গত বছরের জুন মাসে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ ভূরাজনীতিকে আবারও সামনে নিয়ে আসে। অভিযানের ঘোষণা দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প—এমন দাবি ঘিরে আন্তর্জাতিক আলোচনায় নতুন করে প্রশ্ন ওঠে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের ‘চাপ প্রয়োগ’ কৌশল কতটা কার্যকর হয়েছে। বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করেছে নিষেধাজ্ঞা, সামরিক উপস্থিতি এবং রাজনৈতিক চাপের সমন্বয়ে। ধারণা ছিল, অর্থনৈতিক অবরোধ ও কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা শেষ পর্যন্ত ইরানকে নতি স্বীকারে বাধ্য করবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন গল্প বলছে।
ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা নিঃসন্দেহে দেশটির অর্থনীতিকে চাপে ফেলেছে। সাধারণ মানুষের জীবনে মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি স্পষ্টভাবে প্রভাব ফেলেছে। তবু যে কৌশলটি ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরে অনুসরণ করেছে—অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে রাজনৈতিক ছাড় আদায়—তা প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। বরং ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচিকে কৌশলগত সম্পদে রূপান্তর করেছে এবং পশ্চিমা বিশ্বের বাইরে নতুন অংশীদার খুঁজে নিয়েছে।
যখন যুক্তরাষ্ট্র যৌথ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা (JCPOA) থেকে সরে দাঁড়ায়, তখন হিসাব ছিল তুলনামূলক সরল। হয় ইরানের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ভেঙে পড়বে, নয়তো দেশটি নতুন করে আলোচনায় ফিরতে বাধ্য হবে। কিন্তু তেহরান ভিন্ন পথ বেছে নেয়। তারা অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় বিকল্প বাণিজ্য নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে, আঞ্চলিক সম্পর্ক জোরদার করে এবং নিজেদের প্রতিরোধ কাঠামো শক্তিশালী করে। ফলে নিষেধাজ্ঞা কষ্ট বাড়ালেও রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়েনি।
অর্থনৈতিক যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে লক্ষ্যবস্তু রাষ্ট্র সাধারণত বিকল্প পথ খুঁজে নেয়—এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির পুরোনো বাস্তবতা। ইরানের ক্ষেত্রেও সেটিই ঘটেছে। আর্থিক লেনদেনে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা, স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং সোনা মজুত বাড়ানো—এসব পদক্ষেপ একটি দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন কৌশলের অংশ। এটি ডলারের তাৎক্ষণিক পতনের ইঙ্গিত নয়, বরং ধীরে ধীরে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যের পুনর্বিন্যাসের লক্ষণ।
পশ্চিমা নিরাপত্তা আলোচনায় ইরানের সঙ্গে যুক্ত আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে প্রায়ই ‘প্রক্সি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু এই শব্দের ব্যবহার বাস্তবতাকে আংশিকভাবে আড়াল করে। হামাস, হিজবুল্লাহ বা আনসার-আল্লাহ—এসব সংগঠন তাদের নিজ নিজ সমাজের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা প্রেক্ষাপট থেকে উঠে এসেছে। তাদের উত্থানের পেছনে রয়েছে দখল, অবরোধ, আঞ্চলিক সংঘাত ও রাজনৈতিক বঞ্চনার জটিল ইতিহাস। কেউ তাদের কৌশলের সঙ্গে একমত হোক বা না হোক, তাদের সামাজিক ভিত্তি যে বাস্তব—তা অস্বীকার করা কঠিন।
ইতিহাসে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো প্রায়ই ভাষাগত কাঠামোর মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে সংজ্ঞায়িত করেছে। ‘সন্ত্রাসী’, ‘উগ্রপন্থী’ বা ‘প্রক্সি’—এই শব্দগুলো আন্তর্জাতিক আলোচনায় দ্রুত প্রতিষ্ঠা পায়। কিন্তু কোনো গোষ্ঠীকে একটি নির্দিষ্ট নামে আখ্যায়িত করলেই নৈতিক উচ্চতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না। মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতা আরও জটিল, যেখানে রাষ্ট্র, অরাষ্ট্রীয় শক্তি এবং আঞ্চলিক রাজনীতি পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
ইরান এই নেটওয়ার্কভিত্তিক বাস্তবতাকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করে আসছে। এর ফলে সংঘাতকে একটি নির্দিষ্ট যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রচলিত রাষ্ট্র-রাষ্ট্র যুদ্ধের বদলে এখানে দেখা যায় বহুস্তরীয় প্রতিরোধ কাঠামো, যা ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যাগত বাস্তবতা এবং স্থানীয় সমর্থনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। এ ধরনের কাঠামো মোকাবিলায় শুধু প্রযুক্তিগত সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব অনেক সময় পর্যাপ্ত হয় না।
যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক শক্তি। বিমানবাহী রণতরি, উন্নত নজরদারি ব্যবস্থা এবং বিস্তৃত জোট কাঠামো তার ক্ষমতার দৃশ্যমান প্রতীক। কিন্তু সাম্প্রতিক ইতিহাস দেখিয়েছে, প্রযুক্তিগত ও সামরিক আধিপত্য সব সময় স্থায়ী রাজনৈতিক ফল নিশ্চিত করে না। ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান ও ইরাক—এই তিনটি উদাহরণ প্রায়ই আলোচনায় আসে। বিপুল সামরিক শক্তি ব্যবহার করা হলেও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সেখানে নিশ্চিত করা যায়নি।
