মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূরাজনীতিতে বহুদিন ধরেই একটি প্রশ্ন আলোচনার কেন্দ্রে ঘুরপাক খাচ্ছে—ইরান কি তাদের গোপন উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে কোনো বড় যুদ্ধে সত্যিই পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারবে? সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান–এর ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা শুধু আঞ্চলিক রাজনীতিতেই নয়, বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তা আলোচনারও অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে ইরান এমন সব দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের চিত্র বদলে দিতে পারে। অন্যদিকে তেহরানের দাবি, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কেবল প্রতিরক্ষার জন্য, যাতে বিদেশি আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করা যায়।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নের পেছনে ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার বড় ভূমিকা রয়েছে। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত চলা ইরান–ইরাক যুদ্ধ দেশটির সামরিক কৌশল পুরোপুরি বদলে দেয়। সেই সময়ে ইরাক ইরানের বিভিন্ন শহরের ওপর ধারাবাহিকভাবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। তখন ইরানের কাছে সমমানের জবাব দেওয়ার মতো প্রযুক্তি ছিল না। সেই অভিজ্ঞতা তেহরানকে বুঝিয়ে দেয় যে আধুনিক যুদ্ধে টিকে থাকতে হলে শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা তৈরি করা অপরিহার্য। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকেই ইরান ধীরে ধীরে নিজস্ব গবেষণা, উৎপাদন ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি গড়ে তোলে।
প্রথম দিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি খুব উন্নত ছিল না। বিভিন্ন দেশের সহায়তায় তারা স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে শুরু করে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশটির বিজ্ঞানী ও সামরিক প্রকৌশলীরা নিজস্ব প্রযুক্তি উন্নয়নে জোর দেন। বর্তমানে ইরান দাবি করে যে তারা কয়েক হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে এমন কিছু রয়েছে, যেগুলোকে শনাক্ত করা কঠিন এবং যেগুলো দ্রুত গতিতে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পারে।
ইরানের সামরিক কৌশলের মূল ভিত্তিই হলো ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি। কারণ তাদের বিমান বাহিনী তুলনামূলকভাবে পুরোনো এবং আধুনিক যুদ্ধবিমান সংগ্রহ করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে। ফলে আকাশপথে শক্তি বাড়ানোর বদলে তেহরান ক্ষেপণাস্ত্রকে প্রধান প্রতিরোধ শক্তি হিসেবে গড়ে তুলেছে। ইরানের সামরিক পরিকল্পনায় এমন ধারণা কাজ করে যে যদি কোনো বড় শক্তি দেশটির ওপর হামলা চালায়, তাহলে ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে দ্রুত ও ব্যাপক পাল্টা আঘাত হানা সম্ভব হবে।
এই কৌশল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন ইরান তাদের সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ হিসেবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র–এর মতো শক্তিশালী দেশকে বিবেচনায় রাখে। এই দুই দেশেরই উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। তাই ইরান চেষ্টা করছে এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে, যেগুলো অত্যন্ত দ্রুতগতির এবং যেগুলো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ফাঁকি দিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান দাবি করেছে যে তারা এমন কিছু নতুন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে, যেগুলোকে প্রতিহত করা খুবই কঠিন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি মূলত প্রতিরোধের কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই কৌশলের মূল ধারণা হলো—যদি কোনো শক্তিশালী দেশ ইরানের ওপর হামলা করে, তাহলে তার মূল্য এত বেশি হবে যে আক্রমণকারী দেশও বড় ক্ষতির মুখে পড়বে। ফলে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ হামলার আগে বহুবার ভাবতে বাধ্য হবে। এই ধরনের কৌশলকে অনেক সামরিক বিশ্লেষক প্রতিরোধভিত্তিক সামরিক নীতি হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে, বাস্তব যুদ্ধে এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কতটা কার্যকর হতে পারে। কারণ আধুনিক যুদ্ধে শুধু ক্ষেপণাস্ত্রই সবকিছু নয়। উন্নত গোয়েন্দা ব্যবস্থা, আকাশ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, সাইবার সক্ষমতা এবং সমন্বিত সামরিক কৌশলও বড় ভূমিকা রাখে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ইসরায়েলের বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম উন্নত বলে বিবেচিত। ফলে কোনো সংঘাতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ পুরোপুরি সফল হবে কি না, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে।
তবে এটাও সত্য যে ইরান গত এক দশকে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিভিন্ন সামরিক মহড়া এবং পরীক্ষায় তারা এমন ক্ষেপণাস্ত্র প্রদর্শন করেছে, যেগুলো নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম বলে দাবি করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে এসব ক্ষেপণাস্ত্রের গতিবেগ ও গতিপথ পরিবর্তনের ক্ষমতাও রয়েছে বলে বলা হয়, যা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করতে পারে।
ইরান শুধু নিজের ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করেই থেমে থাকেনি। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতে তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলোকেও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে। এই কারণে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। কারণ একটি সম্ভাব্য সংঘাতে শুধু রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী নয়, বরং বিভিন্ন অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অংশ নিতে পারে।
বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তির সবচেয়ে বড় প্রভাব হচ্ছে মানসিক ও কৌশলগত। অর্থাৎ এটি সম্ভাব্য প্রতিপক্ষকে সতর্ক রাখে এবং যুদ্ধের পরিকল্পনায় নতুন হিসাব যোগ করতে বাধ্য করে। একটি সংঘাতে যদি শত শত ক্ষেপণাস্ত্র একসঙ্গে নিক্ষেপ করা হয়, তাহলে উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও চাপে পড়ে যেতে পারে। ফলে যুদ্ধের প্রথম ধাপেই বড় ধরনের ধাক্কা তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
তবে ইরানের জন্য চ্যালেঞ্জও কম নয়। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তাদের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলেছে। উন্নত উপাদান, যন্ত্রাংশ এবং প্রযুক্তি সংগ্রহ করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। তবুও দেশটি নিজেদের গবেষণা ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য। মধ্যপ্রাচ্যে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি দেশ আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। ফলে ভবিষ্যতের কোনো সংঘাত শুধু একতরফা হবে না; বরং প্রযুক্তি ও কৌশলের জটিল প্রতিযোগিতা দেখা যেতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ইরানের গোপন উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ভবিষ্যতের কোনো সংঘাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সেগুলো একাই যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণ করবে—এমনটা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। আধুনিক যুদ্ধ এখন বহুস্তরীয় এবং প্রযুক্তিনির্ভর। সেখানে ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি অবশ্যই একটি বড় উপাদান, কিন্তু সেটিই শেষ কথা নয়।
তবুও একটি বিষয় পরিষ্কার—ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তিকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে চায়, যাতে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ কোনো সংঘাতে জড়ানোর আগে বহুবার হিসাব কষতে বাধ্য হয়। আর এই কৌশলই হয়তো তেহরানের সামরিক নীতির মূল লক্ষ্য—যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই প্রতিপক্ষকে নিরুৎসাহিত করা।
আপনার মতামত জানানঃ