বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্যগুলোর একটি লুকিয়ে আছে দেশের মাটির নিচে। একদিকে উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ ভূগর্ভে পড়ে আছে বিলিয়ন টন কয়লার মজুদ, অন্যদিকে সেই কয়লা অক্ষত রেখেই প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার কয়লা আমদানি করছে দেশ। অর্থনীতির ভাষায় এটি শুধু সম্পদের অপব্যবহার নয়, বরং একটি কৌশলগত দ্বিধা, যা দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং শিল্পায়নের ভবিষ্যৎকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
বাংলাদেশ যখন স্বাধীনতার পর উন্নয়নের পথে হাঁটা শুরু করে, তখন দেশের প্রধান জ্বালানি ভরসা ছিল প্রাকৃতিক গ্যাস। দীর্ঘ সময় ধরে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমতে শুরু করেছে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের গতি প্রত্যাশার তুলনায় ধীর। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানার জ্বালানি চাহিদা পূরণে নতুন উৎসের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। সেই বাস্তবতায় কয়লা আবার আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত পাঁচটি প্রধান কয়লাক্ষেত্রের মোট সম্ভাব্য মজুদ প্রায় ৭ বিলিয়ন টনেরও বেশি। বড়পুকুরিয়া, ফুলবাড়ী, দীঘিপাড়া, খালাশপীর এবং জামালগঞ্জ—এই নামগুলো বহু বছর ধরে দেশের জ্বালানি আলোচনার অংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান চাহিদা বিবেচনায় এই কয়লার একটি অংশও যদি উত্তোলন করা যায়, তাহলে কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত দেশের বিদ্যুৎ খাতের জ্বালানি চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশের একমাত্র উৎপাদনশীল কয়লাখনি বড়পুকুরিয়া। সেখান থেকে যে পরিমাণ কয়লা উত্তোলন হয়, তা জাতীয় চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত সামান্য। ফলে পায়রা, রামপাল, মাতারবাড়ীসহ দেশের বড় বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সম্পূর্ণভাবে আমদানিকৃত কয়লার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এর অর্থ হলো, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখন আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওঠানামা এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে।
প্রতি বছর কয়লা আমদানিতে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়, তা শুধু একটি আর্থিক পরিসংখ্যান নয়। এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করে। ডলার সংকট দেখা দিলে কয়লা আমদানিতে সমস্যা হয়, আর কয়লা আমদানিতে সমস্যা হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্ববাজারের অস্থিরতা বাংলাদেশকে সেই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
বিশ্ব রাজনীতির যেকোনো অস্থিরতা এখন বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতেও প্রভাব ফেলতে পারে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লার দাম কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছিল। তখন দেখা যায়, জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলো কতটা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। বাজারে পণ্য থাকলেও অনেক সময় মূল্য এত বেশি হয়ে যায় যে তা কিনে আনা কঠিন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রশ্ন হলো, দেশের মাটির নিচে বিপুল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও কেন সেই সম্পদ ব্যবহার করা যাচ্ছে না?
