ভোর তখন প্রায় চারটা। রাজধানীর আগারগাঁও এলাকা তখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। শহরের ব্যস্ততা, গাড়ির হর্ন আর মানুষের কোলাহলহীন সেই মুহূর্তে রাস্তার বাতিগুলো কেবল ম্লান আলো ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। নির্বাচন কমিশন ভবনের পাশ দিয়ে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিল একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা। রিকশায় বসে ছিলেন চল্লিশোর্ধ্ব শিল্পী বেগম। মুখজুড়ে ছিল উদ্বেগ আর তাড়াহুড়ো। কিছুক্ষণ আগেই হাসপাতাল থেকে ফোন এসেছিল—তার মায়ের অবস্থা সংকটাপন্ন। দ্রুত চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন ২৫ হাজার টাকা। মেয়ের দায়িত্ব আর মায়ের জীবন বাঁচানোর তাগিদে রাতের অন্ধকার ভেদ করে টাকা নিয়ে হাসপাতালে ছুটছিলেন তিনি। কিন্তু হাসপাতালের দরজায় পৌঁছানোর আগেই থেমে যায় সেই ছুটে চলা জীবন।
হঠাৎ দুটি মোটরসাইকেল এসে রিকশার সামনে দাঁড়ায়। মুহূর্তেই চারদিক ঘিরে ধরে কয়েকজন যুবক। কারও হাতে ধারালো অস্ত্র, কারও চোখে ভয়ংকর আগ্রাসন। কিছু বোঝার আগেই শিল্পী বেগমের ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা শুরু হয়। বাধা দিতে গেলে শুরু হয় হামলা। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে রক্তাক্ত হয়ে রিকশাতেই লুটিয়ে পড়েন তিনি। ছিনতাইকারীরা টাকা ও মোবাইল ফোন নিয়ে অন্ধকারের ভেতর মিলিয়ে যায়। ভোরের নিস্তব্ধ শহর যেন কিছুই দেখেনি, কিছুই শোনেনি।
এই একটি ঘটনা যেন পুরো রাজধানীর বর্তমান বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। ঢাকা এখন কেবল যানজট, দূষণ কিংবা ব্যস্ততার শহর নয়; এটি ধীরে ধীরে আতঙ্কের শহরে পরিণত হচ্ছে। যেখানে সাধারণ মানুষ ঘর থেকে বের হওয়ার আগে মনে মনে হিসাব করে—আজ নিরাপদে ফিরতে পারবে তো? মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে হাঁটলে বুক ধড়ফড় করে, বাসের জানালার পাশে বসলে ভয় কাজ করে, রিকশায় উঠলে পেছনে মোটরসাইকেলের শব্দ শুনেই মানুষ চমকে ওঠে। রাতের শহর তো বটেই, দিনের আলোতেও নিরাপত্তাহীনতা যেন ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
রাজধানীর অলিগলি থেকে প্রধান সড়ক—সবখানেই এখন ছিনতাই, চুরি, দস্যুতা আর কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাতের গল্প শোনা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই ছড়িয়ে পড়ছে নতুন নতুন ভিডিও। কোথাও মোটরসাইকেলে এসে পথচারীর ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে, কোথাও দলবদ্ধ কিশোর চাপাতি হাতে হামলা চালাচ্ছে, কোথাও আবার প্রকাশ্যে গুলির ঘটনা ঘটছে। এসব ভিডিও সাধারণ মানুষের মনে ভয় আরও গভীর করে তুলছে। কারণ মানুষ বুঝতে পারছে, অপরাধীরা এখন অনেক বেশি বেপরোয়া।
কিছুদিন আগেও রাজধানীর মানুষ রাতে নির্দ্বিধায় চলাফেরা করতে পারত। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা শেষে বাড়ি ফেরা, রাতের খাবার খেয়ে রিকশায় ঘুরে বেড়ানো কিংবা অফিস শেষে বাসায় ফেরা ছিল স্বাভাবিক জীবনযাত্রার অংশ। এখন সেই স্বাভাবিকতাই ভেঙে পড়ছে। সন্ধ্যার পর অনেক পরিবার সন্তানদের বাইরে যেতে দিতে ভয় পায়। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা গভীর রাতে একা চলাফেরা এড়িয়ে চলে। নারীদের জন্য পরিস্থিতি আরও ভীতিকর। কারণ ছিনতাইয়ের পাশাপাশি হয়রানি ও সহিংসতার ঝুঁকিও বাড়ছে।