
বাংলাদেশ চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের কাছ থেকে যে পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ পেয়েছে, তার চেয়ে বেশি অর্থ পরিশোধ করেছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অধীনে বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ধীরগতির মধ্যে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে দেশটি মোট ২ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করেছে।
অন্যদিকে, একই সময়ে বিদেশি ঋণের ছাড় আগের বছরের তুলনায় ৩৩ শতাংশ কমে ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যা একজন অর্থনীতিবিদের মতে সতর্ক সংকেত।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) বাংলাদেশের প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান বলেন, ঋণ পরিশোধ নতুন বৈদেশিক ঋণ প্রবাহকে ছাড়িয়ে যাওয়া একটি সতর্কবার্তা। তাঁর ভাষায়, এর অর্থ হলো বাংলাদেশ এখন যত বৈদেশিক সম্পদ পাচ্ছে তার চেয়ে বেশি বাইরে পরিশোধ করছে, ফলে রাজস্ব ও বৈদেশিক তারল্যের ওপর চাপ বাড়ছে।
তিনি আরও বলেন, এটি শুধু পরিপক্ব ঋণ পরিশোধের ফল নয়; দুর্বল প্রকল্প বাস্তবায়ন, ধীর ঋণ ছাড় এবং রপ্তানির সীমিত গতিশীলতাও এর পেছনে কাজ করছে। যদিও পরিস্থিতি এখনো সংকট নয়, তবে এটি নীতিনির্ধারণের সুযোগ সংকুচিত করছে এবং রাজস্ব আহরণ জোরদার, রপ্তানি প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি ও সতর্ক বৈদেশিক ঋণ কৌশলের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে বিদেশি অর্থায়নে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৩৬ শতাংশ, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় সামান্য বেশি।
এই সময়ে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, রাশিয়া, চীন, জাপান ও ভারতের মতো ঋণদাতাদের প্রতিশ্রুতিও বছরে ৩ শতাংশ কমে ২ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
বিদেশি ঋণের প্রতিশ্রুতি ও ছাড় কমে যাওয়ার পাশাপাশি রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার নিচে থাকায় এবং সরকারের ব্যাংক ঋণ বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি আরও চাপে পড়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে রাজস্ব আদায় আগের বছরের তুলনায় ১৩ শতাংশ বাড়ালেও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৭ শতাংশ কম সংগ্রহ করেছে, যার ঘাটতি প্রায় ৬০ হাজার ১১০ কোটি টাকা।
একই সময়ে সরকারের নিট ব্যাংক ঋণ বেড়ে ৪৮ হাজার ৮০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর অতিরিক্ত পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, ঋণ পরিশোধের জন্য সরকারের ঋণগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাঁর মতে, সরকারের রাজস্ব সক্ষমতা বা ‘ফিসকাল স্পেস’ ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে।
গত কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ বাড়ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশটি বহুপাক্ষিক ও দ্বিপাক্ষিক ঋণদাতাদের প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে, যা আগের বছরের ৬ বিলিয়ন ডলার থেকে বেশি।
অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান মনে করেন, কাঠামোগত অর্থনৈতিক সংস্কার এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং অপরিহার্য। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ জোরদার করা—এসব পদক্ষেপ একটি স্থিতিশীল ও সহনশীল অর্থনৈতিক কাঠামো গঠনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সতর্ক করে বলেন, এসব সংস্কার ছাড়া বৈদেশিক ঝুঁকি বারবার ফিরে আসবে এবং প্রবৃদ্ধি ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বাধাগ্রস্ত হবে।
আপনার মতামত জানানঃ