
মানব ইতিহাসের প্রায় সব যুগেই যৌন আচরণের বিভিন্ন রূপের উপস্থিতি দেখা যায়। একই লিঙ্গের মানুষের প্রতি আকর্ষণ বা সমকামিতাও তার ব্যতিক্রম নয়। নবীদের যুগেও এই ধরনের আচরণের উল্লেখ পাওয়া যায়—বিশেষ করে ইসলামী ঐতিহ্য, কুরআনের বর্ণনা এবং ঐতিহাসিক ব্যাখ্যায়। ইসলামী সূত্রে এই প্রসঙ্গটি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে উঠে আসে লুত (আ.)–এর কওমের ঘটনায়, যা মুসলিম ধর্মীয় বর্ণনায় সমকামিতার আলোচনা বোঝার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট তৈরি করে।
ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী, লুত (আ.) ছিলেন এমন এক নবী যিনি এমন একটি সমাজে দাওয়াত দিয়েছিলেন যেখানে নৈতিক অবক্ষয়, সহিংসতা এবং অস্বাভাবিক যৌন আচরণ ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। এই সমাজকে সাধারণত সদোম এবং গোমোরাহ অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করা হয়। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে যে সেই সমাজে পুরুষরা নারীদের পরিবর্তে পুরুষদের প্রতিই যৌন আকর্ষণ দেখাত এবং এটিকে তারা সামাজিকভাবে স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে গ্রহণ করেছিল। ইসলামী ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এটি ছিল এমন এক আচরণ যা মানব সমাজের নৈতিক সীমা লঙ্ঘন করেছিল।
কুরআনের বিভিন্ন সূরায় লুত (আ.) তার কওমকে সতর্ক করার ঘটনা উল্লেখ আছে। তিনি তাদের বলেন যে তারা এমন একটি কাজ করছে যা আগে পৃথিবীর কোনো জাতি করেনি—অর্থাৎ পুরুষের সঙ্গে পুরুষের যৌন সম্পর্ককে সামাজিক আচরণে পরিণত করা। লুত (আ.) তাদের এই আচরণ থেকে ফিরে আসার আহ্বান জানান এবং স্বাভাবিক পারিবারিক সম্পর্কের দিকে ফিরে যেতে বলেন। কিন্তু ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় বর্ণনা অনুযায়ী তার কওম সেই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে এবং বরং নবীর প্রতি বিদ্রূপ ও বিরোধিতা করে।
ইসলামী ঐতিহ্যে বলা হয়, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে লুত (আ.)–এর কওম প্রকাশ্যে এই আচরণে লিপ্ত হতে শুরু করে এবং এমনকি অতিথিদের প্রতিও অসম্মানজনক আচরণ করত। ধর্মীয় ব্যাখ্যায় এই বিষয়টি শুধু যৌন আচরণের সমস্যা হিসেবে নয়, বরং সামাজিক শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার অবক্ষয়ের একটি প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়। ইসলামী তাফসিরে উল্লেখ আছে যে তারা সহিংসতা, ডাকাতি এবং বিভিন্ন সামাজিক অপরাধেও জড়িয়ে পড়েছিল।
শেষ পর্যন্ত ইসলামী বর্ণনা অনুযায়ী, তাদের অবাধ্যতার কারণে সেই জনপদের ওপর আল্লাহর শাস্তি নেমে আসে। কুরআনে উল্লেখ আছে যে ওই জনপদ ধ্বংস হয়ে যায় এবং তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে রেখে দেওয়া হয়। এই ঘটনাকে ইসলামী শিক্ষায় নৈতিক শিক্ষা হিসেবে তুলে ধরা হয়—যেখানে বলা হয় যে কোনো সমাজ যখন নৈতিক সীমা অতিক্রম করে এবং সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে, তখন তার ফলাফল ভয়াবহ হতে পারে।
নবীদের যুগের এই বর্ণনা ইসলামী সমাজে সমকামিতার ধারণাকে প্রভাবিত করেছে। ইসলামী আইন বা শরিয়াহর আলোচনায় সমকামিতাকে সাধারণত নিষিদ্ধ কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। প্রাচীন ইসলামী আইনবিদেরা কুরআনের এই বর্ণনা এবং বিভিন্ন হাদিসের আলোকে বিষয়টি নিয়ে মতামত দিয়েছেন। তাদের মতে, সমাজের নৈতিক কাঠামো রক্ষার জন্য বিবাহভিত্তিক পরিবারব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং তার বাইরে যৌন আচরণকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
