ঢাকার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে যখন নির্বাচনী উত্তেজনা তুঙ্গে, ঠিক সেই সময়—একটি রূপান্তরমুখী সাধারণ নির্বাচনের মাত্র বাহাত্তর ঘণ্টা আগে—৯ ফেব্রুয়ারি একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ওয়াশিংটনের উদ্দেশে রওনা হওয়ার খবর যেন স্বাভাবিক ঘটনাপ্রবাহকে ছাপিয়ে গেছে। এই সফর কোনো আনুষ্ঠানিক সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়, কিংবা ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নিয়ে কথাবার্তার সাধারণ পর্বও নয়। লক্ষ্য একেবারে নির্দিষ্ট ও তাৎপর্যপূর্ণ: এমন একটি বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করা, যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক গতিপথকে শুধু সাময়িকভাবে নয়, কাঠামোগতভাবেই পুনর্গঠন করতে পারে।
দেশের ভেতরে এই সময় নির্ধারণ নিয়ে বিতর্ক তীব্র। সমালোচকদের একটি অংশ একে অন্তর্বর্তী সরকারের সুপরিকল্পিত কৌশল হিসেবে দেখছেন—নির্বাচনের প্রাক্কালে আন্তর্জাতিক বৈধতা ও পশ্চিমা সমর্থন নিশ্চিত করার প্রয়াস বলে ব্যাখ্যা করছেন তারা। আবার অন্যরা বলছেন, এটি নিছক রাজনৈতিক বার্তা নয়; বরং অর্থনৈতিক বাস্তবতার চাপ থেকেই জন্ম নেওয়া এক ধরনের বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত। কারণ, দৃশ্যমান রাজনীতির আড়ালে বাংলাদেশের অর্থনীতি এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে দেরি করার সুযোগ প্রায় নেই।
এই প্রেক্ষাপট বোঝার জন্য চোখ ফেরাতে হয় ২০২৬ সালের নভেম্বরের দিকে। ওই সময় স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ কার্যকর হবে—একটি অর্জন, যা জাতীয় গৌরবের হলেও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কঠিন মূল্য। কয়েক দশক ধরে যে অর্থনীতি শুল্কমুক্ত ও একতরফা বাজারসুবিধার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, সেই সুরক্ষিত বলয় ভেঙে যাবে। তৈরি পোশাক খাত, যা মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় পঁচাশি শতাংশ জোগান দেয়, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বে। এই খাতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, শিল্পখাতে কর্মসংস্থান এবং গ্রামীণ-শহুরে অর্থনৈতিক ভারসাম্য।
নীতিনির্ধারক ও বিশ্লেষকদের হিসাব নির্মম। অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা হারালে প্রতিবছর সর্বোচ্চ আট বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত রপ্তানি আয় কমে যেতে পারে। এর অর্থ শুধু সংখ্যার ঘাটতি নয়; এর প্রভাব পড়বে রিজার্ভের স্থিতিশীলতা, মুদ্রার মান, আমদানি সক্ষমতা এবং শেষ পর্যন্ত সামাজিক স্থিতির ওপর। এই ঝুঁকি আরও প্রকট হয়েছে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের কারণে। ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া পশ্চিমা বাজারের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে স্থায়ী ও কাঠামোগত বাণিজ্য চুক্তি নিশ্চিত করতে পেরেছে। তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ ইতোমধ্যে পিছিয়ে পড়ার ইঙ্গিত পাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র এখনো বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির সবচেয়ে বড় বাজার। অথচ সেই বাজারেই পরিস্থিতি ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের প্রায় বিশ শতাংশ পাল্টা শুল্কের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এর ফলে কিছু পোশাক পণ্যে কার্যকর শুল্কহার বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ছত্রিশ শতাংশে। এই শুল্কপ্রাচীর ভোক্তা চাহিদা স্থিতিশীল থাকলেও রপ্তানি পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে, মুনাফার মার্জিন সংকুচিত করেছে এবং অনেক কারখানার জন্য টিকে থাকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটনে আলোচিত নতুন বাণিজ্য চুক্তিটি একটি উদ্ভাবনী ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে। ‘কটন-ফর-গার্মেন্টস’ বা সরবরাহ-শৃঙ্খলভিত্তিক বিনিময় কাঠামোর মাধ্যমে শুল্কপ্রাচীর ভাঙার চেষ্টা করা হচ্ছে। নীতিটি সহজ কিন্তু কৌশলগত: বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত কাঁচা তুলা ও কৃত্রিম তন্তু যতটা আমদানি করবে, তার অনুপাতে পোশাক রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। এতে একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য রপ্তানির লক্ষ্য পূরণ হয়, অন্যদিকে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প প্রয়োজনীয় শুল্ক-সুরক্ষা পেয়ে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দাম ধরে রাখতে পারে।