ন্যাটোকে পশ্চিমা ঐক্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হলেও বাস্তবতার ভেতরে জোট রাজনীতির নিজস্ব সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জোটের ভেতরের অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানি উদ্বেগ এবং রাজনৈতিক মতভেদ আরও দৃশ্যমান হয়েছে। কাগজে জোট শক্তিশালী থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যে নতুন বড় সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার রাজনৈতিক আগ্রহ আগের তুলনায় কম বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন।
অন্যদিকে বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থায় ডলারের প্রাধান্য এখনো অটুট। তবু ভূরাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে নিষেধাজ্ঞার ঘন ঘন ব্যবহার অনেক দেশকে বিকল্প লেনদেন পদ্ধতি খুঁজতে উদ্বুদ্ধ করেছে। ব্রিকস প্ল্যাটফর্মে বিকল্প আর্থিক কাঠামো নিয়ে আলোচনা জোরদার হওয়া, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার বৃদ্ধি—এসব পরিবর্তন ধীর কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ। অর্থনৈতিক ক্ষমতা এখনো যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী হাতিয়ার, তবে তা আর প্রশ্নাতীত নয়।
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত, বিশেষ করে গাজায় সামরিক অভিযান, আরেকটি বাস্তবতা সামনে এনেছে। বিপুল ধ্বংসক্ষমতা প্রয়োগ করা হলেও রাজনৈতিক সমাধান এখনো অধরা। বোমাবর্ষণ প্রতিরোধ সম্পূর্ণ নির্মূল করতে পারেনি—এই উপলব্ধি অঞ্চলে ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে। ফলে অনেকের কাছে স্পষ্ট হচ্ছে যে সামরিক প্রাধান্য একা স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না।
ইরান তার ভূগোল, জ্বালানি সম্পদ এবং আঞ্চলিক প্রভাবকে আলোচনায় একটি কাঠামোগত শক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও জানে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে তার প্রভাব শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এই পারস্পরিক হিসাব-নিকাশই দুই পক্ষকে সরাসরি সংঘাতের বদলে নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা ও আলোচনার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ইসরায়েলের নিরাপত্তা কাঠামো যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামরিক সহায়তার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত—এটিও আঞ্চলিক সমীকরণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সহায়তা প্যাকেজ, কূটনৈতিক সমর্থন ও গোয়েন্দা সহযোগিতা মিলিয়ে এই সম্পর্ক মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ভারসাম্যে প্রভাব ফেলে। ফলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা কখনোই সম্পূর্ণ দ্বিপক্ষীয় থাকে না; এটি একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা জটিলতার অংশ।
বর্তমান বাস্তবতায় স্পষ্ট হচ্ছে, একতরফা চাপ প্রয়োগের কৌশলের নিজস্ব সীমা আছে। দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা লক্ষ্যবস্তু রাষ্ট্রকে দুর্বল করার পাশাপাশি তাকে অভিযোজিত হতেও বাধ্য করে। একইভাবে সামরিক শক্তি প্রদর্শন তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেললেও রাজনৈতিক সমাধান নিশ্চিত করতে পারে না। এই দ্বৈত বাস্তবতা ওয়াশিংটন ও তেহরান—উভয় পক্ষকেই নতুন করে হিসাব করতে বাধ্য করছে।
ইরানের জন্য অগ্রাধিকার এখন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনর্গঠন এবং অভ্যন্তরীণ চাপ মোকাবিলা করা। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে জড়িয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষয় মেনে নিতে অনাগ্রহী। আফগানিস্তান ও ইরাকের অভিজ্ঞতা এখনো নীতিনির্ধারকদের মনে সতর্কতার ছাপ রেখে গেছে।
ফলে বর্তমান আলোচনা মূলত শক্তির নতুন বাস্তবতার স্বীকৃতি। একসময় যে ধারণা প্রবল ছিল—ওয়াশিংটন পরিণতি ছাড়াই শর্ত চাপিয়ে দিতে পারে—তা অনেকটাই ক্ষীণ হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানও বুঝতে পারছে, কৌশলগত সহনশীলতা তাকে টিকিয়ে রাখলেও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য স্থিতিশীল পরিবেশ প্রয়োজন।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে শক্তি এখন আগের তুলনায় বেশি ছড়িয়ে আছে—রাষ্ট্র, অরাষ্ট্রীয় শক্তি, জোট ও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে। এই বহুমাত্রিক বাস্তবতায় সরল সমাধান ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। তাই ক্রমবর্ধমানভাবে স্পষ্ট হচ্ছে, টেকসই সমাধানের পথ শেষ পর্যন্ত সামরিক নয়, বরং রাজনৈতিক আলোচনার মধ্য দিয়েই বেরিয়ে আসতে পারে।
এই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—উভয় পক্ষের সামনে মূল প্রশ্ন একটাই: চাপ ও প্রতিরোধের দীর্ঘ চক্র অব্যাহত থাকবে, নাকি পারস্পরিক সীমাবদ্ধতার স্বীকৃতি দিয়ে একটি নিয়ন্ত্রিত সমঝোতার পথ খোঁজা হবে। ইতিহাস বলছে, যখন সামরিক, আর্থিক ও কূটনৈতিক ঝুঁকি একসঙ্গে বাড়ে, তখন আলোচনার প্রয়োজনীয়তা অনিবার্য হয়ে ওঠে। বর্তমান ভূরাজনীতি ঠিক সেই সন্ধিক্ষণেই দাঁড়িয়ে আছে।
আপনার মতামত জানানঃ