মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে শক্তির ভারসাম্য সবসময়ই পরিবর্তনশীল। কখনো আরব জাতীয়তাবাদ, কখনো তেলসমৃদ্ধ রাজতন্ত্র, কখনো ইসরায়েলের সামরিক আধিপত্য, আবার কখনো বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা এই অঞ্চলকে প্রভাবিত করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি প্রশ্ন ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে—ইরান কি মধ্যপ্রাচ্যের নতুন পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে?
একসময় আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক সংকট এবং কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার কারণে অনেক বিশ্লেষক ইরানকে দুর্বল রাষ্ট্র হিসেবে দেখতেন। কিন্তু বাস্তবতা ধীরে ধীরে ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে। আজকের ইরান শুধু একটি রাষ্ট্র নয়; এটি একটি কৌশলগত ধারণা, একটি আঞ্চলিক প্রভাববলয় এবং একটি প্রতিরোধভিত্তিক নিরাপত্তা কাঠামোর প্রতীক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা এবং সামরিক সংঘাতের মধ্যেও দেশটির টিকে থাকার সক্ষমতা নতুন করে বিশ্বকে ভাবতে বাধ্য করছে।
ইরানের শক্তির মূল উৎস তার সামরিক সক্ষমতা নয়, বরং তার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ধৈর্য। মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ দেশ যেখানে বিদেশি নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভরশীল, সেখানে ইরান বহু বছর ধরে আত্মনির্ভরশীল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে আধুনিক অস্ত্র আমদানির সুযোগ সীমিত হলেও দেশটি নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, রাডার এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ফলে সামরিক শক্তির প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে ইরান একটি অসম যুদ্ধ কৌশল গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান দেশটিকে বিশেষ কৌশলগত সুবিধা দিয়েছে। বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়ে পরিচালিত হয়। ফলে যে কোনো আঞ্চলিক সংকটে ইরানের ভূমিকা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, শুধুমাত্র এই ভৌগোলিক অবস্থানই ইরানকে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একটি শক্তিশালী দরকষাকষির সুযোগ দেয়।
তবে ইরানের উত্থানের পেছনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তার আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইরাকের বিভিন্ন শিয়া গোষ্ঠী, ইয়েমেনের হুথি আন্দোলন এবং অতীতে সিরিয়ায় মিত্র সরকারের প্রতি সমর্থন—এসবের মাধ্যমে ইরান একটি বিস্তৃত প্রভাববলয় গড়ে তুলেছে। সমর্থকেরা একে প্রতিরোধ অক্ষ বলে অভিহিত করেন, আর সমালোচকেরা একে আঞ্চলিক হস্তক্ষেপের কৌশল হিসেবে দেখেন। তবে যে নামেই ডাকা হোক না কেন, এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে এই নেটওয়ার্ক মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে ইরানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে।
সাম্প্রতিক সংঘাতগুলোতে ইরানের অবস্থান বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মতো সামরিকভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিরোধ গড়ে তোলা অনেকের কাছে বিস্ময়কর মনে হয়েছে। যদিও সামরিক শক্তির তুলনায় ইরানকে দুর্বল ধরা হয়, তবুও দেশটি দেখিয়েছে যে আধুনিক যুদ্ধ কেবল অস্ত্রের সংখ্যা দিয়ে নির্ধারিত হয় না; কৌশল, মনোবল, ভূগোল এবং রাজনৈতিক ঐক্যও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ইরানের অন্যতম বড় শক্তি হলো জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নে জনগণের ঐক্য। পারস্য সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাস, সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় এবং বিদেশি হস্তক্ষেপবিরোধী মনোভাব ইরানের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। ফলে বাইরের চাপ অনেক সময় অভ্যন্তরীণ বিভাজন কমিয়ে জাতীয় ঐক্যকে শক্তিশালী করে। সাম্প্রতিক সংঘাতেও সেই প্রবণতা দেখা গেছে।
অর্থনৈতিক দিক থেকে ইরানের পরিস্থিতি অবশ্য জটিল। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা দেশটির অর্থনীতিকে চাপে রেখেছে। মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের ঘাটতি সাধারণ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু একই সঙ্গে এই চাপ ইরানকে বিকল্প অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরির দিকেও ঠেলে দিয়েছে। চীন, রাশিয়া এবং কিছু আঞ্চলিক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে তেহরান পশ্চিমা নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করেছে।
বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতাও ইরানের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। একসময় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ছিল প্রায় একচ্ছত্র। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই প্রভাব আগের তুলনায় কমেছে। আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, ইরাকে ভূমিকার পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক অগ্রাধিকারের পরিবর্তন মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন শক্তিশূন্যতা তৈরি করেছে। ইরান সেই শূন্যতা আংশিকভাবে পূরণ করার চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে, উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোও নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। তারা বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভর করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাতগুলো দেখিয়েছে যে আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রশ্নে শুধু বাইরের শক্তির ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। ফলে অনেক দেশ এখন ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন ভারসাম্য খুঁজছে। সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টা তারই একটি উদাহরণ।
তবে ইরানকে পরাশক্তি হিসেবে দেখার আগে কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও বিবেচনা করতে হবে। প্রথমত, অর্থনৈতিক শক্তি ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি পরাশক্তি হওয়া কঠিন। যুক্তরাষ্ট্র, চীন কিংবা অতীতের সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো শক্তিগুলোর উত্থানের পেছনে শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি ছিল। ইরানের অর্থনীতি এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
দ্বিতীয়ত, আঞ্চলিক প্রভাব থাকা আর বৈশ্বিক প্রভাব থাকা এক বিষয় নয়। ইরান মধ্যপ্রাচ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে তার প্রভাব সীমিত। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি বাজার এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় তার অংশগ্রহণও তুলনামূলকভাবে কম।
তৃতীয়ত, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জও ইরানের সামনে রয়েছে। তরুণ জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা, অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রয়োজন এবং সামাজিক স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক ভবিষ্যতে দেশটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠতে পারে। একটি রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক শক্তি অনেকাংশে তার অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভর করে।
তবুও এটিও সত্য যে গত দুই দশকে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির মানচিত্রে ইরানের অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হয়েছে। একসময় যাকে শুধুই নিষেধাজ্ঞাগ্রস্ত রাষ্ট্র হিসেবে দেখা হতো, আজ সেই রাষ্ট্র আঞ্চলিক নিরাপত্তা, জ্বালানি রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয়।
ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ইরানের উত্থানকে আরও দৃশ্যমান করেছে। বহু বছর ধরে ইসরায়েলকে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান সামরিক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাতগুলোতে দেখা গেছে, ইরানও এমন এক প্রতিরোধ কাঠামো তৈরি করেছে যা পুরো অঞ্চলের কৌশলগত হিসাবকে বদলে দিতে পারে। ফলে আজ মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা করলে ইরানকে উপেক্ষা করা অসম্ভব।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে পরাশক্তি হওয়া একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। শুধু সামরিক শক্তি বা রাজনৈতিক প্রভাব নয়, অর্থনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি এবং কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সেই মানদণ্ডে বিচার করলে ইরান এখনো পূর্ণাঙ্গ পরাশক্তি নয়। কিন্তু আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে তার অবস্থান আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় শক্তিশালী—এ বিষয়ে খুব কম বিশ্লেষকেরই দ্বিমত আছে।
বর্তমান সংঘাত, কূটনৈতিক দরকষাকষি এবং আঞ্চলিক পুনর্বিন্যাসের মধ্য দিয়ে ইরান নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। এই বাস্তবতা দেশটিকে হয় আরও শক্তিশালী করবে, নয়তো তার সীমাবদ্ধতাগুলো স্পষ্ট করে তুলবে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো আলোচনা ইরানকে কেন্দ্র করে না হলে তা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
পরাশক্তি হওয়ার প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর হয়তো আজই দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু এটুকু বলা যায়, ইরান আর কেবল একটি আঞ্চলিক রাষ্ট্র নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও কৌশলগত সমীকরণের অন্যতম প্রধান নির্ধারক শক্তি। আগামী দশকে দেশটির অর্থনৈতিক সক্ষমতা, কূটনৈতিক দক্ষতা এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নির্ধারণ করবে—ইরান সত্যিই নতুন পরাশক্তি হবে, নাকি শক্তিশালী আঞ্চলিক খেলোয়াড় হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় ইরানের উত্থান বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি, যা মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