তবে ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায় যে মুসলিম সভ্যতার বিভিন্ন সময় এই বিষয়টি নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা হয়েছে। মধ্যযুগীয় কিছু সাহিত্য ও ইতিহাসে এমন উল্লেখ পাওয়া যায় যেখানে একই লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ বা আবেগের কথা উঠে এসেছে। যদিও ধর্মীয় আইন এটিকে অনুমোদন দেয়নি, তবুও সামাজিক বাস্তবতায় বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি দেখা গেছে।
নবী মুহাম্মদের যুগের আরব সমাজের ক্ষেত্রেও যৌন আচরণের বিভিন্ন রূপের উপস্থিতি ছিল বলে ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করেছেন। ইসলাম আবির্ভূত হওয়ার আগে আরব সমাজে নানা ধরনের সামাজিক ও নৈতিক অনিয়ম ছিল—যার মধ্যে কিছু যৌন আচরণও অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইসলাম সেই সমাজে একটি নতুন নৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। এই কাঠামোর মূল ভিত্তি ছিল পরিবার, বিবাহ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ।
ইসলামী শিক্ষায় বিবাহকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হয়েছে। এর মাধ্যমে পরিবার গঠন, সন্তান লালনপালন এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। ফলে যে কোনো ধরনের যৌন আচরণ যা এই কাঠামোর বাইরে চলে যায়—তা ধর্মীয়ভাবে নিরুৎসাহিত বা নিষিদ্ধ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটেই সমকামিতার প্রশ্নটি ইসলামী আইনে আলোচিত হয়েছে।
প্রাচীন ইসলামী আইনবিদেরা বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মত দিয়েছেন। কেউ কেউ এটিকে ব্যভিচারের সঙ্গে তুলনা করেছেন, আবার কেউ আলাদা অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। শাস্তি নিয়ে বিভিন্ন মত থাকলেও সাধারণভাবে এটিকে একটি গুরুতর নৈতিক অপরাধ হিসেবে দেখা হয়েছে। তবে বাস্তবে বিভিন্ন সময় ও অঞ্চলে এই আইন প্রয়োগের ধরন ভিন্ন ছিল।
আধুনিক ইতিহাসবিদেরা যখন নবীদের যুগ বা প্রাচীন সমাজগুলো বিশ্লেষণ করেন, তখন তারা মনে করেন যে সমকামিতা মানব সমাজের একটি দীর্ঘস্থায়ী বাস্তবতা। ধর্মীয় গ্রন্থগুলো সেই বাস্তবতার প্রতিক্রিয়ায় নৈতিক নির্দেশনা দিয়েছে। ফলে ধর্মীয় বর্ণনা ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার মধ্যে একটি জটিল সম্পর্ক দেখা যায়।
আজকের পৃথিবীতে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা আরও জটিল হয়ে উঠেছে। মানবাধিকার, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং সামাজিক মূল্যবোধ—সব মিলিয়ে সমকামিতা নিয়ে বিভিন্ন সমাজে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে। তবে ইসলামী ঐতিহ্যে নবীদের যুগের যে বর্ণনা পাওয়া যায়, তা এখনো মুসলিম সমাজে নৈতিক আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
নবীদের যুগেও সমকামিতার উল্লেখ পাওয়া যায় এবং ধর্মীয় বর্ণনায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও নৈতিক প্রসঙ্গ হিসেবে উঠে এসেছে। ইসলামী ঐতিহ্যে লুত (আ.)–এর কওমের ঘটনা এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে, যা মুসলিম সমাজে দীর্ঘদিন ধরে নৈতিক শিক্ষা এবং সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
ইসলামে সমকামিতার গোপন ইতিহাস
এক সময় ইসলামি সমাজে সমকামিতাকে অত্যন্ত স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে দেখা হতো বলে কিছু গবেষক দাবি করেন। মুসলিম বিশ্বের শক্তিশালী সাম্রাজ্য অটোমান সাম্রাজ্য বহু শতাব্দী ধরে সমকামী বা সমলিঙ্গের যৌন সম্পর্ককে সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ বিষয় হিসেবে দেখত না। ১৮৫৮ সালে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে যে সমকামী যৌন সম্পর্ক অপরাধ নয়।