তবে এই চুক্তি শুধু শুল্ক ছাড়ের হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়। পারস্পরিক শুল্কহার বিশ শতাংশ থেকে কমিয়ে পনেরো শতাংশে নামিয়ে আনার বিনিময়ে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের কিছু দাবি মেনে নিতে হয়েছে ঢাকাকে। এর মধ্যে রয়েছে ই-কমার্সে শুল্ক আরোপে স্থগিতাদেশ, মেধাস্বত্ব আইন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য করা এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের সংস্কার উদ্যোগে সমর্থন দেওয়া। এসব শর্ত কেবল কাগুজে প্রতিশ্রুতি নয়; এগুলো বাস্তবায়ন মানে দেশের নিয়ন্ত্রক কাঠামোয় গভীর পরিবর্তন।
এই অঙ্গীকারগুলো স্পষ্ট করে দেয় যে এলডিসি-উত্তর বাস্তবতায় টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে উচ্চমানের বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের মতো একটি বিশ্বাসযোগ্য ও পরিশীলিত ব্যবসা পরিবেশ গড়ে তুলতেই হবে। বিনিয়োগকারীদের জন্য আইনের শাসন, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের সুরক্ষা এবং ডিজিটাল বাণিজ্যের স্বচ্ছতা এখন আর ঐচ্ছিক বিষয় নয়; এগুলো প্রতিযোগিতার শর্ত।
চুক্তিটির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের রাজনৈতিক রূপান্তরের আদর্শিক ভিত্তি বহন করছে। ‘জুলাই চার্টার’-এর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পুনর্গঠন তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে এই বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর সরকারের সেই সক্ষমতার একটি দৃশ্যমান প্রমাণ হিসেবে হাজির হচ্ছে। এটি দেশীয় ভোটারদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদেরও বার্তা দেয়—রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাঝেও বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত।
একই সঙ্গে নির্বাচনের আগেই চুক্তিটি সই করার মাধ্যমে বর্তমান প্রশাসন কার্যত ভবিষ্যৎ নীতিকাঠামোর ভেতরে একটি প্রো-পশ্চিমা বাণিজ্যিক অভিমুখ স্থায়ীভাবে প্রোথিত করে দিচ্ছে। পরবর্তী কোনো সরকারের জন্য এই পথ থেকে সরে আসা সহজ হবে না। ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এটি একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের অংশ। চীনের অবকাঠামো বিনিয়োগ ও ভারতের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাংলাদেশকে কোনো একক শক্তির ওপর অতিনির্ভরশীল হওয়া থেকে রক্ষা করে।
এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার ও গণতন্ত্র বিষয়ক সমালোচনার কারণে মাঝেমধ্যে টানাপোড়েনে পড়া দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে অর্থনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতে স্থিতিশীল রাখার একটি বাস্তববাদী পথও তৈরি করে। তবে চুক্তি স্বাক্ষর মানেই সব সমস্যার সমাধান নয়। এটি কেবল শুরু। প্রকৃত পরীক্ষা হবে নির্বাচন-পরবর্তী বাস্তবায়নে।
অতীত অভিজ্ঞতা খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। বন্দর অবকাঠামোর দুর্বলতা, কাস্টমসের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং শ্রম মানদণ্ডে স্বচ্ছতার অভাব বারবার বাণিজ্য সুবিধার পূর্ণ সুফল পেতে বাধা সৃষ্টি করেছে। নতুন চুক্তির সর্বোচ্চ সুবিধা পেতে হলে পরবর্তী সরকারকে লজিস্টিকস, জ্বালানি সরবরাহ এবং ডিজিটাল বাণিজ্য অবকাঠামোয় কঠোর সংস্কার আনতেই হবে। নচেৎ ক্রমবর্ধমান শ্রম ব্যয় ও জ্বালানি খরচের চাপে পনেরো শতাংশ শুল্কহারও অচিরেই অপর্যাপ্ত প্রমাণিত হতে পারে।
আরও একটি বড় প্রশ্ন রয়ে যায়—এই চুক্তি বাংলাদেশের রপ্তানি মডেলের মৌলিক সীমাবদ্ধতা কতটা দূর করতে পারবে? পোশাক খাতকে এটি সাময়িক স্বস্তি দিলেও উচ্চমূল্য সংযোজনযুক্ত উৎপাদন ও সেবা খাতে বৈচিত্র্য আনার চ্যালেঞ্জের সমাধান দেয় না। প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ ও উদ্ভাবনে বৃহৎ বিনিয়োগ ছাড়া সেই রূপান্তর সম্ভব নয়। অথচ সেই দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা এখনো অস্পষ্ট।
বিশ্ব যখন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে, তখন ৯ ফেব্রুয়ারির ওয়াশিংটন সফর ও সম্ভাব্য স্বাক্ষর অনুষ্ঠান একটি শক্তিশালী প্রস্তাবনার মতো কাজ করছে। এটি মনে করিয়ে দেয় যে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে শেষ বিচারে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার চাবিকাঠি অর্থনৈতিক নিরাপত্তাই। এলডিসি-উত্তরণ-পরবর্তী জীবনের প্রস্তুতির জানালা দ্রুত বন্ধ হয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই বাণিজ্য চুক্তি হয়তো সেই সীমিত সময়ের মধ্যে অর্জিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার—যাতে জানালা বন্ধ হলেও বাংলাদেশের পোশাক কারখানার আলো নিভে না যায়।
এই চুক্তি নতুন সমৃদ্ধির ভিত্তি স্থাপন করবে, নাকি ভবিষ্যতের কোনো অর্থনৈতিক সংকোচনের পাদটীকা হয়ে থাকবে—সে উত্তর লুকিয়ে আছে নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং সংস্কারের বাস্তবায়নে। সময় খুব বেশি নেই, আর সিদ্ধান্তের মূল্য এবার সত্যিই ইতিহাস নির্ধারণ করবে।
আপনার মতামত জানানঃ