
বাংলাদেশ প্রতিদিনের এক প্রতিবেদনে ব্যবহৃত শিরোনাম— ‘আর্থিক চাপে পড়বে পরবর্তী সরকার’—আসলে কোনো অতিরঞ্জিত সতর্কবার্তা নয়; বরং এটি আসন্ন বাস্তবতার একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর ইঙ্গিত। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর যে দলই রাষ্ট্রক্ষমতায় আসুক না কেন, তাদের সামনে সবচেয়ে বড় ও জটিল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে অর্থনীতি। রাজনৈতিকভাবে সরকার গঠন করা যতটা কঠিন, তার চেয়েও কঠিন হবে ভঙ্গুর অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে দেশ পরিচালনা করা। কারণ অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নেওয়ার আগে আর্থিক খাতের যে সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু করেছে, তার বড় একটি অংশই অসমাপ্ত থেকে যাচ্ছে। এই অসমাপ্ত কাজগুলোর দায়ভার গিয়ে পড়বে নির্বাচিত সরকারের কাঁধে, আর মাঝপথে থেমে যাওয়া সংস্কার প্রক্রিয়া অর্থনীতির জন্য আরও গভীর সংকট তৈরি করার আশঙ্কা তৈরি করছে।
অর্থনৈতিক সংস্কার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এটি হঠাৎ শুরু করে হঠাৎ থামিয়ে দিলে কাঙ্ক্ষিত ফল তো পাওয়া যায়ই না, বরং বাজারে আস্থার সংকট আরও তীব্র হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে ঠিক সেটিই হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, রাজস্ব ব্যবস্থার পুনর্গঠন, ভর্তুকি ও ব্যয় ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। নির্বাচনের পর যদি নতুন সরকার এসব সংস্কার নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে বা রাজনৈতিক চাপের কারণে পিছিয়ে আসে, তাহলে সংকট আরও ঘনীভূত হবে—এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে প্রায় ঐকমত্য তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যে সবচেয়ে বড় তাৎক্ষণিক চাপ আসছে সময়ের বাস্তবতা থেকে। ভোট শেষ হওয়ার পরপরই শুরু হবে রমজান মাস, এরপর ঈদুল ফিতর। এই সময়টাতে সাধারণত বাজারে ভোগব্যয় বেড়ে যায়, খাদ্যপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের চাহিদা হঠাৎ করে বৃদ্ধি পায়। কিন্তু রাজস্ব আয় যদি সে অনুপাতে না বাড়ে, তাহলে সরকারকে ভর্তুকি ও বাজার ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত ব্যয় করতে হবে। বর্তমানে সরকারের রাজস্ব আদায়ের চিত্র এমনিতেই আশাব্যঞ্জক নয়। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও নির্বাচন ঘিরে ব্যবসা-বাণিজ্যে যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে রাজস্ব সংগ্রহে। কর আদায়ে ঘাটতি বাড়ছে, কাস্টমস ও ভ্যাট থেকে প্রত্যাশিত আয় আসছে না। ফলে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই একটি চাপযুক্ত বাজেট বাস্তবতার মুখোমুখি হবে।
এই অর্থনৈতিক চাপের আরেকটি বড় দিক হলো কর্মসংস্থান সংকট। গত ১৪ মাসে দেশে বন্ধ হয়ে গেছে বহু শিল্পকারখানা। উৎপাদন কমেছে, নতুন বিনিয়োগ আসেনি বললেই চলে। এর সরাসরি ফল হিসেবে লাখো মানুষ বেকার হয়েছে। আয়-রোজগার না বাড়লে সাধারণ মানুষের ভোগক্ষমতা কমে যায়, যা আবার বাজারে চাহিদা সংকোচনের মাধ্যমে অর্থনীতিকে আরও ধীরগতির দিকে ঠেলে দেয়। এটি একটি চক্রাকার সমস্যা—বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থান বাড়ে না, কর্মসংস্থান না বাড়লে ভোগ কমে যায়, ভোগ কমলে ব্যবসা আরও সংকুচিত হয়। নতুন সরকারকে এই চক্র ভাঙার জন্য দ্রুত ও সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যা বর্তমান বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ বাস্তবতায় মোটেও সহজ নয়।
