পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জলপথগুলোর একটি হরমুজ প্রণালি। মানচিত্রে সরু এক সমুদ্রপথ মনে হলেও বাস্তবে এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিদিন বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়েই এক দেশ থেকে আরেক দেশে পৌঁছে যায়। আর সেই পথেই যখন একের পর এক জাহাজ হামলার শিকার হয়, তখন উদ্বেগ শুধু একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; ছড়িয়ে পড়ে পুরো বিশ্বে। ওমান উপকূলে ভারতের পতাকাবাহী দ্বিতীয় জাহাজের ওপর হামলার ঘটনাও এখন ঠিক তেমনই এক আন্তর্জাতিক উদ্বেগের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
সোমালিয়া থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ বন্দরের উদ্দেশে যাত্রা করা ‘এমএলএনআই হাজি আলী’ নামের কাঠের তৈরি জাহাজটি হরমুজ প্রণালির দক্ষিণে ওমানের লিমা উপকূলের কাছে বিস্ফোরণের শিকার হয়। পরে সেটি ডুবে যায় বলে অভিযোগ উঠেছে। জাহাজটিতে থাকা ১৪ জন ভারতীয় নাবিককে নিরাপদে উদ্ধার করেছে ওমান কোস্ট গার্ড। প্রাণহানি না ঘটলেও ঘটনাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করেছে। কারণ এটি চলতি মাসে ভারতীয় পতাকাবাহী দ্বিতীয় জাহাজ, যা হামলার মুখে পড়ল।
ঘটনার পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটিকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে বর্ণনা করেছে। তবে কৌশলগত কারণে হামলার জন্য সরাসরি কাউকে দায়ী করেনি দিল্লি। এই নীরবতাই আসলে পুরো পরিস্থিতির জটিলতাকে স্পষ্ট করে। কারণ হরমুজ প্রণালি এখন শুধু একটি বাণিজ্যিক রুট নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, রাশিয়া, চীন এবং ভারতের মতো শক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক হিসাবের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
বিশ্ব রাজনীতির সাম্প্রতিক উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে ইরান। ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক পদক্ষেপ এবং তার জবাবে ইরানের পাল্টা অবস্থান পুরো পশ্চিম এশিয়াকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। এই সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়েছে হরমুজ প্রণালিতে। কারণ ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে, চাইলে তারা এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। আর সেটিই এখন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় শঙ্কা।
ভারতের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল ভোক্তা। তাদের আমদানি করা বিপুল পরিমাণ জ্বালানি হরমুজ প্রণালি দিয়েই আসে। ফলে এই পথে যেকোনো হামলা বা অস্থিরতা সরাসরি ভারতের অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং পররাষ্ট্রনীতিকে প্রভাবিত করে। ইতোমধ্যে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে ভারতজুড়ে।
এই ঘটনার সময়টিও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যখন ওমান উপকূলে জাহাজে হামলা হলো, ঠিক তখনই দিল্লিতে চলছিল ব্রিকস সম্মেলন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা। একই সময়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ফলে হামলার ঘটনাটি শুধু নিরাপত্তা ইস্যু নয়, কূটনৈতিক চাপ তৈরির একটি বার্তাও হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তবতা হলো, সবসময় প্রকাশ্যে যা দেখা যায়, ভেতরে গল্পটা তার চেয়ে অনেক জটিল। এই হামলার ক্ষেত্রেও সেটিই দেখা যাচ্ছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরাসরি দায় স্বীকার করেননি, কিন্তু তিনি এমন মন্তব্য করেছেন যে, হরমুজ প্রণালি সেই সব বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য নিরাপদ থাকবে যারা ইরানের নৌবাহিনীকে সহযোগিতা করবে। এই বক্তব্যকে অনেকেই পরোক্ষ বার্তা হিসেবে দেখছেন। যদিও ভারত এখনো খুব সতর্কভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
