মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর মাত্র দশ দিনের মাথায় বাংলাদেশে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে একটি ট্যাংকারের আগমন। সোমবার সকালে ২৭ হাজার টনের বেশি ডিজেল নিয়ে ‘শিউ চি’ নামের একটি ট্যাংকার চট্টগ্রাম বন্দরের জলসীমায় পৌঁছেছে। বিশ্বজুড়ে সংঘাতের কারণে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় এমন সময় এই চালানটি দেশে পৌঁছানোকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। শুধু এই একটি ট্যাংকারই নয়, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে আরও চারটি ট্যাংকার চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সব মিলিয়ে এসব জাহাজে প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার ২০৫ টন ডিজেল আসছে, যা দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের স্বস্তির বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সিঙ্গাপুর থেকে আসা শিউ চি ট্যাংকারটি বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের কুতুবদিয়া এলাকার কাছাকাছি অবস্থান করছে। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক ওয়েবসাইট মেরিন ট্রাফিকের তথ্যেও এই অবস্থান নিশ্চিত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বন্দরের নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর ট্যাংকারটি নির্ধারিত জেটিতে ভিড়বে এবং এরপর শুরু হবে ডিজেল খালাসের কার্যক্রম।
বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে শুরু করেছে। বাংলাদেশ সরাসরি মধ্যপ্রাচ্য থেকে ডিজেল আমদানি না করলেও বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতার প্রভাব পরোক্ষভাবে দেশের ওপর পড়তে পারে। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে বা সরবরাহ ব্যাহত হলে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং সরবরাহ চেইনেও চাপ তৈরি হয়।
এমন পরিস্থিতিতে ডিজেলের বড় চালান দেশের বন্দরে পৌঁছানো অনেকের কাছে স্বস্তির খবর হিসেবে এসেছে। তবে এর পেছনে আরেকটি বাস্তবতা কাজ করছে। যুদ্ধ শুরুর পর বাজারে আতঙ্ক তৈরি হওয়ায় অনেক জায়গায় ডিজেল কেনার প্রবণতা বেড়ে গেছে। অনেক পরিবহন মালিক, ব্যবসায়ী ও কৃষি খাতের সংশ্লিষ্টরা সম্ভাব্য সংকটের আশঙ্কায় আগাম জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। এর ফলে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ডিজেলের চাহিদা কিছুটা বেড়ে গেছে।
সরকার এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় কিছুটা পরিবর্তন এনেছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, দেশে স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক প্রায় ১২ হাজার টন ডিজেলের চাহিদা থাকে। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বর্তমানে সরবরাহ কিছুটা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন দিনে প্রায় ৯ হাজার টন করে ডিজেল সরবরাহ করা হচ্ছে, যাতে মজুত দীর্ঘ সময় ধরে বজায় রাখা যায়।
এই কৌশলের ফলে মজুত জ্বালানি দিয়ে তুলনামূলক বেশি দিন চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে। বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে যে পরিমাণ ডিজেল মজুত রয়েছে, তা দিয়ে প্রায় ১৬ থেকে ১৭ দিন চাহিদা মেটানো সম্ভব। এর সঙ্গে নতুন করে আসা ট্যাংকারগুলোর ডিজেল যুক্ত হলে মোট সরবরাহ প্রায় এক মাসের চাহিদা পূরণ করতে পারবে।
শিপিং খাতের সূত্র বলছে, শিউ চি ট্যাংকারের পর ধারাবাহিকভাবে আরও চারটি ট্যাংকার চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাবে। আজ রাতেই সিঙ্গাপুর থেকে ‘লিয়ান হুয়ান হু’ নামের আরেকটি ট্যাংকার বন্দরের জলসীমায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এতে প্রায় ৩০ হাজার টন ডিজেল রয়েছে। এরপর বৃহস্পতিবার পৌঁছানোর কথা রয়েছে ‘এসপিটি থেমিস’ নামের ট্যাংকারটির, যাতে প্রায় ৩০ হাজার ৪৮৪ টন ডিজেল রয়েছে।
এরপর আগামী শনিবার বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে ‘র্যাফেলস সামুরাই’ নামের একটি ট্যাংকারের। একই সময়ের মধ্যে আসবে ‘চ্যাং হ্যাং হং টু’ নামের আরেকটি ট্যাংকার। এই দুটি জাহাজেও প্রায় ৩০ হাজার টন করে ডিজেল রয়েছে বলে জানা গেছে।
