বাংলাদেশের অর্থনীতি যখন নানামুখী চাপের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, তখন নীতিনির্ধারকদের প্রতিটি বক্তব্য ও সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই জনমনে গভীর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। সাম্প্রতিক সময়ে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর পক্ষ থেকে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের উপায় হিসেবে কর বাড়ানোর যে বক্তব্য এসেছে, তা নিয়ে অর্থনৈতিক মহল, ব্যবসায়ী সমাজ এবং সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে বিস্তর আলোচনা শুরু হয়েছে। অর্থনীতি যখন ইতোমধ্যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের স্থবিরতা, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপের মুখে, তখন কর বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপ কতটা সময়োপযোগী—এই প্রশ্নটি এখন কেন্দ্রে চলে এসেছে।
অর্থনীতির পাঠ্যপুস্তকে কর বাড়ানোকে অনেক সময় রাজস্ব ঘাটতি মোকাবিলার একটি সরল ও কার্যকর উপায় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। সরকার যখন উন্নয়ন ব্যয় বাড়াতে চায় বা বাজেট ঘাটতি কমাতে চায়, তখন কর বৃদ্ধি একটি প্রচলিত হাতিয়ার। কিন্তু বাস্তব অর্থনীতি কখনোই কেবল তাত্ত্বিক সূত্রে চলে না। একটি দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো, জনগণের ক্রয়ক্ষমতা, ব্যবসায়িক পরিবেশ, প্রশাসনিক দক্ষতা—সবকিছু মিলিয়ে তবেই কোনো নীতির কার্যকারিতা নির্ধারিত হয়। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় কর বাড়ানোর প্রস্তাবটি তাই স্বাভাবিকভাবেই গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
এই মুহূর্তে দেশের সাধারণ মানুষ যে বাস্তবতার মধ্যে বাস করছে, সেটি বিবেচনা করা জরুরি। গত কয়েক বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ব্যয়, শিক্ষা ব্যয়—সবকিছুই মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। এমন অবস্থায় যদি পরোক্ষ কর, বিশেষ করে ভ্যাট বা ভোক্তা পর্যায়ের কর বাড়ানো হয়, তাহলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে পণ্যের দামের ওপর। ফলে মানুষের প্রকৃত আয় না বাড়লেও ব্যয় বেড়ে যাবে, যা ভোক্তা চাহিদাকে আরও সংকুচিত করতে পারে। ভোক্তা চাহিদা কমে গেলে উৎপাদন ও ব্যবসা খাতেও তার নেতিবাচক প্রতিফলন দেখা দেওয়া স্বাভাবিক।
মন্ত্রী যে যুক্তি দিয়েছেন—কর বাড়ানোর মাধ্যমে বিনিয়োগ বাড়ানো—সেটিও বাস্তবতার নিরিখে প্রশ্নের মুখে পড়ে। বিনিয়োগকারীরা সাধারণত এমন পরিবেশ খোঁজেন যেখানে নীতি স্থিতিশীল, কর কাঠামো পূর্বানুমেয়, প্রশাসনিক জটিলতা কম এবং অবকাঠামোগত সহায়তা নিশ্চিত। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে যে সমস্যাগুলো বিনিয়োগের পথে বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে আমলাতান্ত্রিক জট, প্রকল্প অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা, জ্বালানি ও বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং নীতিগত অস্থিরতা। এই মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধান ছাড়া শুধুমাত্র করের হার বাড়িয়ে বিনিয়োগ বাড়বে—এমন প্রত্যাশা অনেকের কাছে অতিরিক্ত আশাবাদী বলে মনে হতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাংলাদেশের কর কাঠামোর বাস্তব অবস্থা। দেশে কর-জিডিপি অনুপাত এখনও তুলনামূলকভাবে কম, কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে সম্ভাব্য করদাতাদের একটি বড় অংশ এখনো করজালের বাইরে রয়ে গেছে। অর্থাৎ সমস্যাটি কেবল করের হার কম হওয়া নয়; বরং কর সংগ্রহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, কর প্রশাসনের দক্ষতার ঘাটতি এবং কর ফাঁকির বিস্তৃতি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিদ্যমান। এই প্রেক্ষাপটে করের হার বাড়ানোর আগে করভিত্তি সম্প্রসারণ এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির দিকে জোর দেওয়া অধিক যৌক্তিক কি না—সেটি নিয়ে নীতিগত বিতর্ক থাকা স্বাভাবিক।
অর্থনীতির ইতিহাসে বহু উদাহরণ রয়েছে যেখানে অযথা করের চাপ বাড়ানো উল্টো ফল দিয়েছে। যখন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মনে করে করের বোঝা অতিরিক্ত হয়ে যাচ্ছে, তখন তারা বিনিয়োগ স্থগিত করতে পারে, উৎপাদন কমাতে পারে অথবা অনানুষ্ঠানিক খাতে সরে যেতে পারে। বাংলাদেশে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির আকার ইতোমধ্যে বড়। করের চাপ যদি হঠাৎ বেড়ে যায়, তাহলে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের একটি অংশ আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এতে সরকার প্রত্যাশিত রাজস্ব না-ও পেতে পারে।
