ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর খবর মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিকে নতুন করে নাড়িয়ে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই ব্যক্তির অনুপস্থিতি শুধু একটি নেতৃত্বের পরিবর্তন নয়; বরং এটি একটি যুগের অবসান এবং এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সূচনা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত হামলার প্রেক্ষাপটে সংঘটিত এই ঘটনা এমন এক সময় ঘটল, যখন মধ্যপ্রাচ্য ইতিমধ্যেই উত্তেজনার আগুনে জ্বলছিল। ফলে প্রশ্ন উঠছে—ইসলামি প্রজাতন্ত্র কি আগের মতো টিকে থাকতে পারবে, নাকি এই মৃত্যু ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে গভীরভাবে বদলে দেবে?
১৯৮৯ সাল থেকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে খামেনি শুধু রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন ইরানের আদর্শিক কাঠামোর প্রধান রক্ষক। তাঁর নেতৃত্বে ইসলামি প্রজাতন্ত্র একটি জটিল কিন্তু স্থিতিশীল ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করেছিল, যেখানে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ইসলামি রেভোল্যুশনারি গার্ড (আইআরজিসি), নির্বাচিত সরকার এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলো পারস্পরিক নির্ভরতার মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা করত। তাঁর মৃত্যু সেই ভারসাম্যে একটি বড় শূন্যতা তৈরি করেছে। সংবিধান অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ পরিষদ নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করতে পারে, কিন্তু বাস্তবে ক্ষমতার রূপান্তর কতটা মসৃণ হবে, তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে।
এই মুহূর্তে ইরানের প্রধান লক্ষ্য কোনো সামরিক বিজয় নয়; বরং রাষ্ট্রব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা। তেহরান ভালো করেই জানে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত সামরিক শক্তির সঙ্গে সরাসরি পাল্লা দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই তারা অসম কৌশল—ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন হামলা, আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক—ব্যবহার করে সংঘাতকে দীর্ঘায়িত ও ব্যয়বহুল করার পথ বেছে নিয়েছে। ইসরায়েলি ভূখণ্ড ও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন স্থাপনায় ইরানের তাৎক্ষণিক পাল্টা হামলা সেই কৌশলেরই অংশ।
অন্যদিকে ওয়াশিংটনের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ ভিন্ন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই হামলাকে কেবল সামরিক পদক্ষেপ হিসেবে নয়, বরং একটি কৌশলগত ও আদর্শিক বিজয় হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে—ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে আঘাত হানলে দেশটির কৌশলগত সক্ষমতা ভেঙে পড়বে এবং ভেতরে ভেতরে রাজনৈতিক ভাঙন শুরু হবে। এই হিসাব কতটা বাস্তবসম্মত, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
ইসরায়েলের লক্ষ্য আবার কিছুটা আলাদা মাত্রায় কাজ করছে। তারা বহুদিন ধরেই ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব, বিশেষ করে হিজবুল্লাহ, হামাস এবং অন্যান্য মিত্র গোষ্ঠীর মাধ্যমে তেহরানের ‘ফরোয়ার্ড ডিফেন্স’ কৌশলকে নিজেদের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখে আসছে। ফলে ইসরায়েলের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে ইরানকে এমন এক অভ্যন্তরীণ সংকটে ব্যস্ত রাখা, যাতে দেশটি দীর্ঘমেয়াদে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
তবে যুদ্ধ খুব কমই পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয়। ইতিহাস বলছে, শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দিলেই কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়ে না। ইরানের ক্ষেত্রেও সেটি সত্য হতে পারে। ইসলামি প্রজাতন্ত্র গত চার দশকে এমন এক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলেছে, যা ব্যক্তিনির্ভর হলেও পুরোপুরি ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়। আইআরজিসি, নিরাপত্তা সংস্থা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জাল এতটাই শক্তিশালী যে তাৎক্ষণিক পতনের সম্ভাবনা কম। বরং সম্ভাবনা বেশি একটি নিয়ন্ত্রিত কিন্তু কঠিন ক্ষমতা-রূপান্তরের।
