‘নিরাপত্তা’—শব্দটি শুনলেই স্বস্তির অনুভূতি হওয়ার কথা। কিন্তু যখন সেই নিরাপত্তার নামে একজন প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীর চলাফেরা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ কিংবা জরুরি মুহূর্তে ব্যবস্থা নেওয়ার স্বাধীনতা সীমিত হয়ে যায়, তখন প্রশ্ন ওঠে—এটি কি সত্যিই নিরাপত্তা, নাকি নিয়ন্ত্রণ? সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের আবাসিক হলের বিভিন্ন বিধিনিষেধকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটি মূলত এই প্রশ্নকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ হিসেবে পরিচিত। এখান থেকেই বিভিন্ন সময় গণতান্ত্রিক আন্দোলন, সাংস্কৃতিক জাগরণ এবং সামাজিক পরিবর্তনের নেতৃত্ব এসেছে। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরা যখন হলের সময়সীমা, জরুরি প্রয়োজনে বাইরে যাওয়ার অনুমতি, দর্শনার্থী প্রবেশ, নন-রেসিডেনশিয়াল শিক্ষার্থীদের সুবিধা এবং অন্যান্য বিধিনিষেধ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন বিষয়টি কেবল প্রশাসনিক নিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি নাগরিক অধিকার, লিঙ্গসমতা এবং শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার জন্ম দেয়।
যেকোনো মানুষের জীবনে এমন পরিস্থিতি আসতে পারে, যখন কয়েক মিনিটের সিদ্ধান্ত জীবন বাঁচাতে পারে। গভীর রাতে অসুস্থ হয়ে পড়া, দুর্ঘটনার শিকার হওয়া কিংবা জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন—এসব ক্ষেত্রে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমালোচকদের অভিযোগ, যদি এমন পরিস্থিতিতেও একজন ছাত্রীকে প্রশাসনিক অনুমতির জন্য অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে সেটি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিবর্তে নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। জরুরি মুহূর্তে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার পরিবর্তে দ্রুত ও কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব।
একইভাবে পরিবারে মৃত্যু, গুরুতর অসুস্থতা বা অন্য কোনো জরুরি পারিবারিক পরিস্থিতিতে একজন শিক্ষার্থীর দ্রুত পরিবারের পাশে থাকা প্রয়োজন হতে পারে। এমন অবস্থাতেও যদি প্রশাসনিক অনুমতির জন্য অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে সেটি মানবিকতার প্রশ্ন তোলে। অনেকের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব শিক্ষার্থীর নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা, তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা সীমিত করা নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আবাসিক আসনের সংকট রয়েছে। ফলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী হলে আসন পান না এবং প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে ক্যাম্পাসে আসেন। এই শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, দিনের দীর্ঘ সময় ক্যাম্পাসে কাটালেও তাঁরা নিজেদের সংযুক্ত হলের সাধারণ সুবিধা ব্যবহার করতে পারেন না। বিশ্রাম, খাবার কিংবা কিছু সময় নিরাপদ পরিবেশে থাকার সুযোগ থেকেও তাঁরা বঞ্চিত হন। প্রশ্ন উঠছে—যখন আসনসংকট প্রশাসনিক বাস্তবতা, তখন তার দায় কেন শিক্ষার্থীদের ওপর বর্তাবে?
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর হলই হয়ে ওঠে অনেক শিক্ষার্থীর দ্বিতীয় বাড়ি। দূর-দূরান্ত থেকে আসা অভিভাবকেরা স্বাভাবিকভাবেই জানতে চান, তাঁদের সন্তান কী পরিবেশে থাকছে। সমালোচকদের মতে, পরিচয় যাচাই ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সীমিত সময়ের জন্য অভিভাবকদের প্রবেশের সুযোগ দেওয়া সম্ভব। আধুনিক অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমন ব্যবস্থাই অনুসরণ করা হয়। ফলে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে নিরাপত্তা ও মানবিকতার সমন্বিত সমাধানের দাবি উঠেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি সহশিক্ষার প্রতিষ্ঠান। একই শ্রেণিকক্ষে পড়াশোনা, একই ক্যাম্পাসে চলাফেরা এবং একই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের পরও নারী ও পুরুষ শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা বিধিনিষেধ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অনেকের মতে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রশাসনের; কিন্তু সেই নিরাপত্তার নামে যদি কেবল একটি নির্দিষ্ট লিঙ্গের ওপর অতিরিক্ত বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়, তাহলে সেটি সমতার নীতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—তা নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হলেও তাঁদের জন্য আবাসিক হলের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। ফলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী প্রতিদিন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ক্লাসে আসতে বাধ্য হন। দীর্ঘ যাতায়াত শুধু সময়ই নষ্ট করে না; এটি শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তিও বাড়ায়। গবেষণা বলছে, নিরাপদ ও স্থিতিশীল আবাসনের সুযোগ শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সাফল্য ও মানসিক সুস্থতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
