মধ্যপ্রাচ্যে ইরান–ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা যখন নতুন করে বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে, তখন একটি প্রশ্ন সাধারণ মানুষ থেকে নীতিনির্ধারক—সবার মনেই ঘুরপাক খাচ্ছে: যদি পরিস্থিতি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেয়, ইরানের পাশে কি বাস্তবে কোনো শক্তিশালী দেশ দাঁড়াবে? রাশিয়া, চীন কিংবা মুসলিম বিশ্বের বড় রাষ্ট্রগুলো কি সরাসরি সামরিক সহায়তায় এগিয়ে আসবে, নাকি সমর্থন সীমাবদ্ধ থাকবে কূটনৈতিক বিবৃতি ও পরোক্ষ সহযোগিতায়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শুধু বর্তমান উত্তেজনা নয়, বরং গত কয়েক দশকের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা, জোট রাজনীতি এবং যুদ্ধের ইতিহাস একসঙ্গে বিশ্লেষণ করতে হয়।
বর্তমান বাস্তবতায় ইরান একটি জটিল কৌশলগত অবস্থানে আছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বৈরিতা, অন্যদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে ছায়াযুদ্ধ—এই দুই ফ্রন্টে ইরান বহু বছর ধরেই চাপের মধ্যে। কিন্তু একই সঙ্গে ইরান নিজেও মধ্যপ্রাচ্যে একটি প্রভাবশালী আঞ্চলিক শক্তি, যার রয়েছে শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, প্রক্সি নেটওয়ার্ক এবং কৌশলগত গভীরতা। ফলে প্রশ্নটা শুধু “কে ইরানের পাশে দাঁড়াবে” নয়—বরং “কে কতদূর পর্যন্ত দাঁড়াবে”।
ইতিহাস বলছে, বড় শক্তিগুলো সাধারণত সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে খুব হিসাবি। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় থেকে আমরা দেখেছি, যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রায় সব বড় আঞ্চলিক সংঘাতে বিপরীত পক্ষকে সমর্থন দিলেও সরাসরি মুখোমুখি সংঘর্ষ এড়িয়ে গেছে। কোরিয়া যুদ্ধ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ কিংবা আফগানিস্তান—সব ক্ষেত্রেই তারা প্রক্সি ও পরোক্ষ সহায়তার পথ বেছে নিয়েছিল। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় রাশিয়া ও চীনের আচরণও অনেকাংশে একই ধাঁচের।
রাশিয়ার ক্ষেত্রে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে ঘনিষ্ঠ হয়েছে, বিশেষ করে সিরিয়া যুদ্ধের সময়। সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ সরকারকে টিকিয়ে রাখতে রাশিয়া ও ইরান কার্যত একই পক্ষে কাজ করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে রাশিয়া ইরানের সঙ্গে সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা আরও বাড়িয়েছে—ড্রোন সহযোগিতা নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলো বহুবার অভিযোগ তুলেছে। তবুও বিশ্লেষকদের বড় অংশ মনে করেন, রাশিয়া সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের পক্ষে যুদ্ধে নামবে—এমন সম্ভাবনা খুবই কম।
এর প্রধান কারণ হলো কৌশলগত ঝুঁকি। রাশিয়া ইতোমধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে এবং পশ্চিমের সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘর্ষ আরও বাড়ানো তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। উপরন্তু, রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে নিজস্ব ভারসাম্যনীতি অনুসরণ করে—তারা ইসরায়েলের সঙ্গেও সম্পর্ক পুরোপুরি নষ্ট করেনি। সিরিয়ায় রাশিয়া ও ইসরায়েলের মধ্যে ডি-সংঘর্ষ সমন্বয় বহু বছর ধরে চালু আছে। ফলে ইরানের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে ঝাঁপ দেওয়া রাশিয়ার জন্য কৌশলগতভাবে লাভজনক নয়।
চীনের অবস্থান আরও সতর্ক। চীন ঐতিহাসিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে সামরিকভাবে জড়ানো এড়িয়ে চলে এবং অর্থনৈতিক কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দেয়। ইরানের সঙ্গে চীনের বড় তেল ও অবকাঠামো চুক্তি আছে, এবং বেইজিং তেহরানের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। কিন্তু চীনের বৈশ্বিক বাণিজ্যিক স্বার্থ—বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজার—এত বড় যে তারা কোনোভাবেই সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়াতে চাইবে না। চীনের পররাষ্ট্রনীতির একটি ধারাবাহিক বৈশিষ্ট্য হলো “অপ্রত্যক্ষ সমর্থন, প্রত্যক্ষ সংঘাত নয়।”
