
ঢাকার মহাখালীর টিঅ্যান্ডটি কলোনি মাঠে মঙ্গলবার সকালটা ছিল অন্যরকম। সাধারণত এই মাঠে রাজনৈতিক সমাবেশ বা স্থানীয় মানুষের ভিড় দেখা যায়, কিন্তু সেদিনের পরিবেশে ছিল এক ধরনের আবেগ, প্রত্যাশা এবং অদ্ভুত আনন্দের মিশ্রণ। মঞ্চে চলছিল একটি সরকারি কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, কিন্তু সেই আনুষ্ঠানিকতার মাঝেই মাঠের চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের চোখে-মুখে ফুটে উঠছিল অন্যরকম আলো। কারণ উদ্বোধনী ঘোষণার আগেই অনেকের মোবাইল ফোনে এসে পৌঁছাতে শুরু করেছে একটি বহুল প্রতীক্ষিত বার্তা—সরকারি সহায়তার টাকা তাদের অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগে চালু হওয়া “ফ্যামিলি কার্ড” কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আগেই উপকারভোগীদের মোবাইল অ্যাকাউন্টে আড়াই হাজার টাকা জমা পড়তে শুরু করে। আর সেই বার্তা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কড়াইল বস্তি এবং আশপাশের এলাকার নিম্নআয়ের মানুষদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এক অনির্বচনীয় আনন্দ। কেউ মোবাইলের স্ক্রিন অন্যকে দেখাচ্ছেন, কেউ আবার বিশ্বাসই করতে পারছেন না যে সত্যিই টাকা এসে গেছে।
একজন বৃদ্ধা নারী কাঁপা হাতে তার মোবাইল ফোনটি পাশের এক তরুণীর হাতে তুলে দিয়ে বলছিলেন, “মা, দেখতো সত্যি টাকা আইছে নাকি?” তরুণী স্ক্রিনে চোখ বুলিয়ে হেসে বলল, “হ্যাঁ খালা, আড়াই হাজার টাকা আইছে।” কথাটা শোনামাত্র বৃদ্ধার চোখে পানি এসে গেল। এত অল্প টাকাও তার কাছে যেন বড় এক আশীর্বাদ। তিনি বললেন, “এই টাকায় কিছু ওষুধ কিনতে পারমু। অনেকদিন ধইরা ঠিকমতো ওষুধ খাইতে পারতেছি না।”
এই দৃশ্য শুধু একজনের নয়, সেদিন এমন অসংখ্য মানুষের গল্প ছড়িয়ে ছিল মাঠজুড়ে। কেউ ফোন হাতে নিয়ে বারবার এসএমএস পড়ছেন, কেউ আবার পরিবারের সদস্যদের ফোন করে খবরটি জানাচ্ছেন। অনেকেই বলছিলেন, জীবনে প্রথমবার কোনো সরকারি সহায়তা এত সরাসরি এবং দ্রুত হাতে পেলেন।
কড়াইল বস্তির বাসিন্দা রহিমা বেগম তিন সন্তানের মা। তার স্বামী দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। সংসারের দায়িত্ব প্রায় পুরোপুরি তার কাঁধেই। তিনি বলেন, “আমার জন্য এই টাকাটা অনেক বড় ব্যাপার। ঈদের আগে কিছু চাল-ডাল কিনতে পারব। বাচ্চাদের জন্য একটু ভালো কিছু রান্না করতে পারব।”
ঈদুল ফিতর সামনে রেখে এই সহায়তার অর্থ পাওয়ায় অনেকের আনন্দ যেন দ্বিগুণ হয়ে গেছে। সাধারণত ঈদের সময় দরিদ্র পরিবারগুলো নানা দুশ্চিন্তায় থাকেন—কীভাবে বাজার করবেন, কীভাবে সন্তানদের জন্য নতুন কাপড় কিনবেন, বা কীভাবে বাড়তি খরচ সামলাবেন। কিন্তু এই আড়াই হাজার টাকা তাদের কাছে সামান্য হলেও এক বড় স্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে।
সরকারি সূত্র জানায়, স্বচ্ছ যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এবার চূড়ান্তভাবে ৩৭ হাজার ৫৬৭টি নারীপ্রধান পরিবারকে এই কর্মসূচির জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে। তালিকা তৈরির সময় বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এমন পরিবারগুলোকে, যেখানে নারীই পরিবারের প্রধান এবং যাদের আয় খুবই সীমিত। মাঠ পর্যায়ে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে প্রকৃত দরিদ্রদের তথ্য যাচাই করে এই তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। টাকা সরাসরি উপকারভোগীদের মোবাইল অ্যাকাউন্টে পাঠানো হচ্ছে, যাতে কোনো ধরনের মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ না থাকে। অনেক সময় সরকারি সহায়তার টাকা পৌঁছাতে নানা ধরনের অনিয়ম বা প্রভাবের অভিযোগ ওঠে। কিন্তু এবার সেই সম্ভাবনা কমিয়ে আনতেই সরাসরি ডিজিটাল লেনদেনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত কর্মকর্তারা জানান, এই ব্যবস্থার ফলে উপকারভোগীদের আর কাউকে ধরনা দিতে হচ্ছে না। তাদের হাতে সহায়তার অর্থ পৌঁছে যাচ্ছে স্বচ্ছ এবং দ্রুত উপায়ে। এই প্রক্রিয়া সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারের প্রতি আস্থাও বাড়াচ্ছে।