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতির পেছনে বড় একটি কারণ হিসেবে উঠে এসেছে কিশোর গ্যাং। বয়সে তরুণ হলেও তাদের হাতে এখন অস্ত্র দেখা যাচ্ছে। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, মাদক ব্যবসা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রভাব দেখানো—এসবের মধ্য দিয়ে তারা অপরাধের জগতে প্রবেশ করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই কিশোরদের অনেকেই পরিবার ও সমাজের নজরদারির বাইরে চলে যাচ্ছে। কেউ স্কুলছুট, কেউ পারিবারিক অস্থিরতার শিকার, কেউ আবার দ্রুত অর্থ উপার্জনের স্বপ্নে অপরাধের পথে হাঁটছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর প্রভাবও তাদের আকৃষ্ট করছে।
আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া কিশোরদের অনেকেই মাদকাসক্ত। মাদকের টাকা জোগাড় করতে তারা ছিনতাই করছে, দলবদ্ধ হামলা চালাচ্ছে, এমনকি খুন করতেও পিছপা হচ্ছে না। পুলিশ অভিযান চালিয়ে অনেককে গ্রেপ্তার করলেও পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হচ্ছে না। কারণ গ্রেপ্তারের পর অনেকেই দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাফল্যও স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারছে না।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এখন আতঙ্ক যেন নিত্যসঙ্গী। মোহাম্মদপুর, মিরপুর, আদাবর, মালিবাগ, শাহবাগ, যাত্রাবাড়ীসহ নানা এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই ছিনতাই বা হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে। গভীর রাতে মোটরসাইকেলে করে দলবদ্ধভাবে ছিনতাইকারীদের ঘোরাঘুরি এখন সাধারণ দৃশ্য হয়ে উঠেছে। অফিসফেরত মানুষ, রিকশাচালক, পথচারী—কেউই পুরোপুরি নিরাপদ নন।
পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের প্রথম কয়েক মাসেই রাজধানীতে শতাধিক ছিনতাই ও দস্যুতার মামলা হয়েছে। কিন্তু অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। কারণ অনেক ভুক্তভোগী থানায় অভিযোগই করেন না। কেউ ঝামেলা এড়াতে চুপ থাকেন, কেউ পুলিশের প্রতি আস্থাহীনতার কারণে মামলা করতে চান না। অনেকের ধারণা, মামলা করেও তেমন লাভ হয় না। বরং সময়, অর্থ আর মানসিক ভোগান্তি বাড়ে।
এই আস্থাহীনতার পেছনেও রয়েছে নানা অভিজ্ঞতা। অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, থানায় গেলে প্রথমেই তাদের নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। কোথায় ঘটনা ঘটেছে, কোনো সিসিটিভি ফুটেজ আছে কি না, অপরাধীদের চেনেন কি না—এসব প্রশ্নের পর অনেক সময় মামলা নিতে অনীহা দেখা যায়। ফলে সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের অসহায়ত্ব তৈরি হয়েছে। তারা মনে করেন, অপরাধীরা যতটা ভয়ংকর, বিচারহীনতার সংস্কৃতি তার চেয়েও বেশি বিপজ্জনক।
অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। রাজধানীতে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ জীবিকার সন্ধানে আসে। কিন্তু সবার জন্য কাজের সুযোগ তৈরি হয় না। বেকারত্ব, দারিদ্র্য আর হতাশা অনেক তরুণকে অপরাধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কেউ মাদক ব্যবসায় জড়াচ্ছে, কেউ ছিনতাইকারী চক্রের সদস্য হয়ে উঠছে। দ্রুত অর্থ উপার্জনের লোভ, সামাজিক বৈষম্য এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ তাদের অপরাধপ্রবণ করে তুলছে।
