বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত দুই সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ৪০টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তুলেছে। এসব হত্যাকাণ্ডের মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, ব্যক্তিগত শত্রুতা, জমিজমা নিয়ে বিরোধ, প্রেমঘটিত সমস্যা, সন্ত্রাসী হামলা এবং বিভিন্ন সামাজিক দ্বন্দ্ব জড়িয়ে আছে। নিহতদের মধ্যে নারীও রয়েছেন, আবার রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও আছেন। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, খুলনা ও চট্টগ্রাম বিভাগে হত্যার ঘটনা বেশি ঘটেছে, আর তুলনামূলকভাবে কম ঘটেছে বরিশাল ও রংপুর বিভাগে।
সম্প্রতি নরসিংদীর রায়পুরায় ঘটে যাওয়া একটি হত্যাকাণ্ড স্থানীয় মানুষকে নাড়া দিয়েছে। বাঁশগাড়ীর সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য আমির হোসেন নৌকায় করে পাশের গ্রামে যাচ্ছিলেন। পথে একদল দুর্বৃত্ত আরেকটি নৌকায় করে এসে তাকে তুলে নেয়। পরে তাকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। একই দিনে দেশের আরও কয়েকটি জেলায় পৃথক ঘটনায় পাঁচজন নিহত হন। নরসিংদীর মাধবদীতে আমেনা আক্তার নামে এক কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের অভিযোগ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর তাকে হত্যা করা হয়েছে। এসব ঘটনা শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির ইঙ্গিতই দেয় না, বরং সমাজে সহিংসতার প্রবণতা কতটা বেড়েছে তাও তুলে ধরে।
পুলিশের অপরাধ সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত ১৫ দিনে নিহতদের মধ্যে আটজন নারী। অনেক ক্ষেত্রে হত্যাকাণ্ডের কারণ স্পষ্ট নয়। কেউ ছুরিকাঘাতে, কেউ গুলিতে, আবার কেউ গণপিটুনি, শ্বাসরোধ বা সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন। কয়েকটি ঘটনায় অজ্ঞাত দুর্বৃত্তদের সম্পৃক্ততার কথা জানা গেছে। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার ঘটনাও রয়েছে। নিহতদের মধ্যে বিএনপির তিনজন কর্মী, যুবদলের একজন নেতা, ছাত্রদলের একজন কর্মী এবং জামায়াত সমর্থক একজন রয়েছেন। এসব তথ্য দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক সহিংসতার জটিল বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে আসে।
খুলনা বিভাগে হত্যার ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের শুরু পর্যন্ত সেখানে অন্তত ১১ জন নিহত হয়েছেন। আধিপত্য বিস্তার, পূর্বশত্রুতা এবং রাজনৈতিক বিরোধের কারণে এসব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে জানা গেছে। খুলনার দিঘলিয়া উপজেলায় যুবদল নেতা মো. মুরাদ খাঁকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং তদন্ত চলছে। একই সময়ে খুলনা নগরে শেখ সোহেল নামে এক ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তিনি মাছের ঘের এবং ইন্টারনেট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার হত্যাকাণ্ড স্থানীয় ব্যবসায়ী সমাজেও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
চট্টগ্রাম বিভাগেও সহিংসতার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। গত দুই সপ্তাহে সেখানে অন্তত আটটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এসব ঘটনার পেছনে অনলাইন জুয়া, জমিজমা নিয়ে বিরোধ, ডাকাতি, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং রাজনৈতিক বিরোধের মতো বিভিন্ন কারণ রয়েছে। রাউজানে যুবদল কর্মী আবদুল মজিদকে গুলি করে হত্যা করা হয়। বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে মুখোশধারী একদল সশস্ত্র ব্যক্তি মোটরসাইকেলে এসে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। স্থানীয়রা বলছেন, এলাকায় রাজনৈতিক উত্তেজনা অনেক দিন ধরেই রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে রাউজান এলাকায় একাধিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি তৈরি হয়েছে।