উত্তর খুঁজতে গেলে সামনে আসে নীতি, প্রযুক্তি, পরিবেশ এবং রাজনীতির জটিল সমীকরণ। কয়লা উত্তোলনের সবচেয়ে বড় বিতর্ক হলো ওপেন-পিট নাকি ভূগর্ভস্থ পদ্ধতি। ওপেন-পিট পদ্ধতিতে দ্রুত এবং তুলনামূলক কম খরচে বিপুল পরিমাণ কয়লা উত্তোলন সম্ভব। কিন্তু এর জন্য বড় এলাকা খনন করতে হয়, যার ফলে কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বসতভিটা স্থানান্তরের প্রয়োজন হয় এবং পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি হয়।
অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ পদ্ধতি পরিবেশগতভাবে তুলনামূলক নিরাপদ হলেও এর ব্যয় অনেক বেশি এবং উৎপাদনও সীমিত। বড়পুকুরিয়ার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, এই পদ্ধতিতে প্রত্যাশিত মাত্রায় কয়লা উত্তোলন করা সব সময় সম্ভব হয় না। ফলে কোন পথ বেছে নেওয়া হবে, সেই সিদ্ধান্ত দীর্ঘদিন ধরেই ঝুলে আছে।
ফুলবাড়ী কয়লাখনিকে ঘিরে ২০০৬ সালের আন্দোলন বাংলাদেশের জ্বালানি ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেই আন্দোলনের পর সরকার কয়লা উত্তোলনের প্রশ্নে আরও সতর্ক হয়ে যায়। স্থানীয় জনগণের উদ্বেগ, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় বড় কোনো সিদ্ধান্ত আর সামনে এগোয়নি। ফলাফল হলো—কয়লা আছে, কিন্তু উত্তোলন নেই; বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, কিন্তু জ্বালানি আসে বিদেশ থেকে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো জাতীয় কয়লানীতির অনুপস্থিতি। বহু বছর আগে খসড়া তৈরি হলেও এখনো একটি পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত কয়লানীতি প্রণয়ন হয়নি। ফলে বিনিয়োগকারী, প্রযুক্তি সরবরাহকারী এবং নীতিনির্ধারকেরা একটি স্পষ্ট রূপরেখা পান না। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে সম্ভাবনাময় খাতটি স্থবির হয়ে আছে।
তবে কয়লা উত্তোলনের পক্ষে যারা কথা বলেন, তাদের যুক্তি শুধু অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগতও। তারা মনে করেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ যদি দেশীয় কয়লার মাধ্যমে নিশ্চিত করা যায়, তাহলে জ্বালানি নিরাপত্তা অনেক বেশি শক্তিশালী হবে। বৈশ্বিক সংকট বা আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা তখন দেশের ওপর তুলনামূলক কম প্রভাব ফেলবে। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, যা অন্য খাতে বিনিয়োগ করা সম্ভব।
অন্যদিকে পরিবেশবিদদের উদ্বেগও উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। বিশ্ব যখন জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব মোকাবিলা করছে, তখন নতুন করে কয়লার ব্যবহার বাড়ানো কতটা যৌক্তিক—সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত বিশ্বের অনেক দেশ ধীরে ধীরে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে। ফলে বাংলাদেশেরও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় পরিবেশগত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
তবে বাস্তবতা হলো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখনো বাংলাদেশের সব চাহিদা পূরণে সক্ষম নয়। সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুশক্তির ব্যবহার বাড়ছে, কিন্তু শিল্পায়ন, নগরায়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বর্তমান গতিতে এগোতে হলে আগামী কয়েক দশক দেশকে এখনও প্রচলিত জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, সেই জ্বালানি কি বিদেশ থেকে আমদানি করা হবে, নাকি দেশের নিজস্ব সম্পদ থেকে সংগ্রহ করা হবে?
এই বিতর্কের সহজ কোনো উত্তর নেই। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—দীর্ঘদিন ধরে সিদ্ধান্তহীনতা চলতে পারে না। কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশের জ্বালানি চাহিদা বাড়ছে। নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হচ্ছে। শিল্পকারখানার সংখ্যা বাড়ছে। অর্থনীতির আকার বড় হচ্ছে। কিন্তু সেই অর্থনীতির জ্বালানি ভিত্তি যদি ক্রমশ আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ে, তাহলে যেকোনো বৈশ্বিক সংকট দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
বাংলাদেশের মাটির নিচে থাকা কয়লা শুধু একটি খনিজ সম্পদ নয়; এটি একটি সম্ভাবনা, একটি বিতর্ক এবং একটি অসমাপ্ত সিদ্ধান্তের প্রতীক। বছরের পর বছর ধরে সেই সম্পদ মাটির নিচেই রয়ে গেছে, আর দেশের অর্থনীতি প্রতি বছর বহন করছে আমদানির ভার।
ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কোন পথে যাবে—সেটি নির্ভর করছে আজকের সিদ্ধান্তের ওপর। দেশ কি পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নিজস্ব কয়লা সম্পদ ব্যবহারের পথ খুঁজবে, নাকি সম্পদ অক্ষত রেখে আমদানিনির্ভরতার পথেই এগোবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী প্রজন্মের জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং জাতীয় কৌশলগত অবস্থান।
কারণ পৃথিবীর অনেক দেশ জ্বালানি সম্পদের অভাবে উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। এখানে সম্পদ আছে, বিতর্ক আছে, পরিকল্পনা আছে—কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো নেই। আর সেই সিদ্ধান্তহীনতার মূল্যই প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা গুনে দিচ্ছে দেশ।
আপনার মতামত জানানঃ