কিছু গবেষকের মতে, পরে যখন পশ্চিমা খ্রিস্টান শক্তিগুলো উপনিবেশ স্থাপনের জন্য মুসলিম অঞ্চলে আসে, তখন তাদের প্রভাবের মাধ্যমে সমকামিতার প্রতি কঠোর নেতিবাচক মনোভাব ছড়িয়ে পড়ে।
অনেক মুসলিম বিশ্বাস করেন যে মুহাম্মদ (সা.) যৌন ও লিঙ্গ সংখ্যালঘুদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন এবং তাদের সুরক্ষা দিয়েছিলেন। তবে ইসলামের ইতিহাসের শুরুতে ফিরে তাকালে দেখা যায়, মুসলিম সমাজে যৌনতার বহুবিধ রূপের উপস্থিতি ছিল—যা অনেকের ধারণার চেয়ে বেশি জটিল।
প্রাচীন মুসলিম সমাজ অনেক সাংস্কৃতিক ধারণা গ্রহণ করেছিল প্রাচীন গ্রিক সভ্যতা থেকে। ইসলামি সাম্রাজ্যগুলো—যেমন অটোমান সাম্রাজ্য, সাফাভি সাম্রাজ্য এবং মুঘল সাম্রাজ্য—এক ধরনের সাধারণ সংস্কৃতির অংশ ছিল।
পারস্যভিত্তিক সংস্কৃতি, যা মুসলিম শাসনের অধীনে বিস্তৃত ছিল, ভারত ও আরব অঞ্চলে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। ঐতিহাসিক বর্ণনায় দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে বয়সে বড় পুরুষদের সঙ্গে দাড়িহীন তরুণদের সম্পর্কের উল্লেখ পাওয়া যায়। এই তরুণদের “আমরাদ” বলা হতো।
যখন এই তরুণদের দাড়ি গজাতে শুরু করত, তখন তারা নিজেরাই আবার আরও কমবয়সী তরুণদের প্রতি আকৃষ্ট হতো—এমন সামাজিক ধারণার উল্লেখও কিছু ঐতিহাসিক লেখায় পাওয়া যায়। সেই সময়কার কিছু সমাজে ধারণা ছিল যে একজন পুরুষ তার পরিবার ও প্রজননের দায়িত্ব পূরণ করার পর অন্য সম্পর্কেও জড়াতে পারে।
ইরানি ইতিহাসবিদ আফসানে নাজমাবাদি লিখেছেন, সাফাভি যুগের সরকারি ইতিহাসকাররা অনেক সময় শাসকদের ব্যক্তিগত যৌন জীবনের বিবরণ দিয়েছেন, কিন্তু তা নিয়ে তেমন নৈতিক বিচার করেননি।
তবে “মুখান্নাস” নামে পরিচিত কিছু মানুষের ব্যাপারে সামাজিক বিচার ছিল। এরা এমন পুরুষ ছিলেন যারা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও দাড়ি কামিয়ে রাখতেন এবং কখনো কখনো নারীত্বপূর্ণ আচরণ করতেন। কিছু গবেষক মনে করেন তারা তৃতীয় লিঙ্গ বা লিঙ্গ বৈচিত্র্যের মানুষ হতে পারেন। সমাজে তাদেরও একটি নির্দিষ্ট ভূমিকা ছিল এবং তারা অনেক সময় গৃহকর্মী বা সেবকের কাজ করতেন।
ফ্রান্সের মার্সেই শহরে বসবাসকারী সমকামী ইমাম লুদোভিক-মোহাম্মদ জাহেদ বলেছেন, প্রাচীন মুসলিম সংস্কৃতিকে বুঝতে হলে সেটিকে প্রাচীন গ্রিক সমাজের মতো করেই দেখতে হবে। তিনি বলেন, তখনকার অনেক সম্পর্ক ক্ষমতার ভারসাম্য ও সামাজিক কাঠামোর মধ্যেই গড়ে উঠত। তাই সেই সংস্কৃতিকে পুরোপুরি আদর্শ হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
স্বর্গের বর্ণনায়ও শুধু নারীর উল্লেখ নয়, পুরুষ সঙ্গীর উল্লেখ আছে বলে কিছু ব্যাখ্যাকারী দাবি করেন। কুরআনে “হুর” নামে নারীদের উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি “গিলমান” নামে চিরযুবক সেবকদের কথাও বলা হয়েছে, যারা জান্নাতে মানুষের সেবা করবে।
কুরআনের একটি আয়াতে বলা হয়েছে—অমর তরুণরা তাদের চারপাশে ঘুরে বেড়াবে; তাদের দেখলে মনে হবে ছড়িয়ে থাকা মুক্তা।
অনেকে মনে করেন যে সদোম ও গোমোরাহ শহরের কাহিনি সমকামিতার বিরুদ্ধে ঘৃণার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তবে কিছু গবেষকের মতে, সেই কাহিনিতে মূলত ধর্ষণ, সহিংসতা এবং অতিথি-অভ্যর্থনার নিয়ম ভঙ্গ করার বিষয়টিই নিন্দা করা হয়েছে।