ভারতের কৌশলগত অবস্থান এখানে অত্যন্ত সূক্ষ্ম। একদিকে ইরানের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতও ভারতের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র। শুধু তাই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও ভারতের ঘনিষ্ঠতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। ফলে কোনো পক্ষকে সরাসরি অভিযুক্ত করলে কূটনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এই কারণেই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষা ছিল খুব হিসাবি। তারা বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার নিন্দা জানিয়েছে, নিরীহ নাবিকদের নিরাপত্তার কথা বলেছে, কিন্তু কোনো দেশের নাম নেয়নি। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা বলছেন, এটিই এখন ভারতের সবচেয়ে বাস্তববাদী অবস্থান। কারণ বর্তমান পরিস্থিতিতে দিল্লির সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো ভারসাম্য বজায় রাখা।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা নতুন নয়। গত কয়েক বছরে এই অঞ্চলে একাধিকবার তেলবাহী জাহাজ আটক, বিস্ফোরণ এবং ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। তবে এবারের পরিস্থিতি আলাদা। কারণ এখন বিশ্ব রাজনীতি আরও বিভক্ত এবং সংঘাত আরও সরাসরি। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব এখনো বিশ্ব অর্থনীতিতে রয়েছে, তার ওপর পশ্চিম এশিয়ার নতুন উত্তেজনা বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে আরও নড়বড়ে করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের হামলার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনে। জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হলে তেলের দাম বাড়ে, পরিবহন খরচ বাড়ে, বাজারে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ ওমান উপকূলে একটি জাহাজে হামলার অভিঘাত কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরের দেশগুলোর রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে চাপ পড়ে। বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হলে উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়ে। ফলে হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা শুধু ভারত বা মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যা নয়; এটি পুরো বিশ্বের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন।
এই ঘটনার আরেকটি দিকও গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্রপথে নিরাপত্তা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠেছে। আগে জলদস্যুতা ছিল বড় হুমকি, এখন যুক্ত হয়েছে ড্রোন হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র এবং রাষ্ট্রীয় কিংবা অরাষ্ট্রীয় শক্তির গোপন অভিযান। একটি ছোট ড্রোনও এখন বিশাল বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য ভয়ংকর হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
ওমান উপকূলে হামলার পর আন্তর্জাতিক মহলে আবারও প্রশ্ন উঠেছে, বৈশ্বিক বাণিজ্য রুটগুলোর নিরাপত্তা কে নিশ্চিত করবে? যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে নৌ উপস্থিতি বজায় রেখেছে। ইরানও নিজেদের প্রভাব দেখাতে চায়। রাশিয়া ও চীনও এখন পশ্চিম এশিয়ায় নিজেদের কৌশলগত অবস্থান শক্ত করছে। ফলে হরমুজ প্রণালি যেন এক নতুন ‘ভূরাজনৈতিক দাবার বোর্ডে’ পরিণত হয়েছে।
ভারতের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করা এবং একই সঙ্গে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা। কারণ দিল্লি জানে, কোনো একটি পক্ষের সঙ্গে প্রকাশ্য সংঘাতে জড়িয়ে পড়া তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাই তারা এখন অপেক্ষা করছে—আসলে হামলার নেপথ্যে কারা ছিল এবং ভবিষ্যতে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, পশ্চিম এশিয়ার এই অস্থিরতা খুব দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বরং সামনে আরও জটিল সমীকরণ তৈরি হতে পারে। আর সেই সমীকরণের কেন্দ্রেই থাকবে হরমুজ প্রণালি—যে পথ দিয়ে শুধু তেল নয়, বিশ্ব রাজনীতির উত্তাপও প্রতিদিন প্রবাহিত হচ্ছে।
ওমান উপকূলে ভারতীয় জাহাজে হামলার ঘটনাটি তাই কেবল একটি সামুদ্রিক দুর্ঘটনা নয়। এটি বর্তমান বিশ্বের অস্থির ভূরাজনীতির প্রতিচ্ছবি। এমন এক সময়ের প্রতীক, যেখানে একটি বিস্ফোরণের শব্দ শুধু সমুদ্রে নয়, কূটনীতির টেবিলেও প্রতিধ্বনি তোলে।
আপনার মতামত জানানঃ