীকার করবে কি না।
পশ্চিমবঙ্গের মানবাধিকার সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব ডেমোক্রেটিক রাইটস (এপিডিআর) সম্প্রতি এমনই এক উদ্বেগজনক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেছে। সংগঠনটির অভিযোগ, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ বিভিন্ন এলাকা থেকে বাংলাদেশি সন্দেহে বহু মানুষকে সীমান্তে নিয়ে এসে জোরপূর্বক বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রেও একই আচরণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি তাদের অনেককে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না, কারণ তাদের বাংলাদেশি নাগরিক হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে দুই দেশের সীমান্তের মাঝখানে আটকে পড়ছে অসংখ্য মানুষ।
এই ঘটনা কেবল সীমান্ত নিরাপত্তা বা অবৈধ অভিবাসনের প্রশ্ন নয়; এটি মানুষের মৌলিক অধিকার, রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং মানবিক মর্যাদার প্রশ্নও। কারণ কোনো ব্যক্তি যদি একটি রাষ্ট্রের নাগরিক না-ও হন, তবুও তিনি একজন মানুষ। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের ভাষায়, প্রত্যেক মানুষের জীবন, নিরাপত্তা এবং মর্যাদা রক্ষার অধিকার রয়েছে। কিন্তু সীমান্তের শূন্যরেখায় আটকে পড়া মানুষদের বাস্তবতা যেন সেই নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত।
এপিডিআরের ভাষ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর বিজেপি সরকার তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে ‘ডিটেক্ট, ডিপোর্ট, ডিলিট’ বা ‘থ্রি ডি’ নীতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। এই নীতির মূল লক্ষ্য হলো কথিত অবৈধ বাংলাদেশিদের শনাক্ত করা, তাদের আটক করা এবং পরে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো। এর অংশ হিসেবে বিভিন্ন এলাকায় হোল্ডিং সেন্টার বা আটককেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর শুরু হয়েছে সীমান্তে পুশব্যাক বা পুশইন কার্যক্রম।
সমস্যা হলো, যাদের বাংলাদেশি বলে দাবি করা হচ্ছে, তাদের অনেকের পরিচয় নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বিএসএফ বলছে তারা বাংলাদেশি, তাই ভারতের দায়িত্ব নয়। অন্যদিকে বিজিবি বলছে, তারা বাংলাদেশি—এমন কোনো প্রমাণ নেই। ফলে তাদের দায়িত্বও বাংলাদেশের নয়। এই অবস্থায় মানুষগুলো যেন রাষ্ট্রহীন এক অস্তিত্বে পরিণত হচ্ছে।
পঞ্চগড়, দিনাজপুর, নওগাঁ, ঝিনাইদহ, হবিগঞ্জসহ বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় সম্প্রতি একাধিক পুশইনের অভিযোগ সামনে এসেছে। কোথাও কয়েকজন, কোথাও আবার কয়েক ডজন মানুষকে সীমান্তে নিয়ে আসার খবর পাওয়া গেছে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। কিছু এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সীমান্তের ওপারে অসহায় মানুষের কান্না ও সাহায্যের আকুতি শোনা যাচ্ছে। কিন্তু কাঁটাতারের বেড়া, সশস্ত্র পাহারা এবং দুই দেশের অবস্থানের কারণে পরিস্থিতির দ্রুত সমাধান হচ্ছে না।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই মানুষগুলোর মানবিক অবস্থা। সীমান্তে আটকে থাকা ব্যক্তিদের কাছে পর্যাপ্ত খাদ্য নেই, নিরাপদ পানীয় জল নেই, চিকিৎসাসেবা নেই। গর্ভবতী নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। দিনের বেলায় তীব্র রোদ, রাতে বৃষ্টি কিংবা ঝড়—সবকিছুই তাদের খোলা আকাশের নিচে সহ্য করতে হচ্ছে। আধুনিক বিশ্বের একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে এমন দৃশ্য অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। কিন্তু সীমান্তের বাস্তবতা অনেক সময় রাষ্ট্রীয় নীতির নির্মম রূপ উন্মোচন করে।
এপিডিআর এই পরিস্থিতিকে ‘গভীর মানবিক সংকট’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। সংগঠনটির মতে, বিএসএফের এই কার্যক্রম শুধু অমানবিকই নয়, বরং ভারতের সংবিধানের মৌলিক চেতনার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। ভারতের সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদ আইনের দৃষ্টিতে সমতার নিশ্চয়তা দেয়। আর ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রত্যেক মানুষের জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করে। মানবাধিকার সংগঠনটির দাবি, ‘থ্রি ডি’ নীতি এই সাংবিধানিক নিশ্চয়তার পরিপন্থী।
