
বাংলাদেশের উৎপাদনমুখী শিল্পে নারী শ্রমিকের উপস্থিতি কমে যাওয়ার যে প্রবণতা গত এক দশক ধরে তৈরি হয়েছে, তা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনাকে নির্দেশ করে না; বরং দেশের শ্রমবাজার, শিল্পনীতি, প্রযুক্তিগত রূপান্তর, রফতানি নির্ভর উৎপাদন কাঠামো এবং সামাজিক বাস্তবতার জটিল সমন্বয়ে জন্ম নেওয়া একটি গভীর কাঠামোগত সংকটকে সামনে নিয়ে আসে। একসময় তৈরি পোশাক শিল্পসহ অন্যান্য উৎপাদনশীল খাতে নারী শ্রমিকরাই ছিল প্রধান শক্তি। ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পরিচয়ের গর্বের পেছনে লাখ লাখ নারীর ঘাম, শ্রম এবং সংগ্রাম ছিল দৃশ্যমান। অথচ সেই নারীরাই আজ ধীরে ধীরে উৎপাদনশিল্প থেকে হারিয়ে যাচ্ছেন। র্যাপিড এবং এফইএস বাংলাদেশের যৌথ গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৩ সালে যেখানে উৎপাদনমুখী শিল্পে নারীকর্মীর সংখ্যা ছিল সাড়ে ৩৭ লাখের বেশি, ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ লাখে। অর্থাৎ মাত্র এক দশকের ব্যবধানে প্রায় ১৮ লাখ নারী শ্রমিক শ্রমবাজার থেকে সরে গেছেন। একটি দেশে যেখানে নারীর কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি, নারীর আর্থিক স্বাবলম্বন এবং নারী উন্নয়নের কথাই সবচেয়ে বেশি বলা হয়, সেখানে বিপরীতমুখী এ পরিসংখ্যান উদ্বেগের এক নতুন মাত্রা তৈরি করেছে।
এই পতনকে আরও স্পষ্ট করে তোলে আরেকটি তথ্য—উৎপাদনশিল্পে নারীদের অংশগ্রহণ ২০১৩ সালে ছিল ৪০ শতাংশ, যা এখন নেমেছে ২৪ শতাংশে। অর্থাৎ ব্যবস্থার কোথাও কোনো মৌলিক ত্রুটি রয়েছে, যার কারণে যেই শিল্প একসময় নারী শ্রমিকের ওপরে দাঁড়িয়েছিল, সেই শিল্পই এখন নারীর জন্য ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে উঠছে। গবেষণার ভাষায় প্রধান কারণ তিনটি—অটোমেশন, দক্ষতার ঘাটতি এবং কর্মপরিবেশের সীমাবদ্ধতা। প্রযুক্তি উন্নত হওয়া অবশ্যই শিল্পের জন্য অপরিহার্য, কিন্তু প্রশ্ন হলো—প্রযুক্তির গতির সঙ্গে শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধির সমন্বয় কি করা হয়েছে? নাকি প্রযুক্তির উন্নয়ন হয়েছে শুধুই পুঁজির স্বার্থে, যেখানে শ্রমিককে ধরা হয়েছে ব্যয়সাপেক্ষ একটি উপাদান হিসেবে? গবেষণা বলছে, রফতানি আয় বাড়লেও কর্মসংস্থান বাড়ছে না। ২০১০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে তৈরি পোশাক খাতে রফতানি ১২.৫ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৪০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও মোট কর্মসংস্থানের সংখ্যা প্রায় একই রয়ে গেছে, যা প্রমাণ করে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে শ্রমনির্ভর নয়, বরং ক্রমাগত পুঁজিনির্ভর ও অটোমেশননির্ভর।