ঐতিহাসিকেরা প্রায়ই সাহিত্য ও কবিতার মাধ্যমে অতীত সমাজ সম্পর্কে ধারণা পান। প্রাচীন মুসলিম সাহিত্যেও দুই পুরুষের পারস্পরিক প্রেম নিয়ে কবিতা পাওয়া যায় বলে গবেষকেরা উল্লেখ করেন। আবার কিছু ঐতিহাসিক নথিতে দেখা যায় যে কোনো তরুণকে জোর করে যৌন সম্পর্ক করতে বাধ্য করা আইনত অপরাধ ছিল।
কিছু লেখায় উল্লেখ আছে যে কোনো তরুণকে ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে অপরাধীর পায়ের তলায় বেত মারা হতো বা কখনো কান কেটে দেওয়া হতো। কাজার সাম্রাজ্য আমলে এমন শাস্তির প্রয়োগের উদাহরণও পাওয়া যায়।
প্রাচীন মুসলিম সমাজে নারীদের যৌন জীবন সম্পর্কে তথ্য তুলনামূলকভাবে কম পাওয়া যায়। তবে “সিহাক” শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে নারীদের মধ্যে যৌন সম্পর্ক বোঝাতে।
১৬শ শতকে অটোমান সাম্রাজ্য–এ দুই নারীর যৌন সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হতো না বলে কিছু ঐতিহাসিক উল্লেখ করেছেন। অনেক চিকিৎসক তখন বিশ্বাস করতেন যে নারীদের মধ্যে এই সম্পর্ক শারীরিক একটি সমস্যার কারণে তৈরি হয়—যার ধারণা মূলত গ্রিক চিকিৎসাবিদ্যা থেকে এসেছে।
আরব লোককাহিনিতেও নারী–নারী প্রেমের গল্প পাওয়া যায়। যেমন আল-জারকা আল-ইয়ামামা নামের এক নারীর সঙ্গে লাখমিদ রাজ্যের এক খ্রিস্টান রাজকন্যা হিন্দের প্রেমের কাহিনি। ঐতিহাসিক কাহিনি অনুযায়ী, আল-জারকা মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার পর রাজকন্যা শোক করে জীবন কাটান।
কিছু প্রাচীন বইয়ে নারী–নারী প্রেমের গল্প ও কবিতাও পাওয়া যায়। কিছু গবেষকের মতে, রাজপ্রাসাদে কখনো কখনো দুই নারী পারস্পরিক সুরক্ষা ও সহায়তার অঙ্গীকার করে চুক্তি করতেন—যা অনেকটা নাগরিক অংশীদারিত্ব বা বিবাহের মতো সম্পর্ক ছিল।
কিছু গবেষকের দাবি, নবী মুহাম্মদের সময়েও লিঙ্গ বৈচিত্র্যের মানুষ সমাজে ছিল এবং তিনি তাদের সুরক্ষা দিয়েছিলেন। তাদেরকে নির্যাতন থেকে রক্ষা করার ঘটনাও বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়।
পরবর্তীকালে ইউরোপীয় শক্তিগুলো মুসলিম বিশ্বে প্রবেশ করে—কখনো উপনিবেশ স্থাপনের মাধ্যমে, যেমন ভারত বা মিশর–এ, আবার কখনো অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের মাধ্যমে। সেই সময় পশ্চিমা সমাজের কঠোর সমকামিতা-বিরোধী আইন ও ধারণা অনেক অঞ্চলে প্রভাব ফেলতে শুরু করে।
উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, ১৮৭০ সালে ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ভারতের দণ্ডবিধিতে সমকামী যৌন সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই আইন বহু বছর কার্যকর ছিল এবং ২০১৮ সালে তা বাতিল করা হয়।
কিছু গবেষকের মতে, উপনিবেশবাদ এবং আধুনিক জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রভাবে মুসলিম সমাজে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা আরও কঠোর হয়ে ওঠে। ফলে নারীদের স্বাধীনতা সীমিত করা এবং এলজিবিটিআই মানুষের জীবনকে অপরাধ হিসেবে দেখার প্রবণতা বাড়ে।
তাদের মতে, ২০শ শতকের শুরুতে অনেক আরব সমাজ তাদের প্রাচীন ইতিহাসের কিছু দিক নিয়ে অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করে এবং ইতিহাসকে “শুদ্ধ” করার চেষ্টা করা হয়—যাতে নারীত্ব, সমকামিতা বা লিঙ্গ বৈচিত্র্যের উল্লেখ কমিয়ে দেওয়া হয়।
এই আলোচনার শেষে কিছু লেখক প্রশ্ন তোলেন—যদি ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাস ও নবীর জীবনের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করা হয়, তাহলে কি ইসলামকে এলজিবিটিআই মানুষের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে? তাদের মতে, মানবাধিকার, বৈচিত্র্য এবং মানুষের পরিচয়ের প্রতি সম্মান দেখানোই হতে পারে ইসলামের মূল নৈতিক শিক্ষার একটি ব্যাখ্যা।
আপনার মতামত জানানঃ