বিদেশগামী শ্রমিকের সংখ্যা কমে যাওয়াও অর্থনীতির জন্য একটি বড় সতর্ক সংকেত। প্রবাসী আয় দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অন্যতম প্রধান ভরসা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক মন্দা, মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা এবং অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বিদেশে কর্মসংস্থানের গতি শ্লথ হয়েছে। এর ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহে কাঙ্ক্ষিত গতি আসছে না। একই সঙ্গে বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে। আগের নেওয়া ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে সরকারের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ আরও বেড়েছে, যা নতুন সরকারের নীতিনির্ধারণে বড় সীমাবদ্ধতা তৈরি করবে।
এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের চ্যালেঞ্জ। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ একটি গর্বের বিষয় হলেও এর অর্থনৈতিক বাস্তবতা সহজ নয়। শুল্কমুক্ত সুবিধা কমে যাওয়া, রপ্তানি প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়া এবং নতুন বাণিজ্য চুক্তির প্রয়োজনীয়তা—সবকিছু মিলিয়ে এটি একটি বড় কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ। এই উত্তরণের প্রস্তুতি যদি দুর্বল হয়, তাহলে রপ্তানি খাত ধাক্কা খেতে পারে, যা আবার কর্মসংস্থান ও রাজস্ব আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এই সামগ্রিক চাপের মধ্যে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়টি অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। প্রস্তাবিত পে-স্কেল বাস্তবায়ন করতে প্রাথমিকভাবে প্রয়োজন হবে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা, আর পুরোপুরি কার্যকর করতে গেলে এই অঙ্ক দাঁড়াবে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকায়। এটি সরকারের ব্যয় কাঠামোয় একটি বিশাল চাপ তৈরি করবে। একদিকে সরকারি চাকরিজীবীদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, যা স্বল্পমেয়াদে ভোগব্যয় ও বাজার চাহিদা বাড়াতে পারে। কিন্তু অন্যদিকে, এই অতিরিক্ত ব্যয় যদি উৎপাদন ও সরবরাহ বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে এর চূড়ান্ত ফলাফল হিসেবে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মূল্যস্ফীতি ইতোমধ্যেই সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ। নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারকে ভর্তুকি, আমদানি শুল্ক সমন্বয় ও বাজার তদারকিতে বাড়তি ব্যয় করতে হচ্ছে। নতুন পে-স্কেলের ফলে বাজারে অতিরিক্ত অর্থ প্রবাহিত হলে, সরবরাহ ব্যবস্থা দুর্বল থাকলে দাম আরও বাড়তে পারে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি, যাদের আয় বাড়ার সুযোগ সীমিত কিন্তু ব্যয় বাড়ছে দ্রুতগতিতে।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, পরবর্তী সরকারের সামনে যে আর্থিক চ্যালেঞ্জগুলো অপেক্ষা করছে, সেগুলো একক কোনো সিদ্ধান্ত বা এক বছরের বাজেট দিয়ে সমাধানযোগ্য নয়। এটি একটি বহুস্তরীয় সংকট—রাজস্ব, ব্যয়, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা, মূল্যস্ফীতি এবং কাঠামোগত সংস্কার—সবকিছু একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। বাংলাদেশ প্রতিদিন–এর প্রতিবেদনে যে আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে, তা মূলত এই বাস্তবতারই প্রতিফলন। নতুন সরকার যদি দ্রুত আস্থা ফিরিয়ে আনার মতো সুস্পষ্ট অর্থনৈতিক রোডম্যাপ দিতে না পারে, তাহলে এই চাপ শুধু সরকারের ঘাড়েই নয়, পুরো সমাজ ও অর্থনীতির ওপর আরও ভারী হয়ে উঠবে।
আপনার মতামত জানানঃ