এখানে নারী শ্রমিকদের সংকোচন আরও তীব্রভাবে ধরা পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, আগে প্রতি এক মিলিয়ন ডলার রফতানির জন্য ৫৪৫ জন শ্রমিকের প্রয়োজন হতো, এখন সেই প্রয়োজন নেমে এসেছে ৯০ জনের নিচে। অর্থাৎ উৎপাদন দ্রুতগতিতে অটোমেশনে নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে এবং নারীর তুলনায় পুরুষ শ্রমিক বা প্রযুক্তিগত দক্ষ কর্মীর চাহিদাই বেশি হচ্ছে। আরও একটি বাস্তবতা হলো, যেসব কাজে আগে নারীরা সহজে যুক্ত হতে পারতেন—যেমন সেলাই, কাটিং, কোয়ালিটি চেকিং—সেগুলোর বহু জায়গায় এখন মেশিন ব্যবহার হচ্ছে। ফলে নারী শ্রমিকরা ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ছেন। আর যেসব খাতে দক্ষতার ঘাটতি পূরণ না হলে কাজ করা সম্ভব নয়, সেখানে প্রশিক্ষণের অভাব তাদের আরও দুর্বল করে দিচ্ছে। দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি নিয়ে সরকারের নানা ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে লক্ষ্যমাত্রাভিত্তিক কাজ হচ্ছে কম। বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের জন্য উপযোগী দক্ষতা উন্নয়ন কর্মশালা, নিরাপদ পরিবেশ, ডে কেয়ার সুবিধা, যাতায়াত নিরাপত্তা—এসব বাস্তব সুবিধার অভাব তাদের চাকরি ধরে রাখাকে কঠিন করে তুলছে।
উৎপাদনশিল্পে চাকরি কমার কারণ শুধু প্রযুক্তিগত রূপান্তর নয়। গবেষণায় আরেকটি বড় সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে কর্মপরিবেশের সীমাবদ্ধতা। বিশেষত নারী শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা এখনও অনেক কারখানায় সমস্যাজনক। মাসিক ছুটি, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, ডে কেয়ার, আলাদা নিরাপদ বিশ্রামঘর এবং যৌন হয়রানিমুক্ত কর্মপরিবেশ—এসব মৌলিক অধিকার না থাকলে নারী কর্মীর টিকে থাকা স্বাভাবিকভাবেই কঠিন হয়ে পড়ে। শিল্প মালিকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, কর্মস্থলে এসব সুবিধা নিশ্চিত করতে হলে খরচ বাড়বে, প্রতিযোগিতায় তারা পিছিয়ে পড়বেন। ফলে নারীর জন্য কর্মপরিবেশ উন্নত করার বিষয়টি নীতিগত আলোচনায় থাকলেও বাস্তবে খুব বেশি অগ্রগতি ঘটছে না।
গবেষণায় শিল্পখাতের আরেকটি বিস্ময়কর দিকও উঠে এসেছে। গত এক দশকে শিল্পখাতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ছিল গড়ে ১০ শতাংশ, কিন্তু একই সময়ে শিল্পখাতে মোট কর্মসংস্থান কমেছে ১৪ লাখ। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের মধ্যে এক ধরনের ‘ডিসকানেক্ট’ তৈরি হয়েছে। প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, উৎপাদন বাড়ছে, রফতানি বাড়ছে—কিন্তু শ্রমিক কমছে। এটি একটি গভীর কাঠামোগত সংকটের ইঙ্গিত দেয়। অর্থনীতি তখনই টেকসই ধরা হয় যখন প্রবৃদ্ধির সুফল শ্রমবাজারে প্রতিফলিত হয়। কিন্তু বাংলাদেশের শিল্পখাত সেই পরীক্ষায় এখন ব্যর্থতার সীমানায় দাঁড়িয়ে।