বিশ্ববিদ্যালয় শুধু পাঠ্যপুস্তকের শিক্ষা দেয় না। বিতর্ক, নাটক, সংগীত, স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম, গবেষণা, সেমিনার ও সাংস্কৃতিক চর্চা—এসবও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে হলে ফিরতে বাধ্য হওয়ার কারণে অনেক ছাত্রী এসব কার্যক্রমে পুরোপুরি অংশ নিতে পারেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে তাঁদের নেতৃত্ব বিকাশ, সাংস্কৃতিক সম্পৃক্ততা এবং সামাজিক অংশগ্রহণ সীমিত হতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তবে প্রশ্ন হলো, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় কী? বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল প্রবেশ ও বের হওয়ার ব্যবস্থা, ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তাকর্মী ও জরুরি সাড়া প্রদান, জরুরি চিকিৎসা ও অ্যাম্বুলেন্স সেবা, পর্যাপ্ত সিসিটিভি ও আলোকসজ্জা, পরিচয় যাচাইয়ের মাধ্যমে দর্শনার্থী প্রবেশ, নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা এবং অভিযোগ গ্রহণ ও দ্রুত সমাধানের কার্যকর ব্যবস্থা—এসব উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতা সীমিত না করেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়ক হতে পারে।
বাংলাদেশের সমাজে নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাস্তব। কিন্তু সেই উদ্বেগের সমাধান কীভাবে করা হবে, সেটিই এখন আলোচনার বিষয়। সমাজবিজ্ঞানীরা প্রায়ই বলেন, নিরাপত্তার নামে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ অনেক সময় নারীদের সক্ষমতার পরিবর্তে তাঁদের ওপর নির্ভরশীলতার ধারণাকে শক্তিশালী করে। অন্যদিকে স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধ গড়ে তুললে শিক্ষার্থীরা আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন। বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি জায়গা, যেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু পেশাজীবনের জন্য নয়, স্বাধীন নাগরিক হিসেবেও প্রস্তুত হন।
বাংলাদেশের সংবিধানে নারী-পুরুষের সমান মর্যাদা ও সমান সুযোগের কথা বলা হয়েছে। সেই আলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালাও সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন বলে অনেকে মনে করেন। অবশ্য প্রশাসনের দৃষ্টিকোণও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। প্রশাসন প্রায়ই যুক্তি দেয় যে, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের প্রধান দায়িত্ব। তাই যেকোনো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, বাস্তবতা এবং শিক্ষার্থীদের অধিকার—এই তিনটির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত হল ত্যাগের সুযোগ, রাতের প্রবেশ ও বের হওয়ার নিয়মে মানবিকতা, নন-রেসিডেনশিয়াল শিক্ষার্থীদের সাধারণ সুবিধা ব্যবহার, দর্শনার্থীদের জন্য সহজ ও নিরাপদ ব্যবস্থা, নারী ও পুরুষ শিক্ষার্থীদের জন্য বৈষম্যহীন নীতিমালা এবং আধুনিক নিরাপত্তা অবকাঠামো গড়ে তোলার দাবি তুলেছেন। তাঁদের বক্তব্য, এটি কোনো বিশেষ সুবিধার দাবি নয়; বরং সমান সুযোগ ও মর্যাদার দাবি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা স্থির নয়; সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী সেগুলো পরিবর্তিত হতে পারে। প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সামাজিক বাস্তবতা বদলেছে। ফলে কয়েক দশক আগে প্রণীত কোনো নিয়ম আজও একইভাবে কার্যকর থাকবে—এমন ধারণা নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে একটি যৌক্তিক, তথ্যভিত্তিক ও মানবিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান বের করা সম্ভব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের আবাসিক হলের নিয়ম নিয়ে চলমান বিতর্ক শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ইস্যু নয়; এটি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা, লিঙ্গসমতা এবং শিক্ষার্থীদের নাগরিক অধিকার নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার অংশ। নিরাপত্তা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। তবে সেই নিরাপত্তা যেন শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতা, মর্যাদা এবং ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারকে অযথা সীমিত না করে। আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে শিক্ষার্থীরা নিরাপদও থাকবেন, আবার স্বাধীনভাবেও নিজেদের বিকশিত করতে পারবেন।
এই বিতর্কের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো—বিষয়টি এখন জনপরিসরে আলোচিত হচ্ছে। আলোচনার মধ্য দিয়েই নীতিমালা আরও কার্যকর, মানবিক এবং সময়োপযোগী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত শক্তি কেবল তার ইতিহাসে নয়, বরং পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতার মধ্যেই নিহিত।
আপনার মতামত জানানঃ