এখানে একটি মনস্তাত্ত্বিক দিকও কাজ করে, যা প্রায়ই নীতিনির্ধারণে উপেক্ষিত থাকে। অর্থনীতিতে আস্থার গুরুত্ব অপরিসীম। ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী এবং ভোক্তা—সবার মধ্যে যদি ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তাহলে অর্থনৈতিক কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই ধীর হয়ে যায়। কর বাড়ানোর ঘোষণা যদি এমন সময়ে আসে যখন বাজারে আস্থার ঘাটতি রয়েছে, তাহলে সেটি ইতিবাচকের চেয়ে নেতিবাচক সংকেত হিসেবেও ব্যাখ্যা হতে পারে। বিশেষ করে যদি একই সঙ্গে কাঠামোগত সংস্কারের স্পষ্ট রোডম্যাপ না থাকে।
এ কথা অবশ্যই সত্য যে সরকারের রাজস্ব প্রয়োজন রয়েছে এবং উন্নয়ন ব্যয় চালিয়ে যেতে হলে আয় বাড়ানো জরুরি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান খাতে অগ্রাধিকার দেওয়ার যে কথা বলা হয়েছে, সেটি নীতিগতভাবে প্রশংসনীয় লক্ষ্য। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—লক্ষ্য অর্জনের পথ কতটা বাস্তবসম্মত ও ভারসাম্যপূর্ণ হচ্ছে। অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নে সময় নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি নীতি সঠিক হলেও ভুল সময়ে প্রয়োগ করলে তার ফল উল্টো হতে পারে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনেক অর্থনীতিবিদ দীর্ঘদিন ধরে করজাল সম্প্রসারণ, ডিজিটাল কর প্রশাসন, তথ্যভিত্তিক অডিট এবং স্বচ্ছতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়ে আসছেন। প্রযুক্তিনির্ভর কর ব্যবস্থাপনা চালু হলে কর ফাঁকি কমানো সম্ভব, একই সঙ্গে নতুন করদাতা যুক্ত করা যায়। এতে করের হার না বাড়িয়েও রাজস্ব বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়। পাশাপাশি ব্যবসা সহজীকরণ, লাইসেন্স প্রক্রিয়া সরলীকরণ এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা বিনিয়োগ বাড়াতে অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে—এমন মতও বহু বিশ্লেষকের।
ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাও এখানে একটি বড় প্রাসঙ্গিক বিষয়। খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, আর্থিক শৃঙ্খলার ঘাটতি এবং ঋণপ্রবাহের অসম বণ্টন বিনিয়োগ পরিবেশকে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবিত করছে। এই খাতে দৃশ্যমান সংস্কার ছাড়া বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রত্যাশা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। একইভাবে জ্বালানি নিরাপত্তা, অবকাঠামোগত নির্ভরযোগ্যতা এবং নীতি ধারাবাহিকতা বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখে।
অর্থনীতি পরিচালনা কখনোই একক কোনো সুইচ টিপে ঠিক করা যায় না। এটি একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের খেলা, যেখানে রাজস্ব সংগ্রহ, জনকল্যাণ, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হয়। কর বাড়ানোর প্রস্তাব সেই বৃহত্তর নীতিচিত্রের একটি অংশ মাত্র। যদি এটি সমন্বিত সংস্কার প্যাকেজের অংশ হিসেবে আসে, যেখানে কর প্রশাসন আধুনিকীকরণ, ব্যবসা সহজীকরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণ একসঙ্গে এগোয়, তাহলে এর কার্যকারিতা ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু যদি এটি বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যায়, তাহলে সংশয় তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
সবশেষে বলা যায়, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ এবং জরুরি। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে নীতিগত সূক্ষ্মতা, সময়োপযোগিতা এবং বাস্তবতার গভীর উপলব্ধি অপরিহার্য। কর বৃদ্ধি একটি সম্ভাব্য হাতিয়ার হলেও এটি কোনো জাদুকরী সমাধান নয়। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে করভিত্তি সম্প্রসারণ, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মতো পদক্ষেপগুলো সমানভাবে—বা অনেক ক্ষেত্রে আরও বেশি—গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হয়। অর্থনৈতিক নীতির সফলতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে কাগুজে যুক্তির ওপর নয়, বরং বাস্তব অর্থনীতির স্পন্দন কতটা সূক্ষ্মভাবে অনুধাবন করা হচ্ছে তার ওপর।
আপনার মতামত জানানঃ