মানবাধিকারকর্মীরা মনে করেন, কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন থাকলে তার জন্য নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে। আদালত, প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ব্যবহার করে বিষয়টি নির্ধারণ করা যেতে পারে। কিন্তু বন্দুকের মুখে সীমান্তে নিয়ে গিয়ে অন্য দেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিশ্বজুড়েই অভিবাসন একটি জটিল ইস্যু। অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক অস্থিরতা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সামাজিক সংকটের কারণে মানুষ এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়ার চেষ্টা করে। দক্ষিণ এশিয়াও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, যার বড় অংশই জনবসতিপূর্ণ। ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি এবং পারিবারিক সম্পর্কের কারণে সীমান্তবর্তী এলাকায় মানুষের চলাচল বহু পুরোনো বাস্তবতা। কিন্তু সেই বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে প্রায়ই নিরাপত্তা, অভিবাসন এবং নাগরিকত্বের প্রশ্ন সামনে আসে।
ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক সাধারণত বন্ধুত্বপূর্ণ বলেই বিবেচিত হয়। বাণিজ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু সীমান্তসংক্রান্ত ইস্যুগুলো প্রায়ই সেই সম্পর্কের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। সীমান্ত হত্যা, চোরাচালান, অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং এখন পুশইনের অভিযোগ—এসব বিষয় দুই দেশের জনগণের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। যারা সীমান্তে আটকে আছেন, তারা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অংশ নন। তারা কোনো কূটনৈতিক আলোচনারও অংশ নন। তবু তাদের জীবনই সবচেয়ে বেশি বিপন্ন হচ্ছে। একজন শিশু জানে না সে কোন দেশের নাগরিক। একজন বৃদ্ধ জানেন না তিনি কোথায় রাত কাটাবেন। একজন মা জানেন না তার সন্তানের জন্য পরবর্তী খাবার কোথা থেকে আসবে। অথচ তাদের এই অনিশ্চয়তার পেছনে রয়েছে রাষ্ট্রীয় নীতি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং সীমান্ত রাজনীতির জটিল সমীকরণ।
এপিডিআরের সহসভাপতি রঞ্জিত শূর এই পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, শূন্যরেখায় ফেলে আসা সব মানুষকে অবিলম্বে ফিরিয়ে নিতে হবে। একই সঙ্গে তিনি ভারতের ‘পুশব্যাক’ নীতি বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। তার মতে, এই নীতি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের পরিস্থিতি তৈরি করছে। তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের আহ্বানও জানিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, কোনো ব্যক্তিকে জোরপূর্বক এমন জায়গায় পাঠানো উচিত নয়, যেখানে তার নিরাপত্তা ও জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে। রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব হলো নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও মানবিক পদ্ধতি অনুসরণ করা। সীমান্তে আটকে থাকা মানুষদের অন্তত খাদ্য, পানি, চিকিৎসা এবং আশ্রয়ের মতো মৌলিক সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকাগুলোতে সম্প্রতি বিজিবিকে সতর্ক অবস্থানে দেখা গেছে। বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় প্রশাসন ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। গ্রামবাসীদেরও সচেতন করা হচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান কেবল নিরাপত্তা ব্যবস্থা দিয়ে সম্ভব নয়। প্রয়োজন দুই দেশের মধ্যে কার্যকর কূটনৈতিক সংলাপ এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি।
সীমান্তের শূন্যরেখায় বসে থাকা মানুষগুলোর গল্প আসলে আমাদের সময়ের এক কঠিন প্রশ্ন তুলে ধরে। রাষ্ট্রের সীমানা কি মানুষের জীবনের চেয়ে বড়? নাগরিকত্বের কাগজ কি মানবিক মর্যাদার একমাত্র প্রমাণ? যখন দুই দেশই কাউকে নিজের বলে স্বীকার করতে চায় না, তখন সেই মানুষ কোথায় যাবে?
আজকের পৃথিবীতে প্রযুক্তি উন্নত হয়েছে, যোগাযোগ দ্রুত হয়েছে, অর্থনীতি বৈশ্বিক হয়েছে। কিন্তু সীমান্তের এই মানুষগুলো মনে করিয়ে দেয়, মানবিকতা এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত। কাঁটাতারের দুই পাশে রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, কিন্তু মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে মানুষ—যার ক্ষুধা, ভয়, আশা এবং বেঁচে থাকার অধিকার কোনো সীমান্ত মানে না।
সেই কারণেই ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তে চলমান পুশইনের অভিযোগ শুধু একটি সংবাদ নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার মানবাধিকার পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। দুই দেশ কীভাবে এই সংকট মোকাবিলা করবে, তা শুধু সীমান্ত রাজনীতির ভবিষ্যৎ নয়, মানবিক মূল্যবোধের প্রতিও তাদের অঙ্গীকারকে প্রকাশ করবে। আর ততদিন পর্যন্ত শূন্যরেখায় দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি নারী, শিশু ও বৃদ্ধ যেন নীরবে একই প্রশ্ন করে যাবে—আমরা কি সত্যিই কারও নই?
আপনার মতামত জানানঃ