
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর যখন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে, তখন বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল এক ধরনের অনিশ্চিত মোড়ে দাঁড়িয়ে। আগের সরকারের পতনের সঙ্গে সঙ্গে যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তার প্রত্যক্ষ অভিঘাত পড়েছিল অর্থনীতির প্রায় সব সূচকে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিত্যপণ্যের লাগামছাড়া দাম, ডলারের তীব্র সংকট, বৈদেশিক ঋণের চাপ, ব্যাংকখাতের নাজুক অবস্থা এবং দীর্ঘদিনের অর্থপাচারের ক্ষত—সব মিলিয়ে অর্থনীতির সামনে তখন বড় প্রশ্ন ছিল, এটি আদৌ ভেঙে পড়বে কি না। সেই বাস্তবতায় অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের পথচলা শেষে আজ মূল্যায়নের প্রশ্ন উঠছে—অর্থনীতি কতটা পাল্টেছে, আর কতটাই বা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।
ক্ষমতা গ্রহণের সময় সরকারের প্রথম ও প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল মূল্যস্ফীতি সামাল দেওয়া। আগের সরকারের শেষ দিকে মূল্যস্ফীতি ১১ শতাংশের ওপরে উঠে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনে নিত্যদিনের খরচ ছিল এক ধরনের দুঃসহ অভিজ্ঞতা। নতুন সরকার সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করে টাকা ছাপানো বন্ধ করে এবং ব্যাংক ঋণে সুদের হার বাড়ানোর মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়। উদ্দেশ্য ছিল বাজারে অতিরিক্ত টাকার প্রবাহ কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা। এর ফল হিসেবে পরিসংখ্যানগতভাবে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে ঠিকই, তবে তা এখনও উচ্চ পর্যায়েই রয়ে গেছে। আট থেকে সাড়ে আট শতাংশের ঘরে থাকা মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের কাছে খুব একটা স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসেনি। বাজারে গেলে এখনও আলু, পেঁয়াজ, ভোজ্যতেল কিংবা চালের দামে মানুষের ক্ষোভ চোখে পড়ে। মূল্যস্ফীতির হার কমলেও জীবনের খরচ যে হারে বেড়েছে, তার সঙ্গে আয়ের সমন্বয় হয়নি—এই বাস্তবতাই মানুষের হতাশার মূল কারণ।
মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত আরেকটি বড় বিষয় হলো দারিদ্র্যের হার। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে দারিদ্র্য হ্রাসের যে ধারা চলছিল, দেড় বছরে এসে সেখানে একটি উল্টো স্রোত দেখা গেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে, বিশেষ করে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্ষেত্রে। বিশ্বব্যাংক এবং বেসরকারি গবেষণা সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, দারিদ্র্যের হার আবার বাড়তির দিকে। এটি শুধু একটি পরিসংখ্যানগত পরিবর্তন নয়, বরং সামাজিক বাস্তবতায় তার প্রভাব স্পষ্ট। শহরের বস্তি থেকে গ্রামাঞ্চলের শ্রমজীবী মানুষ—সবখানেই জীবনযাত্রার মানের অবনতি চোখে পড়ছে।
তবে এই অন্ধকারের মধ্যেও কিছু জায়গায় সরকার স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পেরেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তার অন্যতম উদাহরণ। ২০২৪ সালের আগস্টে রিজার্ভ যখন ১৫ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে গিয়েছিল, তখন অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন যে বাংলাদেশ হয়তো ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হবে। দেড় বছরের ব্যবধানে রিজার্ভ আবার ৩২ বিলিয়ন ডলারের ঘরে উঠে আসা নিঃসন্দেহে একটি বড় সাফল্য। এর পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রবণতা বেড়েছে, যা ব্যাংকখাতে মানুষের আস্থা ফেরার একটি ইঙ্গিত দেয়। সরকার ব্যাংকখাত সংস্কারের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তার সুফল এখানে আংশিকভাবে দেখা যাচ্ছে।