এসবের বিপরীতে আরও একটি বাস্তবতা হচ্ছে, দেশের কৃষিখাতে এখনও মোট কর্মসংস্থানের ৪৫ শতাংশ মানুষ নিযুক্ত রয়েছেন, অথচ কৃষিক্ষেত্রের জিডিপি অবদান মাত্র ১১ শতাংশ। অর্থাৎ কৃষি এখনও একটি ‘ওভারবার্ডেনড’ সেক্টর—যেখানে উৎপাদনশীলতা কম, আয় কম, এবং মানুষের সংখ্যা বেশি। এই বিশাল কর্মসংস্থান চাপের একটি অংশ যদি উৎপাদনশিল্পে আসতে পারত, তবে প্রবৃদ্ধি আরও প্রাণবন্ত হত। কিন্তু উৎপাদনমুখী শিল্পে নারীর পাশাপাশি তরুণ জনগোষ্ঠীও এখন স্থান সংকটের মুখে। গবেষণায় উঠে এসেছে, যুব বেকারত্বের হার বর্তমানে ৮ শতাংশের বেশি—সামগ্রিক বেকারত্বের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অর্থাৎ দেশের ভবিষ্যৎ শ্রমশক্তি—যুবসমাজ—শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে কম।
এ পরিস্থিতিতে গবেষণা উপস্থাপন অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞরা যে মন্তব্য করেছেন, সেগুলো পরিস্থিতির গভীরতাকে আরও পরিষ্কার করে। আইএলও বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স তুনিয়ন বলেন, শ্রম-কেন্দ্রিক নীতি ছাড়া এই সংকট কাটানো সম্ভব নয়। প্রযুক্তির ব্যবহার অবশ্যই দরকার, তবে তার সঙ্গে শ্রমিকের অধিকার, দক্ষতা উন্নয়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থানের ভারসাম্য বজায় রাখা অপরিহার্য। তিনি শিশু যত্ন নীতিমালা উন্নত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন, যা নারী শ্রমিকের পুনঃঅংশগ্রহণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
গেস্ট অব অনার ড. সায়েমা হক বিদিশা বলেন, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হলে শিল্পখাতে দক্ষতার সঙ্গে বেসরকারি চাহিদার সমন্বয় ঘটাতে হবে। তিনি আরও বলেন, গ্রামীণ বিনিয়োগ, লক্ষ্যভিত্তিক প্রণোদনা, শ্রমিক অধিকার সুরক্ষা এবং ফ্রিল্যান্সিং খাতে সহায়তা তরুণদের কর্মসংস্থানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য আসে প্রধান অতিথি ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের কাছ থেকে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য হ্রাসের যে সফলতা দেখা গেছে, তার কারণে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে আত্মতুষ্টি তৈরি হয়েছিল। ফলে কর্মসংস্থান খাতের দুর্বলতা চোখ এড়িয়ে গেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রবৃদ্ধি বাড়লেও কর্মসংস্থান কমছে—এটা একটি মৌলিক কাঠামোগত দুর্বলতাকে নির্দেশ করে। বিশেষত নারী কর্মীর দ্রুত সরে যাওয়ার বিষয়টিকে তিনি সংকটের সবচেয়ে বড় বার্তা হিসেবে উল্লেখ করেন।
অতএব, বাংলাদেশের উৎপাদনমুখী শিল্পে যে পরিবর্তন ঘটছে তা মোটেও ক্ষণস্থায়ী নয়। এটি শ্রমবাজারের অভিমুখ বদলে দিচ্ছে, সামাজিক কাঠামোকে প্রভাবিত করছে এবং সবচেয়ে বেশি আঘাত করছে নারীর ক্ষমতায়ন ও আর্থিক স্বাধীনতার ওপর। যদি এখনই শ্রম-কেন্দ্রিক নীতি, দক্ষতা উন্নয়ন, ডে কেয়ার সুবিধা, নিরাপদ পরিবেশ, নারী-বান্ধব কর্মঘন্টা, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিল্পনীতি গ্রহণ করা না হয়, তবে আগামী দশকে নারীশক্তির সংকোচন আরও তীব্র হবে। বাংলাদেশের উৎপাদনশীলতা তখন সংখ্যার প্রবৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ থাকবে, কিন্তু মানবিক উন্নয়ন, সামাজিক অগ্রগতি এবং সমতাভিত্তিক অর্থনীতির স্বপ্ন আরও দূরে সরে যাবে।
আপনার মতামত জানানঃ