ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর খবরে মধ্যপ্রাচ্যে যে উত্তেজনার সূচনা হয়েছিল, তা এখন পূর্ণমাত্রার সামরিক সংঘাতে রূপ নিয়েছে। তেহরান এই ঘটনাকে সরাসরি আগ্রাসন হিসেবে উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্যাপক পাল্টা হামলা শুরু করেছে। সর্বশেষ পরিস্থিতিতে ইরানি বাহিনী একাধিক দফায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও রাষ্ট্রীয় সূত্রে জানা গেছে।
ইরানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও সংশ্লিষ্ট সামরিক সূত্রের দাবি, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) নতুন ঢেউয়ে অন্তত ২৭টি মার্কিন ঘাঁটি এবং ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনায় আঘাত হেনেছে। তারা এটিকে “প্রতিশোধের ধারাবাহিক অভিযান” হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে হামলা অব্যাহত থাকতে পারে। ইরানের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের সার্বভৌমত্বে আঘাতের জবাব দেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না।
ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করার পর দেশজুড়ে বিমান হামলার সাইরেন বাজানো হয় এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়। তেল আবিব ও আশপাশের এলাকায় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বহু ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতে তেল আবিব অঞ্চলে এক নারী নিহত এবং অন্তত ২০ জন আহত হওয়ার কথা জানিয়েছে জরুরি সেবা সংস্থাগুলো। এতে বোঝা যাচ্ছে, সংঘাতের সরাসরি প্রভাব বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপরও পড়ছে।
ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সব সামরিক স্থাপনাকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হবে। জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় বেসামরিক অবকাঠামো ও সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন। তিনি আন্তর্জাতিক তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের সামরিক অভিযানকে প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করছে। ওয়াশিংটন বলেছে, তাদের হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইরানের পাল্টা হামলায় তাদের কোনো যুদ্ধক্ষেত্রের প্রাণহানি হয়নি এবং ঘাঁটিগুলোর ক্ষতি সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। তবে তারা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
সংঘাত দ্রুত আঞ্চলিক মাত্রা পাচ্ছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি অংশে ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে এবং কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনেও সাইরেন ও প্রতিরক্ষা তৎপরতার খবর এসেছে। এতে আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে যে সংঘাত আরও বিস্তৃত আকার নিতে পারে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস এক বিবৃতিতে বলেছে, তারা “ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর প্রতিশোধমূলক অভিযান” শুরু করতে প্রস্তুত। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, যতক্ষণ পর্যন্ত আগ্রাসন বন্ধ না হবে, ততক্ষণ অভিযান চলবে। একই সঙ্গে তারা মার্কিন ঘাঁটি থাকা আঞ্চলিক দেশগুলোকে সতর্ক বার্তাও দিয়েছে।
এদিকে কূটনৈতিক অঙ্গনে উদ্বেগ দ্রুত বাড়ছে। জাতিসংঘ মহাসচিব তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন এবং বলেছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। চীন অবিলম্বে সংলাপ ও উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছে। ইউরোপের কয়েকটি দেশও সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের অনুরোধ করেছে।
ওয়াশিংটনের অবস্থানও কঠোর। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যদি আরও বড় আঘাত হানে, তবে যুক্তরাষ্ট্র “অভূতপূর্ব শক্তি” প্রয়োগ করবে। তার এই মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, উভয় পক্ষের কঠোর ভাষা ও সামরিক তৎপরতা সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
ইরানের অভ্যন্তরেও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দেশটির শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, খামেনির মৃত্যুর পর অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব কাঠামো গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগের প্রধান এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন ফকিহ মিলে সাময়িকভাবে দায়িত্ব পালন করবেন বলে জানানো হয়েছে। এটি ইঙ্গিত করছে যে সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি ইরানের ভেতরেও বড় রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের সময় শুরু হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ইতোমধ্যে নাজুক ছিল; নতুন এই সংঘাত সেটিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। বিশেষ করে ইরানপন্থী আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোর সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ইরাকের কিছু এলাকায় বিক্ষোভ ও উত্তেজনার খবর পাওয়া গেছে, যেখানে বিক্ষোভকারীরা মার্কিন দূতাবাস এলাকায় যাওয়ার চেষ্টা করেছে বলে নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পারস্য উপসাগর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল রুট হওয়ায় সেখানে উত্তেজনা বাড়লে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হতে পারে। ইতোমধ্যে কিছু আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনস মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ এড়িয়ে চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা পরিস্থিতির গুরুত্বই নির্দেশ করে।
সব মিলিয়ে খামেনির মৃত্যুর পর শুরু হওয়া এই সামরিক পাল্টাপাল্টি হামলা মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন এক অনিশ্চিত অধ্যায়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ইরান তার প্রতিশোধমূলক অভিযান জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছে, আর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলও কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে। এখন আন্তর্জাতিক মহলের প্রধান উদ্বেগ—এই সংঘাত কি সীমিত পর্যায়ে থামবে, নাকি তা পূর্ণমাত্রার আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেবে। পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, এবং প্রতিটি নতুন হামলা মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলছে।
আপনার মতামত জানানঃ