কয়েক বছর আগেও মধ্যপ্রাচ্যের বহু আরব রাষ্ট্র, বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলো, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলাকে অন্তত নীরব সমর্থনের চোখে দেখত। তাদের দৃষ্টিতে ইরান ছিল প্রধান আঞ্চলিক হুমকি—একটি বিপ্লবী রাষ্ট্র, যে প্রক্সি গোষ্ঠীর মাধ্যমে ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ও ইয়েমেনে প্রভাব বিস্তার করছে এবং উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। কিন্তু সময় বদলেছে। আজ সেই একই আরব নেতারাই যখন শুনছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে সরাসরি হামলার বিষয়টি বিবেচনা করছেন, তখন তারা ওয়াশিংটনকে অনুরোধ করছেন—এই পথে না হাঁটতে।
এই অবস্থান পরিবর্তন হঠাৎ করে আসেনি। গত ২৭ মাস ধরে আরব নেতারা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা ও আগ্রাসন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। গাজায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ, পশ্চিম তীরে দখল বিস্তার, সিরিয়া ও লেবাননে একের পর এক হামলা—সব মিলিয়ে ইসরায়েল এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যা আরব রাষ্ট্রগুলোর জন্য ইরানকে নয়, বরং ইসরায়েলকেই প্রধান কৌশলগত উদ্বেগে পরিণত করেছে। বিশেষ করে ‘মহান ইসরায়েল’ ধারণা, যা বাইবেলভিত্তিক এক সম্প্রসারণবাদী কল্পনা হিসেবে ইউফ্রেটিস থেকে নীল নদ পর্যন্ত ভূখণ্ড বিস্তারের কথা বলে, সেটি আরব বিশ্বে গভীর আশঙ্কা তৈরি করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল যৌথ হামলা হলে সেটিকে আরব নেতারা আলাদা কোনো ঘটনা হিসেবে দেখছেন না। তাদের চোখে এটি হবে ইসরায়েলের আঞ্চলিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার আরেকটি ধাপ—যেখানে ইরানকে দুর্বল বা ভেঙে ফেলে গোটা শক্তির ভারসাম্য নিজেদের অনুকূলে নেওয়া হবে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে ইসরায়েলের কাতারে আকস্মিক হামলা এবং তার আগেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংসে যুক্তরাষ্ট্রকে রাজি করানোর প্রচেষ্টা এই সন্দেহকে আরও জোরালো করেছে।
আরব বিশ্বে এই উপলব্ধি এখন বেশ স্পষ্ট—ইসরায়েল তার লক্ষ্য ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে খোলাখুলিভাবে প্রকাশ করছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে আঘাত হানে, তা শুধু ইরানকেই নয়, পুরো আঞ্চলিক কাঠামোকেই অস্থিতিশীল করবে। এই কাঠামোগত পরিবর্তনই আরব নেতাদের অবস্থান বদলের মূল কারণ।
যদিও প্রকাশ্যে ইসরায়েল ইরানের ওপর সম্ভাব্য হামলার গুঞ্জন থেকে দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছে, তবু বিভিন্ন সূত্রে উঠে আসা তথ্য অন্য ছবি দেখায়। ইরানের ভেতরে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনকে সক্রিয়ভাবে উসকে দেওয়ার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের ভূমিকা নিয়ে আরব রাজধানীগুলোতে খুব একটা সন্দেহ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এবং ইসরায়েলের ঐতিহ্য বিষয়কমন্ত্রী আমিচাই এলিয়াহুর বক্তব্য, ইসরায়েলি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন—সব মিলিয়ে একটি বার্তাই যাচ্ছে: ইরানে অস্থিরতা বাড়ানো হচ্ছে, যাতে বাইরের হস্তক্ষেপের পথ প্রশস্ত হয়।
এই প্রতিবেদনগুলো আরব নেতারা পড়ছেন নিজেদের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার আলোকে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে শাসন পরিবর্তনের রাজনীতি—ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া—এই উদাহরণগুলো তাদের মনে এখনো টাটকা। প্রতিবারই ফল হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী বিশৃঙ্খলা, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভাঙন এবং চরমপন্থার বিস্তার। তাই আজ তারা হিসাব কষে দেখছেন, ইরানে একই ধরনের কিছু ঘটলে লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হবে।
আরেকটি বড় বাস্তবতা হলো, ইরান ইতোমধ্যে আগের মতো শক্তিশালী নেই। ২০২৩ সালের পর থেকে দেশটি একাধিক দিক থেকে দুর্বল হয়েছে। কঠোর নিষেধাজ্ঞায় অর্থনীতি বিপর্যস্ত, সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা ধারাবাহিক হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—তার প্রক্সি নেটওয়ার্ক বড় ধাক্কা খেয়েছে। সিরিয়ায় বাসার আল-আসাদের পতন, লেবাননে হিজবুল্লাহর শক্তিক্ষয়—এসবই ইরানের আঞ্চলিক প্রভাবকে সীমিত করেছে।
