বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর দেশের রাজনৈতিক আকাশে এক নতুন বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ সময় পর রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর দলটি সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, আর রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত নাম এখন দলীয় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। নির্ভরযোগ্য দলীয় সূত্রগুলো বলছে, তিনিই হচ্ছেন নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী, এবং সম্ভবত প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও নিজের কাছে রাখবেন। আগামী ১৭-১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নতুন মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠিত হতে পারে—এমন সম্ভাবনা নিয়ে রাজধানীর রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে জোর আলোচনা।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কেমন হতে যাচ্ছে বিএনপির নতুন মন্ত্রিসভা? দলীয় স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্তের ওপর চূড়ান্ত তালিকা নির্ভর করলেও বিভিন্ন গণমাধ্যম, রাজনৈতিক মহল এবং দলীয় অভ্যন্তরীণ সূত্রের আলোচনায় একটি সম্ভাব্য কাঠামো ইতোমধ্যেই ভেসে উঠেছে। সেই তালিকা যেমন অভিজ্ঞ রাজনীতিকদের সামনে নিয়ে আসছে, তেমনি আলোচনায় রয়েছে টেকনোক্র্যাট, অর্থনীতিবিদ এবং জোটসঙ্গীদের প্রতিনিধিত্বও।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের সম্ভাব্য দায়িত্ব গ্রহণ বিএনপির জন্য কেবল সাংগঠনিক নয়, প্রতীকী অর্থেও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন প্রবাসে থেকে দলকে নেতৃত্ব দেওয়া, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মাঠে সক্রিয় ভূমিকা এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নতুন বার্তা পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টার পর এবার তিনি সরাসরি প্রশাসনিক দায়িত্বে আসতে যাচ্ছেন। বিএনপির নেতারা বলছেন, এটি হবে ‘নীতিগত সংস্কার ও প্রশাসনিক পুনর্গঠনের সরকার’। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় নিজের কাছে রাখার সম্ভাবনা ইঙ্গিত করছে যে নিরাপত্তা ও কৌশলগত সিদ্ধান্তে তিনি সরাসরি নিয়ন্ত্রণ রাখতে চান।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কার নাম আসবে, সেটিও কূটনৈতিক মহলে বড় আলোচনার বিষয়। আলোচিত দুটি নাম—হুমায়ুন কবির এবং আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। হুমায়ুন কবির আন্তর্জাতিক বিষয়ক যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দীর্ঘদিন বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে কাজ করেছেন। অন্যদিকে আমীর খসরু ২০০১ সালের সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও কূটনীতিতে অভিজ্ঞ। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা, আঞ্চলিক সম্পর্ক এবং উন্নয়ন সহযোগিতার প্রশ্নে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হবে নতুন সরকারের অগ্রাধিকারের জায়গা। ফলে এই পদে অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতা—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রে আলোচনায় আছেন ড. রেজা কিবরিয়া। তিনি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর সাবেক জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ। বৈদেশিক ঋণ, মুদ্রাস্ফীতি, রিজার্ভ সংকট ও বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একজন পেশাদার অর্থনীতিবিদকে সামনে আনার বার্তা দিতে পারে বিএনপি। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারই হবে নতুন সরকারের প্রথম ও প্রধান পরীক্ষা—এমন মত অনেক বিশ্লেষকের।