ঢাকা বিভাগেও হত্যার ঘটনা কম নয়। রাজধানীসহ আশপাশের এলাকায় অন্তত নয়জন নিহত হয়েছেন বিভিন্ন ঘটনায়। প্রেমঘটিত বিরোধ, মাদক ব্যবসা, জমি নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং সন্ত্রাসী হামলা এসব ঘটনার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। রাজধানীর হাজারীবাগে অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রীকে হত্যা করা হয় প্রেমঘটিত বিরোধের জেরে। তদন্তে জানা গেছে, তাদের মধ্যে আগে সম্পর্ক ছিল, পরে সন্দেহ ও দ্বন্দ্ব তৈরি হলে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। এ ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এই ঘটনা তরুণদের মধ্যে সম্পর্কজনিত সহিংসতার ঝুঁকিও সামনে নিয়ে আসে।
রাজধানীতেই আরও একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে, যেখানে ছয় বছরের এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয় হাতিরঝিল এলাকার কাছ থেকে। এই ঘটনার পর স্থানীয় মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং থানার সামনে প্রতিবাদ করেন। আরেকটি ঘটনায় ওবায়দুল্লাহ নামে এক যুবককে হত্যা করে তার দেহ কয়েক টুকরো করা হয়। পরে বিভিন্ন এলাকা থেকে দেহের অংশ উদ্ধার করা হয়। এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড মানুষের মনে আতঙ্ক বাড়িয়ে দিয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
রাজশাহী বিভাগেও হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা কম নয়। সেখানে ছয়জন নিহত হয়েছেন বিভিন্ন ঘটনায়। রাজনৈতিক সংঘর্ষ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং অজ্ঞাত কারণে কয়েকটি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। একটি ঘটনায় ওয়াজ মাহফিলে অতিথি নির্ধারণকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের জেরে একজন নিহত হন। আরেকটি ঘটনায় চাচাতো ভাইয়ের হাতে একজন নিহত হন, যা পারিবারিক সম্পর্কের অবনতির একটি দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রংপুর বিভাগে চারটি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে একজন নিহত হয়েছেন। আবার গণপিটুনিতে দুইজন নিহত হয়েছেন। গণপিটুনির মতো ঘটনা সামাজিক বিচারব্যবস্থার বাইরে গিয়ে মানুষের আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা কতটা বেড়েছে তা দেখায়। এসব ঘটনা সামাজিক শৃঙ্খলার জন্যও হুমকি হয়ে উঠছে।
বরিশাল বিভাগে তুলনামূলকভাবে কম হত্যাকাণ্ড ঘটলেও ঘটনাগুলো সমানভাবে উদ্বেগজনক। পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয় এবং মারধরের ঘটনায় ইদ্রিস খান নামে একজন নিহত হন। এই ঘটনা দেখায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিরোধও কখনো কখনো ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা বেড়েছে, যার প্রভাব অপরাধের হারেও পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় বিরোধ বা ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব দ্রুত সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। আবার কোথাও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাও সহিংসতার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আরও সক্রিয় ভূমিকা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা গেলে অপরাধের প্রবণতা কিছুটা কমানো সম্ভব।
একই সঙ্গে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরে সহিংসতা প্রতিরোধে উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে সহিংসতা ও অপরাধপ্রবণতা কমাতে সচেতনতা কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে ভুল তথ্য বা উত্তেজনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যা কখনো কখনো সহিংস পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক দুই সপ্তাহের হত্যাকাণ্ডের পরিসংখ্যান বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিভিন্ন বিভাগে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনা শুধু সংখ্যা নয়, প্রতিটি ঘটনার পেছনে রয়েছে মানুষের জীবন, পরিবার এবং সামাজিক বাস্তবতার গল্প। তাই অপরাধ দমন, বিচার নিশ্চিত করা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
আপনার মতামত জানানঃ