এই চারটি ট্যাংকারের স্থানীয় প্রতিনিধি প্রতিষ্ঠান প্রাইড শিপিং লাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী এক সপ্তাহের মধ্যেই সবগুলো ট্যাংকার চট্টগ্রাম বন্দরের জলসীমায় পৌঁছে যাবে। বন্দরে পৌঁছানোর পর পালাক্রমে এগুলো থেকে ডিজেল খালাস করা হবে। বন্দরের সক্ষমতা ও জেটির প্রাপ্যতার ওপর নির্ভর করে খালাসের সময় নির্ধারণ করা হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর এবং দেশের অধিকাংশ জ্বালানি আমদানিই এই বন্দরের মাধ্যমে আসে। বন্দরে জ্বালানি তেলবাহী ট্যাংকার ভিড়ানোর জন্য নির্দিষ্ট জেটি রয়েছে, যেখানে নিরাপত্তা ও পরিবেশগত মান বজায় রেখে তেল খালাস করা হয়। খালাসের পর পাইপলাইনের মাধ্যমে এসব তেল বিভিন্ন ডিপোতে পাঠানো হয়, সেখান থেকে সারা দেশে বিতরণ করা হয়।
বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় ডিজেলের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশই ডিজেল দিয়ে পূরণ করা হয়। কৃষি, পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্প খাত—সব জায়গাতেই ডিজেলের ব্যবহার রয়েছে। বিশেষ করে সেচের মৌসুমে কৃষি খাতে ডিজেলের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
বাংলাদেশে যে পরিমাণ ডিজেল ব্যবহৃত হয়, তার বড় অংশই সরাসরি আমদানি করতে হয়। দেশে নিজস্ব তেল উৎপাদন অত্যন্ত সীমিত হওয়ায় প্রায় পুরো চাহিদাই বিদেশ থেকে আনতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীলতা অনেক বেশি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশ মোট ২৩ লাখ ২৮ হাজার টন ডিজেল আমদানি করেছে। এই আমদানির বড় অংশ এসেছে এশিয়ার কয়েকটি দেশ থেকে। এর মধ্যে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং ভারত থেকে এসেছে প্রায় ৭৮ শতাংশ ডিজেল।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশ থেকে সরাসরি ডিজেল আমদানি করা হয়নি। সাধারণত মধ্যপ্রাচ্যকে বিশ্বের অন্যতম বড় জ্বালানি উৎস হিসেবে ধরা হলেও বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে পরিশোধিত ডিজেলের জন্য বেশি নির্ভর করছে এশিয়ার পরিশোধনাগারসমৃদ্ধ দেশগুলোর ওপর।
সিঙ্গাপুর দীর্ঘদিন ধরেই এশিয়ার অন্যতম বড় তেল পরিশোধন ও বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে অপরিশোধিত তেল এনে সেখানে পরিশোধন করা হয় এবং পরে বিভিন্ন দেশে সরবরাহ করা হয়। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশ সিঙ্গাপুর থেকে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করে থাকে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক পরিস্থিতির অনিশ্চয়তার সময় সরবরাহের উৎস বৈচিত্র্যময় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের ওপর নির্ভরতা বেশি হলে সেই অঞ্চলে সংঘাত বা সংকট দেখা দিলে সরবরাহে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলের সঙ্গে জ্বালানি আমদানি সম্পর্ক বজায় রাখা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে বাজারে জ্বালানির স্বাভাবিক সরবরাহ বজায় রাখা এবং আতঙ্কজনিত কেনাকাটা নিয়ন্ত্রণ করা। জ্বালানি খাতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে এখনো কোনো প্রকৃত সংকট তৈরি হয়নি। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতি অনিশ্চিত হওয়ায় সতর্ক অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে ধারাবাহিকভাবে ট্যাংকার পৌঁছানোর বিষয়টি সেই সতর্ক পরিকল্পনারই অংশ। নিয়মিত আমদানি বজায় রেখে মজুত বাড়ানোর মাধ্যমে সম্ভাব্য ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে করে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং মূল্যস্থিতি বজায় রাখা সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে পরিবহন ও কৃষি খাতের প্রতিনিধিরাও বলছেন, ডিজেলের সরবরাহ স্থিতিশীল থাকাটা তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জ্বালানি সংকট দেখা দিলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে এই দুই খাতে। পরিবহন ব্যাহত হলে পণ্য সরবরাহে সমস্যা তৈরি হয় এবং কৃষি খাতে সেচ কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও বাংলাদেশে ডিজেলের বড় চালান আসা জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। নতুন করে আসা পাঁচটি ট্যাংকারের ডিজেল দেশের জ্বালানি সরবরাহকে আরও স্থিতিশীল করতে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে। বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যেও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার এই প্রচেষ্টা আগামী দিনগুলোতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