আইন মন্ত্রণালয়ের সম্ভাব্য মুখ হিসেবে আলোচনায় আছেন মো. আসাদুজ্জামান। তিনি সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল। পাশাপাশি মাহবুব উদ্দিন খোকন-এর নামও ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিচারব্যবস্থা সংস্কার, মানবাধিকার ইস্যু এবং রাজনৈতিক মামলাগুলোর পুনর্বিবেচনা—এইসব সংবেদনশীল ইস্যু সামনে থাকায় আইনমন্ত্রী নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য দুই নাম—মির্জা আব্বাস এবং হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। আইনশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নির্বাচন-পরবর্তী উত্তেজনা সামাল দেওয়া—এসব দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওপরই বর্তাবে। মির্জা আব্বাস পূর্বে মন্ত্রী ছিলেন; অন্যদিকে অবসরপ্রাপ্ত মেজর হাফিজ উদ্দিনের প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সম্ভাব্য দায়িত্বে আলোচনায় আছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি সাবেক প্রতিমন্ত্রী এবং দীর্ঘদিন দলের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করেছেন। তবে তার নাম রাষ্ট্রপতি পদেও আলোচিত হচ্ছে—ফলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে দলীয় কৌশলের ওপর।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন সালাউদ্দিন আহমেদ এবং আবারও আমীর খসরুর নাম। রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারণ, শিল্পোন্নয়ন এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্ভাব্য দায়িত্ব পেতে পারেন আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি ২০০১-২০০৬ মেয়াদে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। পাঠ্যক্রম সংস্কার, উচ্চশিক্ষায় আন্তর্জাতিক মানোন্নয়ন এবং কর্মমুখী শিক্ষার প্রসার—এই খাতে সংস্কারের প্রত্যাশা অনেক।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আলোচনায় আছেন ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং চিকিৎসক হিসেবে পরিচিত। স্বাস্থ্যখাতে অবকাঠামো উন্নয়ন, জেলা পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ এবং ওষুধনীতিতে সংস্কার তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সম্ভাব্য দায়িত্বে আছেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। প্রবীণ এই নেতার প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা রয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়ন ও যোগাযোগ খাতের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে তার অগ্রাধিকার।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে আলোচনায় আছেন আব্দুল আউয়াল মিন্টু এবং খন্দকার মোশারফ হোসেন। জ্বালানি সংকট, গ্যাস সরবরাহ ও নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসার—এই খাতে নীতিগত সিদ্ধান্ত অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
শিল্প মন্ত্রণালয়ে সম্ভাব্য মুখ আব্দুস সালাম পিন্টু অথবা ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে নতুন সরকারের প্রতিশ্রুতির কেন্দ্রে।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে আলোচনায় রয়েছেন রুহুল কবির রিজভী এবং আব্দুল মঈন খান। গণমাধ্যম নীতি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের নিয়ন্ত্রণ—এসব ইস্যুতে এই মন্ত্রণালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
জোটসঙ্গীদের প্রতিনিধিত্ব নিয়েও আলোচনা চলছে। জোনায়েদ সাকি (গণসংহতি আন্দোলন), আন্দালিভ রহমান পার্থ (বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি) এবং ববি হাজ্জাজ (এনডিএম) সম্ভাব্য মন্ত্রী হিসেবে আলোচনায়। এতে বোঝা যায়, বিএনপি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জোট সরকার গঠনের দিকেই এগোচ্ছে।
টেকনোক্র্যাট কোটায় নজরুল ইসলাম খান, বেগম সেলিমা রহমান এবং মাহদী আমিনের নামও আলোচিত হচ্ছে। পাশাপাশি সংখ্যালঘু ও নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার কথাও বলা হচ্ছে। শিমুল বিশ্বাস ও শামা ওবায়েদ-এর মতো তরুণ ও নারী নেতৃত্বের সম্ভাব্য অন্তর্ভুক্তি দলটির আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভাবমূর্তি তুলে ধরতে পারে।
সব মিলিয়ে বিএনপির সম্ভাব্য মন্ত্রিসভা অভিজ্ঞ রাজনীতিক, পেশাজীবী ও জোটসঙ্গীদের সমন্বয়ে গঠিত হতে পারে—এমন আভাস মিলছে। তবে চূড়ান্ত তালিকা নির্ভর করবে দলীয় শীর্ষ নেতৃত্বের কৌশলগত সিদ্ধান্তের ওপর। নির্বাচন-পরবর্তী এই সময়টায় জনমনে যেমন প্রত্যাশা, তেমনি রয়েছে সতর্ক নজর। অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, কূটনীতি ও প্রশাসনিক সংস্কার—সবখানেই দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার চাপ থাকবে নতুন সরকারের ওপর। এখন দেখার বিষয়, আলোচনায় থাকা এই নামগুলোর মধ্যে কারা শেষ পর্যন্ত শপথের মঞ্চে জায়গা পান এবং কেমন হয় বিএনপির নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
আপনার মতামত জানানঃ