তবু ঝুঁকি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। দীর্ঘস্থায়ী সামরিক চাপ, অর্থনৈতিক সংকট এবং অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা যদি একসঙ্গে তীব্র হয়, তাহলে ইরানের রাজনৈতিক অভিজাতদের মধ্যে বিভাজন তৈরি হতে পারে। সেই বিভাজন যদি নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতর ঢুকে পড়ে, তাহলে পরিস্থিতি দ্রুত অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। লিবিয়ার অভিজ্ঞতা এখানে সতর্কবার্তা হিসেবে সামনে আসে—যেখানে শাসক পতনের পর রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়ে এবং বহু সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রতিযোগিতার ময়দান তৈরি হয়। যদিও ইরান লিবিয়ার তুলনায় অনেক বেশি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী, তবুও অনিয়ন্ত্রিত রূপান্তরের ঝুঁকি পুরোপুরি নেই—এ কথা বলা যায় না।
এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া। উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তেহরানের সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু বর্তমান সংঘাত সেই প্রচেষ্টাকে অনিশ্চয়তায় ফেলে দিয়েছে। আকাশসীমা, জ্বালানি অবকাঠামো এবং সমুদ্রপথ—বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী—আবারও বৈশ্বিক উদ্বেগের কেন্দ্রে উঠে এসেছে। বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।
ইরানের ভেতরেও সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়তে পারে। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, মূল্যস্ফীতি এবং যুবসমাজের হতাশা আগে থেকেই রাষ্ট্রের জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল। যদি যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হয় এবং অর্থনীতি আরও চাপে পড়ে, তাহলে জনঅসন্তোষ নতুন মাত্রা পেতে পারে। তবে একই সঙ্গে ইতিহাস বলছে, বাইরের সামরিক চাপ অনেক সময় ভেতরে জাতীয়তাবাদী ঐক্যও জোরদার করে। ফলে জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে যাবে, নাকি ‘বহিরাগত হুমকি’র মুখে রাষ্ট্রের পক্ষে একত্র হবে—তা এখনো অনিশ্চিত।
সব মিলিয়ে খামেনির মৃত্যু ইরানের জন্য একটি নির্ণায়ক মুহূর্ত। ইসলামি প্রজাতন্ত্র হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে ভেঙে পড়বে না, কিন্তু আগের মতো থাকবে—এমনটা বলাও কঠিন। সামনে যে পথ খুলছে, তা মূলত তিনটি সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত দেয়: নিয়ন্ত্রিত নেতৃত্ব পরিবর্তন ও টিকে থাকা, দীর্ঘমেয়াদি সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপে ধীরে ধীরে দুর্বল হওয়া, অথবা সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে অনিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক ভাঙন।
মধ্যপ্রাচ্যের জন্য এর অর্থ আরও বড়। এই অঞ্চল বহুদিন ধরেই প্রক্সি যুদ্ধ, জোট রাজনীতি এবং নিরাপত্তা প্রতিদ্বন্দ্বিতার জটিল জালে আটকে আছে। ইরানের ভেতরের পরিবর্তন সেই জালকে নতুন করে নড়বড়ে করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র হয়তো স্বল্পমেয়াদে কৌশলগত সুবিধা পেতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে একটি অস্থিতিশীল ইরান পুরো অঞ্চলকে আরও অগ্নিগর্ভ করে তুলতে পারে।
এ মুহূর্তে সবচেয়ে নিশ্চিত যে বিষয়টি—তা হলো অনিশ্চয়তা। খামেনির পরবর্তী ইরান কেমন হবে, তা নির্ধারণ করবে শুধু প্রথম দফার বোমাবর্ষণ নয়; বরং টানা সামরিক চাপ, অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার সমীকরণ এবং আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়ার জটিল মিথস্ক্রিয়া। ইসলামি প্রজাতন্ত্র হয়তো টিকে যাবে, কিন্তু এই ঝড়ের পর সেটি আর আগের ইরান থাকবে না।
আপনার মতামত জানানঃ