ব্যাংকখাত ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের আরেকটি বড় মাথাব্যথা। আগের সরকারের সময় দীর্ঘদিন ধরে চলা লুটপাট, অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অনেক ব্যাংক কার্যত দেউলিয়া অবস্থায় পৌঁছেছিল। গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে না পারার মতো ঘটনাও ঘটেছে। নতুন সরকার এসে কয়েকটি দুর্বল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় এবং একাধিক ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে নতুন কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেয়। এসব পদক্ষেপ ব্যাংকখাতে এক ধরনের শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা হিসেবে দেখা হয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, দেড় বছরে যত সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে ব্যাংকখাতেই তুলনামূলকভাবে বেশি অগ্রগতি দেখা গেছে।
তবে এই খাতেও বড় এক সমস্যা থেকে গেছে—খেলাপি ঋণ। খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছয় লাখ কোটি টাকার বেশি হওয়া শুধু ব্যাংকখাতের সমস্যা নয়, এটি পুরো অর্থনীতির জন্য একটি ‘চেইন রিঅ্যাকশন’ তৈরি করেছে। ব্যাংকগুলো নতুন করে ঋণ দিতে পারছে না, ফলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমে গেছে। বিনিয়োগ কম মানে নতুন কারখানা নয়, নতুন ব্যবসা নয়, নতুন কর্মসংস্থানও নয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে শ্রমবাজারে। বেকারত্ব বেড়েছে, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে ছিল বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি এবং উচ্চ সুদের হার বিনিয়োগের জন্য মোটেও সহায়ক পরিবেশ তৈরি করেনি। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিদেশি বিনিয়োগকারীদেরও নিরুৎসাহিত করেছে। সরকার বিনিয়োগ সম্মেলন করলেও বাস্তবে বড় ধরনের দেশি বা বিদেশি বিনিয়োগ আসেনি। ফলে অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত গতি ফিরে আসেনি, জিডিপি প্রবৃদ্ধির হারও নেমে এসেছে অস্বস্তিকর পর্যায়ে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল অর্থপাচারের বিষয়টি সামনে আনা। আগের সরকারের সময় কী পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে, তা নিরূপণের জন্য শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হয়। সেখানে যে বিপুল অঙ্কের তথ্য উঠে এসেছে, তা দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতির ভয়াবহ চিত্রই তুলে ধরে। পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার জন্য টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে এবং দেশ-বিদেশে সম্পত্তি জব্দের কিছু উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত দীর্ঘ এবং জটিল। দেড় বছরে বড় সাফল্য আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। তবু অন্তত প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছে—এটুকুই এই সরকারের অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপও ছিল বড় একটি চ্যালেঞ্জ। আগের সরকারের নেওয়া মেগা প্রকল্পগুলোর ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হওয়ায় সরকারের ওপর চাপ বেড়েছে। রিজার্ভ কিছুটা বাড়ায় আপাতত এই চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে, কিন্তু ভবিষ্যতে এটি আবার বড় সংকট হয়ে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের অর্থনৈতিক চিত্রটি একেবারে সাদা বা কালো নয়। একদিকে অর্থনীতি ভেঙে পড়েনি, বৈদেশিক রিজার্ভে স্থিতিশীলতা এসেছে, ব্যাংকখাতে কিছু সংস্কার শুরু হয়েছে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি এখনও উচ্চ, দারিদ্র্য বেড়েছে, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান স্থবির, আর সাধারণ মানুষের জীবনে প্রত্যাশিত স্বস্তি আসেনি। এই দেড় বছর ছিল মূলত ক্ষত সামলানোর সময়, বড় কোনো উল্লম্ফনের নয়। অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে এক ধরনের ‘পুনরুদ্ধারের মাঝপথে’—যেখানে কিছু ভিত্তি মেরামত হয়েছে, কিন্তু সামনে পথ এখনও কঠিন ও অনিশ্চিত।
আপনার মতামত জানানঃ