এই বাস্তবতায় আরব শাসকেরা মনে করছেন, ইরানকে আরও আঘাত করা অপ্রয়োজনীয় এবং বিপজ্জনক। দুর্বল ইরান তাদের কাছে এক অর্থে নিয়ন্ত্রণযোগ্য বাস্তবতা। কিন্তু ইরান যদি পুরোপুরি ভেঙে পড়ে, তাহলে তার ঢেউ আছড়ে পড়বে প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলোর ওপর—শরণার্থী সংকট, সীমান্ত অস্থিরতা, সাম্প্রদায়িক সংঘাত এবং নতুন করে চরমপন্থার উত্থান। সম্ভাব্য লাভের তুলনায় এই ঝুঁকি অনেক বেশি।
অর্থনৈতিক দিকটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য স্থিতিশীলতা এখন সবচেয়ে বড় কৌশলগত চাহিদা। ইরানে হামলা হলে এবং তার জবাবে তেহরান প্রতিশোধ নিলে হরমুজ প্রণালি হুমকির মুখে পড়তে পারে—যে পথ দিয়ে বিশ্বের একটি বড় অংশের তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। তেলের দাম বেড়ে গেলে শুধু বৈশ্বিক অর্থনীতিই নয়, আরব দেশগুলোর নিজস্ব উন্নয়ন পরিকল্পনাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মিসরের উদ্বেগ আরও নির্দিষ্ট—ইরানে শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়লে লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল ঘিরে নতুন অস্থিরতা দেখা দিতে পারে, যা দেশটির অর্থনীতির জন্য ভয়াবহ হবে।
এই সব হিসাবের মাঝেই আরেকটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছে—আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ইরানের কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি। ইসরায়েলের আগ্রাসন ও সম্প্রসারণবাদী নীতির প্রতিক্রিয়াতেই এই ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে। সৌদি আরব ও ইরান ২০২৩ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করে, যা কয়েক বছর আগেও কল্পনাতীত ছিল। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে কাতারে ইসরায়েলের হামলার পর এই সম্পর্ক আরও গভীর হয়। মিসরের সঙ্গেও ইরানের যোগাযোগ বাড়ছে। এই নতুন বাস্তবতায় ইরান আর পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন কোনো শত্রু রাষ্ট্র নয়; বরং জটিল হলেও আলোচনার মাধ্যমে সামাল দেওয়া যায়—এমন এক প্রতিবেশী।
এই পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গির কেন্দ্রে আছেন আরব বিশ্বের শীর্ষ নেতৃত্ব, যার মধ্যে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান অন্যতম। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরব যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের পথে হাঁটছে, তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। একই চিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার বা ওমানের ক্ষেত্রেও। যুদ্ধ ও বিশৃঙ্খলা নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা ও কূটনৈতিক ভারসাম্য—এটাই এখন তাদের পছন্দের পথ।
ফলে আজ মধ্যপ্রাচ্যে এক অদ্ভুত কিন্তু বাস্তব সমীকরণ তৈরি হয়েছে। একদিকে ইসরায়েল ও তার মিত্ররা ইরানকে চূড়ান্তভাবে দুর্বল করার সুযোগ খুঁজছে, অন্যদিকে আরব রাষ্ট্রগুলো বলছে—এখন সেই সময় নয়। তারা মনে করছে, ইরান যতটা দুর্বল হয়েছে, সেটাই যথেষ্ট; আরও আঘাত মানে অপ্রত্যাশিত বিস্ফোরণ।
এই অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত শুধু ইরান নয়, পুরো অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। ট্রাম্প প্রশাসন যদি আরব নেতাদের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে, তাহলে তা যুক্তরাষ্ট্র–আরব সম্পর্কের ওপরও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ এবার আরব বিশ্ব শুধু দর্শক নয়; তারা নিজেদের স্বার্থ ও অভিজ্ঞতা থেকে কথা বলছে।
শেষ পর্যন্ত ইরান ইস্যুতে এই আরব অবস্থান পরিবর্তন মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক গভীর রূপান্তরের ইঙ্গিত দেয়। এটি দেখায়, আঞ্চলিক শক্তিগুলো আর আগের মতো বাইরের শক্তির সিদ্ধান্তে ভেসে যেতে রাজি নয়। তারা নিজেদের হিসাব নিজেরাই করতে চাইছে—যেখানে স্থিতিশীলতা, অর্থনীতি ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা যুদ্ধের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইরানে হামলার প্রশ্নে তাদের ‘না’ আসলে সেই নতুন বাস্তবতারই প্রতিফলন।
আপনার মতামত জানানঃ