রাজধানী ঢাকার ফুটপাথ এক সময় ছিল মানুষের নিশ্চিন্ত হাঁটার জায়গা—নগর জীবনের স্বাভাবিক প্রবাহের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ফুটপাথ আজ অনেক জায়গায় পরিণত হয়েছে দখল, চাঁদাবাজি ও অঘোষিত নিয়ন্ত্রণের এক জটিল ব্যবস্থায়। প্রতিদিন লাখো মানুষ অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল কিংবা ব্যবসায়িক কাজে বের হলেও তাদের জন্য নিরাপদ হাঁটার পথ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। ফুটপাথজুড়ে সারি সারি দোকান, রাস্তার একাংশ দখল করে ভ্যান ও অস্থায়ী স্টল, আর মাঝখানে থমকে থাকা যানজট—সব মিলিয়ে নগর জীবনে তৈরি হয়েছে এক অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী অর্থনীতি, যার প্রভাব পড়ছে নাগরিক অধিকার থেকে শুরু করে নগর ব্যবস্থাপনার ওপর।
বিভিন্ন গবেষণা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে উঠে এসেছে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় ফুটপাথ দখলকে কেন্দ্র করে বছরে প্রায় ১ হাজার ৮২৫ কোটি টাকার চাঁদাবাজি হয় বলে ধারণা করা হয়। অর্থাৎ প্রতিদিন কয়েক কোটি টাকার লেনদেন এই খাতে ঘুরছে, যার একটি টাকাও রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা পড়ে না। অভিযোগ রয়েছে, এই অর্থ ভাগ হয়ে যায় স্থানীয় সিন্ডিকেট, প্রভাবশালী রাজনৈতিক গোষ্ঠী এবং অসাধু আইনশৃঙ্খলা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে। ফলে ফুটপাথ ধীরে ধীরে সাধারণ নাগরিকের নাগালের বাইরে সরে গিয়ে এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক ‘নিয়ন্ত্রিত বাজারে’ রূপ নিয়েছে।
উচ্চ আদালত অতীতে ফুটপাথ দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর নির্দেশ দিয়েছিল এবং সংশ্লিষ্টদের তালিকা চেয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল অবৈধ দখল ও চাঁদাবাজি চক্র শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, উচ্ছেদ অভিযান বা কাগুজে নির্দেশের পরও পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তন হয়নি। স্থানীয়দের ভাষায়, পুরনো দখলদার সরে গেলেও নতুন দখলদার এসে জায়গা নেয়। অর্থাৎ কাঠামো অটুট থেকে যায়, শুধু নিয়ন্ত্রণের হাত বদল হয়। এতে করে আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নের বদলে ফুটপাথ অনেক ক্ষেত্রে হয়ে উঠেছে প্রভাব বদলের ক্ষেত্র, যেখানে নাগরিকের হাঁটার অধিকার এখনো নিশ্চিত হয়নি।
ঢাকার ব্যস্ত এলাকাগুলো ঘুরে দেখলে ফুটপাথের এই অদৃশ্য অর্থনীতির চিত্র আরও স্পষ্ট হয়। ফার্মগেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে সকাল থেকেই ওভারব্রিজের নিচে ও আশপাশে সারি সারি দোকান বসে। কাপড়, জুতা, ফল, মোবাইল অ্যাকসেসরিজ থেকে শুরু করে চা-নাস্তার পসরা—সবই পাওয়া যায়। অনেক দোকানি জানান, দোকানের অবস্থান ও আকার অনুযায়ী প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। আগে সরাসরি টাকা তোলা হলেও এখন অনেক ক্ষেত্রে ‘ম্যানেজার’ নামে মধ্যস্থতাকারী এসে সংগ্রহ করে নিয়ে যায়। সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনা বাড়ার পর চক্রটি আরও কৌশলী হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
মতিঝিল এলাকায় চিত্র আরও সংগঠিত। দেশের আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই এলাকায় অফিসপাড়ার ফুটপাথ ঘিরে বসা দোকানগুলোর জন্য নির্দিষ্ট রেট নির্ধারিত আছে বলে স্থানীয়রা জানান। কোথাও জুসের দোকান ৫০০ টাকা, কোথাও ভাজাপোড়া বা নাস্তার দোকান ২,৫০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিদিন সন্ধ্যার পর নিয়মিত টাকা তোলা হয় এবং কেউ না দিলে দোকান টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রায়ই এমন অভিযোগ অস্বীকার করে থাকে, তবু মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন চিত্রের ইঙ্গিত দেয়।
গুলিস্তান এলাকায় পরিস্থিতি অনেক সময় আরও জটিল। দুপুরে সেখানে গেলে মনে হয় খোলা আকাশের নিচে বিশাল অস্থায়ী বাজার বসেছে। ফুটপাথ তো বটেই, অনেক জায়গায় দোকান ছড়িয়ে পড়েছে সড়কের মাঝামাঝি পর্যন্ত। পথচারীরা বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে যানবাহনের ফাঁক গলে হাঁটেন। কয়েকজন হকার জানান, ব্যবসা করতে হলে প্রতিদিনই বিভিন্ন পক্ষকে টাকা দিতে হয়। এমন পরিবেশে অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না—ভয়, নির্ভরতা এবং অনিশ্চয়তা মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক ধরনের নীরব সংস্কৃতি।
বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকাতেও ফুটপাথ ও রাস্তার পাশজুড়ে হকার বসার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়ভাবে বলা হয়, বিভিন্ন স্থানে মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে নিয়মিত টাকা তোলা হয়। যদিও সিটি করপোরেশন মাঝে মাঝে উচ্ছেদ অভিযান চালায়, অভিযোগ রয়েছে পরে আবার আগের মতো দোকান বসে যায়। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে অনেক সময় আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায় না বা বিষয়টি অন্য কর্তৃপক্ষের ওপর দায়িত্ব হিসেবে দেখানো হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকেও প্রায়ই বলা হয়, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ফুটপাথ ব্যবস্থাপনা মূলত সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সমস্যাটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িত আছে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং নগর পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা। স্থানীয় প্রভাবশালীরা অনেক ক্ষেত্রে ফুটপাথকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা হিসেবে ধরে রাখে বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কিছু সদস্য যদি সুবিধাভোগী হয়ে যায়—এমন অভিযোগ সত্য হলে—তাহলে উচ্ছেদ অভিযান স্থায়ী ফল দিতে পারে না। অভিযান শেষ হলেই দোকান আবার ফিরে আসে।
তবে এই চিত্রের আরেকটি মানবিক দিকও রয়েছে, যা উপেক্ষা করা যায় না। ফুটপাথে বসা বহু হকারই মূলত জীবিকার তাগিদে এখানে এসেছে। কেউ নদীভাঙনে জমি হারিয়েছে, কেউ গ্রাম থেকে কাজের খোঁজে এসে ব্যর্থ হয়েছে, কেউ কারখানার চাকরি হারিয়ে বিকল্প পথ খুঁজছে। তাদের বড় পুঁজি নেই, দোকান ভাড়া নেওয়ার সামর্থ্য নেই, ব্যাংক ঋণ পাওয়ার সুযোগও সীমিত। একটি ত্রিপল, কয়েকটি পণ্য আর সামান্য মূলধনই তাদের ভরসা। দিন শেষে বিক্রি না হলে পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। অনেকের ভাষায়, “এখানে না বসলে সংসার চলবে কীভাবে?” এই বাস্তবতা সমস্যাটিকে আরও জটিল করে তোলে।
অন্যদিকে ফুটপাথ দখলের কারণে নাগরিক জীবনে যে চাপ তৈরি হচ্ছে, তা স্পষ্ট। পথচারীদের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ছে, যানজট বাড়ছে, জরুরি সেবা ব্যাহত হচ্ছে। শিশু, বয়স্ক ও নারীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন। বৈধ দোকানিরাও অভিযোগ করেন, ফুটপাথের সস্তা পসরা তাদের ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে এটি শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি নগর অর্থনীতি, জননিরাপত্তা এবং পরিকল্পিত নগরায়ণের প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত।
সমাধান খুঁজতে গেলে কেবল উচ্ছেদ অভিযানকে স্থায়ী পথ হিসেবে দেখা কঠিন। বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রথমেই প্রয়োজন হকারদের একটি পূর্ণাঙ্গ নিবন্ধন ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থা। লাইসেন্সপ্রাপ্ত হকারদের নির্দিষ্ট জোনে স্থানান্তর করা গেলে ফুটপাথ আংশিক মুক্ত রাখা সম্ভব। পাশাপাশি ডিজিটাল ফি ব্যবস্থার মাধ্যমে নগদ লেনদেন কমিয়ে আনলে চাঁদাবাজির সুযোগ কমতে পারে। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে বড় কথা, পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ টেকসই সমাধান নয়। বিকল্প হকার জোন, ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য সহজ ঋণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারলে অনেকেই স্বেচ্ছায় ফুটপাথ ছাড়তে আগ্রহী হতে পারেন। নগর পরিকল্পনা, সামাজিক বাস্তবতা এবং অর্থনৈতিক প্রয়োজন—এই তিনটি দিককে একসঙ্গে বিবেচনায় আনলেই কেবল কার্যকর সমাধান সম্ভব।
ঢাকার ফুটপাথ আজ এক কঠিন বাস্তবতার প্রতীক—এখানে যেমন আছে নাগরিক অধিকার হরণের অভিযোগ, তেমনি আছে বেঁচে থাকার সংগ্রামে নামা মানুষের গল্প। প্রশ্ন এখন একটাই: এই শহর কি তার পথচারীদের জন্য নিরাপদ হাঁটার জায়গা ফিরিয়ে দিতে পারবে, নাকি অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণের এই চক্রই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে? উত্তরটি নির্ভর করছে সমন্বিত ও মানবিক নীতিনির্ধারণের ওপর, যা একদিকে নাগরিক অধিকার রক্ষা করবে, অন্যদিকে জীবিকার লড়াইয়ে থাকা মানুষদেরও টেকসই পথ দেখাবে।
আপনার মতামত জানানঃ