বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখন ক্রমশ মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। ২০২৫ সালে দেশের মোট তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ৫০ শতাংশের বেশি—প্রায় ৩.৬ মিলিয়ন টন—কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে এসেছে। এসব সরবরাহের বেশির ভাগই এসেছে কৌশলগত সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে।
হরমুজ প্রণালী একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ, যা পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর এবং পরে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের জন্য এটি একটি প্রধান ‘চোকপয়েন্ট’ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সাম্প্রতিক উত্তেজনা এই গুরুত্বপূর্ণ পথের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সোমবার ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং কোনো জাহাজ পার হওয়ার চেষ্টা করলে তাদের ওপর গুলি চালানো হবে—এমন খবর ইরানি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। শনিবার রপ্তানি পথ বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর এটি তেহরানের সবচেয়ে স্পষ্ট সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই পদক্ষেপ বিশ্বব্যাপী তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করতে পারে এবং অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বাড়িয়ে দিতে পারে।
কেপলার ইনসাইট ও উড ম্যাকেঞ্জির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বাংলাদেশের মোট এলএনজি সরবরাহের অর্ধেকের বেশি এসেছে কাতার ও ইউএই থেকে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রায় ৩.৬ মিলিয়ন টন এলএনজি সংগ্রহ করেছে, যার প্রধান রপ্তানিকারক ছিল কাতার।
মধ্যপ্রাচ্য বৈশ্বিক গ্যাস উৎপাদনের একটি শক্তিশালী কেন্দ্র হলেও এখানকার অধিকাংশ রপ্তানি পাইপলাইনের বদলে বিশেষায়িত জাহাজে পরিবহন করা হয়। ফলে হরমুজ প্রণালীর সামুদ্রিক পথ বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য অত্যন্ত অপরিহার্য।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাতার বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম এলএনজি সরবরাহকারী হিসেবে অবস্থান শক্ত করেছে এবং বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ তাদের দখলে। শেল এলএনজি আউটলুক ২০২৫ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে প্রাকৃতিক গ্যাসের মোট চাহিদার প্রায় ১৩ শতাংশ পূরণ হয়েছে এলএনজি দিয়ে।
কেপলার ইনসাইটের তথ্য বলছে, চীন ও ভারত কাতারি এলএনজির সবচেয়ে বড় আমদানিকারক হলেও বাংলাদেশ ও পাকিস্তানও এ অঞ্চলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল শীর্ষ এশীয় ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে।
২০২৫ সালে পাকিস্তান তার এলএনজির ৯৯ শতাংশই কাতার ও ইউএই থেকে পেয়েছে। একই সময়ে ভারত ও বাংলাদেশ—উভয় দেশই তাদের চাহিদার অর্ধেকের বেশি এই দুই দেশের ওপর নির্ভর করে পূরণ করেছে।
আরব উপদ্বীপের অন্য বড় উৎপাদক ওমান হরমুজ প্রণালীর বাইরে রপ্তানি সুবিধা পরিচালনা করে, ফলে উপসাগর অগম্য হলেও তাদের চালান চলতে পারে। তবে কাতারের উৎপাদন প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি হওয়ায় বাংলাদেশের জন্য হরমুজ প্রণালীই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে রয়ে গেছে।
২০২২ সাল পর্যন্ত রাশিয়া ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় এলএনজি রপ্তানিকারক দেশ। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর তাদের বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় এলএনজি রপ্তানিকারক, এরপর রয়েছে কাতার ও অস্ট্রেলিয়া।
বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালী দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহে প্রায় ৮৬ বিলিয়ন ঘনমিটার বা ১৫ শতাংশ ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এতে বৈশ্বিক বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হবে এবং এশিয়ার ক্রেতাদের যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি পেতে ইউরোপীয় বাজারের সঙ্গে বেশি দামে প্রতিযোগিতা করতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতি বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে এলএনজি একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি। এই রুটে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে সরাসরি দেশের গৃহস্থালি ও ব্যবসায়িক খরচ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বজুড়ে এলএনজি প্ল্যান্টগুলো ইতিমধ্যে প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। ফলে স্বল্পমেয়াদে বিকল্প সরবরাহ খুঁজে পাওয়া কঠিন হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল গোল্ডেন পাস এলএনজি প্রকল্প এ বছর চালু হওয়ার কথা থাকলেও পূর্ণ উৎপাদনে পৌঁছাতে সময় লাগবে বলে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে।
আপনার মতামত জানানঃ