মাঠে উপস্থিত অনেকেই বলছিলেন, তারা আগে বিভিন্ন ধরনের ভাতা বা সহায়তার কথা শুনেছেন, কিন্তু বাস্তবে তা পাওয়া খুব কঠিন ছিল। কখনো তালিকায় নাম ওঠেনি, কখনো আবার নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু এবার তারা সরাসরি মোবাইলে টাকা পেয়ে বিস্মিত এবং আনন্দিত।
কড়াইল বস্তির আরেক বাসিন্দা সালমা আক্তার বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। অনেক সময় মনে হয় আমাদের কথা কেউ ভাবে না। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে সরকার আমাদের কথাও ভাবছে।”
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই কর্মসূচি আপাতত পরীক্ষামূলকভাবে দেশের ১৩টি জেলার ১৩টি সিটি করপোরেশন এবং বিভিন্ন ইউনিয়নের ১৫টি ওয়ার্ডে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। মূল লক্ষ্য হচ্ছে একটি কার্যকর এবং স্বচ্ছ সহায়তা ব্যবস্থা তৈরি করা, যা ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে প্রয়োগ করা যাবে।
পরীক্ষামূলক এই উদ্যোগের মাধ্যমে সরকার দেখতে চাইছে, কীভাবে ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে সরাসরি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া যায়। মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতে এই কর্মসূচির পরিধি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য হলো প্রকৃত হকদারদের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া। সমাজের প্রান্তিক মানুষ যেন কোনো ধরনের হয়রানি বা প্রভাব ছাড়াই সরকারি সুবিধা পান, সেটাই এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সরাসরি নগদ সহায়তা অনেক সময় খুব কার্যকর হয়। কারণ এতে তারা নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ ব্যয় করতে পারেন। কেউ ওষুধ কিনবেন, কেউ খাবার কিনবেন, কেউ আবার সন্তানদের পড়াশোনার জন্য খরচ করবেন। ফলে এই ধরনের সহায়তা মানুষের বাস্তব জীবনে দ্রুত প্রভাব ফেলে।
মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের মুখের হাসি দেখলে সেই কথাই যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একজন বৃদ্ধা বলছিলেন, “এই টাকা বড় না, কিন্তু সময়টা বড়। ঈদের আগে এই টাকা পাইছি—এটাই বড় কথা।”
অনেকেই বলছিলেন, ঈদের বাজার করতে গেলে এখন আর পুরোপুরি ধার করতে হবে না। কেউ কেউ আবার বলছেন, এই টাকা থেকে সামান্য হলেও সঞ্চয় করার চেষ্টা করবেন।
সামাজিক উন্নয়ন বিশ্লেষকদের মতে, নারীপ্রধান পরিবারগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়াটা একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। কারণ দরিদ্র পরিবারগুলোর মধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই নারীরাই সংসারের দায়িত্ব বহন করেন। তাদের হাতে সরাসরি সহায়তা পৌঁছালে পুরো পরিবারই উপকৃত হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই উদ্যোগটি তাই অনেকের কাছে শুধু একটি অর্থ সহায়তা কর্মসূচি নয়, বরং দরিদ্র মানুষের জীবনে একটি নতুন আশা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে শহরের বস্তি ও প্রান্তিক এলাকাগুলোতে যেখানে মানুষ প্রতিদিন সংগ্রাম করে বেঁচে থাকেন, সেখানে এই ধরনের উদ্যোগ তাদের জীবনে বাস্তব পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
কড়াইল বস্তির এক তরুণী বলছিলেন, “আমরা বড় কিছু চাই না। শুধু চাই আমাদের কষ্টটা কেউ একটু বুঝুক।”
সেদিন মহাখালীর মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের চোখে-মুখে সেই অনুভূতিই যেন স্পষ্ট ছিল। সরকারি অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা, মঞ্চের বক্তৃতা বা ব্যানারের বাইরে সেখানে ছিল মানুষের বাস্তব জীবন, তাদের ছোট ছোট স্বপ্ন এবং সামান্য সহায়তায়ও ভরে ওঠা আনন্দ।
ঈদের আগে পাওয়া এই আড়াই হাজার টাকা হয়তো অর্থনীতির বড় পরিসরে খুব বড় কোনো অঙ্ক নয়। কিন্তু কড়াইলের সরু গলি, টিনের ঘর আর সংগ্রামী জীবনের ভেতর বসবাস করা মানুষের কাছে এই অর্থ যেন এক টুকরো স্বস্তি, একটুখানি নিশ্চয়তা।
আর সেই কারণেই মহাখালীর টিঅ্যান্ডটি কলোনি মাঠে সেদিন যে আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছিল, তা শুধু একটি সরকারি কর্মসূচির সাফল্যের গল্প নয়—এটি ছিল মানুষের জীবনে সামান্য সহায়তারও কত বড় মূল্য থাকতে পারে, তার এক বাস্তব
আপনার মতামত জানানঃ