ভারত ও ইসরায়েলের সম্পর্ক গত তিন দশকে এমন এক স্তরে পৌঁছেছে, যা এখন নিছক কূটনৈতিক যোগাযোগের সীমা ছাড়িয়ে পূর্ণাঙ্গ কৌশলগত অংশীদারত্বে রূপ নিয়েছে। প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, কৃষি, সাইবার নিরাপত্তা এবং সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে এই সম্পর্ক গভীর হয়েছে। সমর্থকদের কাছে এটি একটি বাস্তববাদী ও প্রয়োজনভিত্তিক অংশীদারত্ব, কিন্তু সমালোচকদের চোখে এটি ভারতের ঐতিহাসিক নৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এক নীতিগত মোড়। ফলে সম্পর্ক যতই শক্তিশালী হয়েছে, বিতর্কও ততই ঘনীভূত হয়েছে।
১৯৯২ সালে ভারত ও ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পর দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার নতুন অধ্যায় শুরু হয়। ঠান্ডা যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে যে বাস্তববাদী পরিবর্তন আসে, তার অন্যতম প্রতিফলন ছিল ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা। শুরুতে সহযোগিতা ছিল সীমিত ও তুলনামূলক নীরব, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা প্রকাশ্য ও বহুমাত্রিক হয়ে ওঠে। বর্তমানে ইসরায়েল ভারতের অন্যতম বড় অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ, আর ভারত ইসরায়েলি প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা পণ্যের একটি বিশাল বাজারে পরিণত হয়েছে। এই পারস্পরিক নির্ভরতা দুই দেশের মধ্যে উচ্চ আস্থাভিত্তিক সম্পর্ক তৈরি করেছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ২৭ ও ২৮ ফেব্রুয়ারির ইসরায়েল সফরকে তাই কেবল একটি নিয়মিত রাষ্ট্রীয় সফর হিসেবে দেখা হচ্ছে না। তাঁর তৃতীয় মেয়াদে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং অনেকের মতে উচ্চঝুঁকির কূটনৈতিক পদক্ষেপ। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধ, আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিতর্কের প্রেক্ষাপটে এই সফর নতুন করে নজর কাড়ছে। প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা সহযোগিতা আরও গভীর করার সম্ভাবনা যেমন রয়েছে, তেমনি ভারতের নৈতিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে—এমন আশঙ্কা বিশ্লেষকদের একাংশের।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এই সম্পর্কের সবচেয়ে শক্তিশালী স্তম্ভ। ভারত দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, ড্রোন, রাডার ও উন্নত নজরদারি প্রযুক্তি কিনে আসছে। যৌথভাবে অস্ত্র উৎপাদনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে, যেখানে ভারতের বেসরকারি প্রতিরক্ষা খাত—বিশেষ করে আদানি ডিফেন্সের মতো প্রতিষ্ঠান—অংশ নিচ্ছে। ভারতীয় নিরাপত্তা মহলের মতে, সীমান্ত উত্তেজনা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা বাস্তবতায় এই সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সমালোচকেরা বলছেন, এই প্রযুক্তিগুলোর ব্যবহার মানবাধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতার প্রশ্নে নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।
সমালোচনার একটি বড় অংশ ঘিরে আছে কাশ্মীর ও ফিলিস্তিন প্রসঙ্গ। কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, দুই দেশের ডানপন্থী রাজনৈতিক ধারার মধ্যে একটি নীতিগত সাযুজ্য তৈরি হয়েছে, যা নিরাপত্তা ও দখলনীতি বিষয়ে কঠোর অবস্থানকে উৎসাহিত করছে। তাঁদের মতে, ভারতের ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান থেকে সরে এসে ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানো একটি স্পষ্ট কৌশলগত পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত দেয়।
ভারতের পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাসে ফিলিস্তিন প্রশ্ন দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ ছিল। জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের সময় থেকে ভারত উপনিবেশবিরোধী অবস্থান এবং ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবির জোরালো সমর্থক ছিল। ইয়াসির আরাফাত ও ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক সখ্য সেই সময়কার নীতিগত অবস্থানের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। ফলে বর্তমান সময়ে ইসরায়েলের সঙ্গে প্রকাশ্য উষ্ণ সম্পর্ক অনেক প্রবীণ ও প্রগতিশীল নাগরিকের কাছে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে হচ্ছে।