মুসলিম বিশ্বের ভূমিকাও বাস্তবে অনেক জটিল। সাধারণ জনমতে ইসরায়েলবিরোধী আবেগ শক্তিশালী হলেও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মুসলিম দেশগুলোর অবস্থান একরৈখিক নয়। উপসাগরীয় অনেক দেশ গত দশকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়িয়েছে এবং কেউ কেউ ইসরায়েলের সঙ্গেও সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বিগ্ন। ফলে তারা প্রকাশ্যে ইরানের পক্ষে যুদ্ধে নামবে—এমন সম্ভাবনা খুবই সীমিত।
তবে এর মানে এই নয় যে ইরান সম্পূর্ণ একা হয়ে যাবে। মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতায় সরাসরি রাষ্ট্রীয় জোটের পাশাপাশি রয়েছে “অক্ষ অব প্রতিরোধ” ধরনের অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক, যেখানে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী এবং ইরাক-সিরিয়ার বিভিন্ন শিয়া মিলিশিয়া ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে বিবেচিত। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, বড় আকারের সংঘাত হলে এই প্রক্সি শক্তিগুলো সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
ইতিহাসে ফিরে তাকালে দেখা যায়, ইরান–যুক্তরাষ্ট্র বৈরিতা নতুন নয়। ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক বৈরী হয়ে ওঠে। এরপর ইরান–ইরাক যুদ্ধ, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিরোধ, কুদস ফোর্স কমান্ডার কাসেম সোলাইমানি হত্যাকাণ্ড—সব মিলিয়ে উত্তেজনা বারবার তুঙ্গে উঠেছে। কিন্তু প্রতিবারই পূর্ণাঙ্গ সরাসরি যুদ্ধ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে, কারণ এতে আঞ্চলিক সংঘাত দ্রুত বৈশ্বিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য যুদ্ধের চিত্র বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি স্তর দেখা যায়। প্রথম স্তর হলো সীমিত হামলা ও পাল্টা হামলা—যেখানে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও সাইবার আক্রমণ প্রধান ভূমিকা রাখে। দ্বিতীয় স্তর হলো প্রক্সি ফ্রন্ট বিস্তৃত হওয়া—লেবানন, সিরিয়া, ইরাক বা ইয়েমেনে উত্তেজনা বাড়া। তৃতীয় এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্তর হলো সরাসরি রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্র যুদ্ধ, যা এখনো তুলনামূলক কম সম্ভাব্য কিন্তু পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
যুদ্ধের সম্ভাব্য মানবিক মূল্যও বিশাল হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে পারে। অবকাঠামো, তেল স্থাপনা, বন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্র লক্ষ্যবস্তু হলে আঞ্চলিক অর্থনীতি বড় ধাক্কা খাবে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি অস্থিতিশীল হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে—যার প্রভাব বাংলাদেশসহ আমদানিনির্ভর দেশগুলোও অনুভব করবে।
বিশ্লেষকদের বড় অংশের মূল্যায়ন হলো—যদি বড় সংঘাত শুরু হয়, রাশিয়া ও চীন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে ইরানকে সমর্থন দিতে পারে, কিন্তু সরাসরি সামরিক যুদ্ধে ঝাঁপ দেওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। মুসলিম দেশগুলোর ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা—প্রকাশ্য সামরিক জোটের চেয়ে রাজনৈতিক সমর্থন, মানবিক সহায়তা বা মধ্যস্থতার ভূমিকা বেশি দেখা যেতে পারে।
সব মিলিয়ে বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির কাঠামো এমন যে বড় শক্তিগুলো সরাসরি মুখোমুখি সংঘর্ষ এড়িয়ে চলতে চায়, বিশেষ করে যখন পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো পরোক্ষভাবে জড়িত থাকে। তাই ইরান সম্পূর্ণ একা হয়ে যাবে—এমনটা যেমন নিশ্চিত নয়, তেমনি শক্তিশালী কোনো দেশ খোলাখুলি তার পক্ষে যুদ্ধে নেমে পড়বে—এমন সম্ভাবনাও সীমিত।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস আমাদের একটি শিক্ষা দেয়: এই অঞ্চলের সংঘাত প্রায়ই অপ্রত্যাশিতভাবে বিস্তৃত হয়েছে। ছোট একটি সংঘর্ষও কখনো কখনো বড় আঞ্চলিক সংকটে রূপ নিয়েছে। ফলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে, বিশেষ করে যদি ভুল হিসাব, বড় ধরনের হামলা বা ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটে।
এই মুহূর্তে বিশ্বজুড়ে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে—কারণ সবাই জানে, পূর্ণাঙ্গ ইরান–ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিতে পারে। প্রশ্নটা তাই এখনো খোলা: সংঘাত কি সীমিত থাকবে, নাকি ইতিহাসের আরেকটি বড় মোড় নিতে যাচ্ছে।
আপনার মতামত জানানঃ