অন্যদিকে, সমাজের কিছু উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানও কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা এটিকে এক ধরনের ক্ষমতার প্রদর্শন বা রোমাঞ্চ হিসেবে দেখছে। দামি মোটরসাইকেল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রভাব বিস্তার আর এলাকায় আধিপত্য দেখানোর প্রতিযোগিতা তাদের অপরাধে উৎসাহিত করছে। ফলে অপরাধ এখন শুধু দরিদ্র বা বস্তিকেন্দ্রিক কোনো সমস্যা নয়; এটি সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ছে।
মানবাধিকারকর্মী ও সমাজ বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই পরিস্থিতি কেবল আইনশৃঙ্খলার অবনতির চিত্র নয়; এটি সামাজিক সংকটেরও বহিঃপ্রকাশ। পরিবারে মূল্যবোধের চর্চা কমে যাওয়া, তরুণদের মানসিক বিকাশে অবহেলা, শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা এবং সামাজিক সচেতনতার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। তারা বলছেন, শুধু পুলিশি অভিযান দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক উদ্যোগ।
নগর পরিকল্পনাবিদরাও বলছেন, রাজধানীর অনেক এলাকা এখনো পর্যাপ্ত সিসিটিভি নজরদারির আওতায় আসেনি। অন্ধকার রাস্তা, অপর্যাপ্ত টহল এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ অপরাধীদের জন্য সুযোগ তৈরি করছে। বিশেষ করে ভোররাত কিংবা গভীর রাতে অনেক এলাকায় কার্যত আইনশৃঙ্খলার উপস্থিতি খুব কম দেখা যায়। ফলে অপরাধীরা সহজেই সুযোগ নেয়।
সাধারণ মানুষ এখন প্রতিনিয়ত নিজেদের নিরাপত্তার কৌশল শিখে নিচ্ছেন। কেউ রাতে একা বের হন না, কেউ ফোন লুকিয়ে ব্যবহার করেন, কেউ আবার ব্যাগ শক্ত করে ধরে রাখেন। রাইড শেয়ার ব্যবহার করলেও অনেকে ভয় পান। পরিবারগুলো সন্তানদের বারবার সাবধান করে দেয়—রাতে বাইরে যেও না, অপরিচিত কাউকে বিশ্বাস করো না, ফোন হাতে নিয়ে হাঁটবে না। অর্থাৎ আতঙ্ক এখন মানুষের জীবনযাপনের অংশ হয়ে উঠছে।
তবু এই শহর থেমে থাকে না। প্রতিদিন লাখো মানুষ জীবিকার তাগিদে ঘর থেকে বের হয়। কেউ অফিসে যায়, কেউ হাসপাতালে, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে, কেউ বাজারে। তাদের প্রত্যেকের মনে কোথাও না কোথাও নিরাপদে ফেরার আকাঙ্ক্ষা কাজ করে। কিন্তু যখন প্রকাশ্য সড়কে একজন নারী মায়ের চিকিৎসার টাকা নিয়ে হাসপাতালে যেতে গিয়েও নিরাপদ থাকতে পারেন না, তখন প্রশ্ন জাগে—এই শহর আসলে কার জন্য নিরাপদ?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল বাড়ানো, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সিসিটিভি বসানো, মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং কিশোরদের জন্য শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে পরিবার ও সমাজকেও দায়িত্ব নিতে হবে। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, কী করছে—এসব বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
কারণ অপরাধ কখনো হঠাৎ তৈরি হয় না। এটি ধীরে ধীরে জন্ম নেয় অবহেলা, হতাশা, বৈষম্য আর সুযোগের অভাব থেকে। সেই শেকড়কে উপড়ে ফেলতে না পারলে কেবল অভিযান চালিয়ে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
ঢাকা বাংলাদেশের প্রাণকেন্দ্র। এই শহর মানুষকে স্বপ্ন দেখায়, আবার সেই স্বপ্ন ভেঙেও দেয়। তবু মানুষ এই শহর ছেড়ে যেতে পারে না। কারণ এখানেই জীবিকা, শিক্ষা, ভবিষ্যৎ আর সম্ভাবনা। তাই মানুষ এখনো আশা করে—একদিন হয়তো এই শহর আবার নিরাপদ হবে। রাতের রাস্তায় আর আতঙ্ক থাকবে না, মোটরসাইকেলের শব্দ শুনে মানুষ চমকে উঠবে না, কেউ হাসপাতালের পথে ছিনতাইয়ের শিকার হবে না। সেই দিনের অপেক্ষাতেই আছে রাজধানীর সাধারণ মানুষ।
আপনার মতামত জানানঃ