গাজায় বেসামরিক হতাহতের উচ্চ সংখ্যার প্রেক্ষাপটে ভারতের অবস্থান নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। সমালোচকেরা বলছেন, একদিকে মানবিক উদ্বেগ প্রকাশ, অন্যদিকে একই সময়ে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করা—এই দ্বৈত অবস্থান ভারতের নৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। বিশেষ করে জাতিসংঘে কখনো ইসরায়েলপন্থী, কখনো ফিলিস্তিনপন্থী ভোট দেওয়ার ঘটনাকে অনেকেই ভারতের পশ্চিম এশিয়া নীতির দোদুল্যমানতার প্রমাণ হিসেবে দেখছেন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ভারত দ্রুত এর নিন্দা জানায় এবং ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারের প্রতি সমর্থন জানায়। একই সঙ্গে ভারত ন্যায়সংগত ও স্থায়ী শান্তির আহ্বান জানিয়ে গাজায় মানবিক সহায়তাও পাঠায়। সরকার বলছে, সন্ত্রাসবিরোধী অভিন্ন স্বার্থই এই সম্পর্কের মূল ভিত্তি। তবে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি ও নাগরিক সমাজের একটি অংশ মনে করছে, ভারতের প্রতিক্রিয়া ভারসাম্যপূর্ণ হলেও তা আগের তুলনায় ইসরায়েলের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল।
শ্রমবাজার সম্পর্কিত সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তও নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। ফিলিস্তিনি শ্রমিকদের পরিবর্তে হাজারো ভারতীয় শ্রমিককে ইসরায়েলে পাঠানোর সিদ্ধান্তকে কেউ কেউ ইসরায়েলের যুদ্ধ অর্থনীতিকে পরোক্ষ সমর্থন হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। যদিও ভারত সরকার বলছে, এটি সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক ও কর্মসংস্থানভিত্তিক উদ্যোগ, যার সঙ্গে ভূরাজনৈতিক সমর্থনের সম্পর্ক নেই। তবুও এই পদক্ষেপ ভারতের পররাষ্ট্রনীতির নৈতিক দিক নিয়ে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।
তবে সরকারি অবস্থান স্পষ্ট—ভারত ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন—দুই পক্ষের সঙ্গেই আলাদাভাবে সম্পর্ক বজায় রাখছে এবং দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানকে সমর্থন করে। ২০১৮ সাল থেকে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে এই পৃথক কূটনৈতিক কাঠামো অনুসরণ করছে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের জন্য মানবিক ও উন্নয়ন সহায়তা অব্যাহত রয়েছে বলে সরকার দাবি করে। সাম্প্রতিক সময়ে আরব দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষায় ভারতের কূটনৈতিক তৎপরতাও দৃশ্যমান হয়েছে।
ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারতের সামনে এখন একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের খেলা চলছে। একদিকে উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা সহযোগিতার প্রয়োজন, অন্যদিকে পশ্চিম এশিয়ায় ঐতিহ্যগত বন্ধু আরব বিশ্ব ও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখা। এই জটিল সমীকরণ দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা ভারতের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
ভারতের সংবিধানের প্রস্তাবনায় সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ন্যায়বিচারের অঙ্গীকার রয়েছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, দেশের ভেতরে ও বাইরে নীতিনির্ধারণে এই নৈতিক ভিত্তিকে গুরুত্ব দেওয়া ভারতের দীর্ঘমেয়াদি বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য অপরিহার্য। গণতন্ত্রের বৃহৎ উদাহরণ এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের সম্ভাব্য নেতৃত্বদানকারী দেশ হিসেবে ভারতের প্রতিটি কূটনৈতিক পদক্ষেপ আন্তর্জাতিকভাবে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়।
সব মিলিয়ে ভারত-ইসরায়েল সম্পর্ক এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে কৌশলগত লাভ, নিরাপত্তা প্রয়োজন, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং নৈতিক দায়বদ্ধতা—সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হচ্ছে। সমর্থকেরা বলছেন, পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় বাস্তববাদী অংশীদারত্ব ছাড়া উপায় নেই। সমালোচকেরা মনে করছেন, নৈতিক অবস্থান দুর্বল হলে দীর্ঘমেয়াদে কূটনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে।
ভারতের সামনে তাই মূল প্রশ্ন একটাই—জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে সে কতটা সফলভাবে তার ঐতিহাসিক মূল্যবোধ ও নৈতিক অবস্থান অটুট রাখতে পারে। একটি উদীয়মান শক্তি হিসেবে ভারতের ভবিষ্যৎ প্রভাব অনেকটাই নির্ভর করবে এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষার দক্ষতার ওপর। কেবল কৌশলগত বা অর্থনৈতিক লাভ নয়, ন্যায়, মানবাধিকার ও সংবিধানসম্মত মূল্যবোধের আলোকে নীতিনির্ধারণই শেষ পর্যন্ত একটি শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য গণতন্ত্রের পরিচয় বহন করে।
আপনার মতামত জানানঃ