বাজেট একটি দেশের অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল। প্রতি বছর বাজেট ঘোষণার সময় সরকার উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং জনগণের জীবনমান উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি দেয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপনের পরও একই ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তবে প্রশ্ন হলো, বাজেটের আকার যত বড় হচ্ছে, সাধারণ মানুষের জীবনে তার বাস্তব সুফল কতটা পৌঁছাচ্ছে?
বাংলাদেশের মতো জনবহুল এবং সীমিত সম্পদের দেশে বাজেট প্রণয়ন সব সময়ই একটি কঠিন কাজ। কারণ সরকারকে একসঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, অবকাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক ব্যয়—সব খাতের প্রয়োজন বিবেচনায় নিতে হয়। ফলে বাজেটে উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা দেখা দেয়।
এবারের বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ থেকে সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু শুধু ঘোষণা দিলেই মূল্যস্ফীতি কমে না। মূল্যস্ফীতির পেছনে থাকা মূল কারণগুলো সমাধান করতে হয়। বাজারে যখন পণ্যের সরবরাহ কম থাকে এবং মানুষের হাতে অর্থের পরিমাণ বেড়ে যায়, তখন দ্রব্যমূল্য স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশে খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর অনেক ক্ষেত্রেই আমদানিনির্ভরতা রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাবও দেশের মূল্যস্ফীতিতে প্রতিফলিত হয়।
মূল্যস্ফীতির হিসাব করতে গিয়ে সাধারণত খাদ্যপণ্যের দামকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় চাপ সৃষ্টি করছে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবহন এবং আবাসন খাতের ব্যয়। একটি পরিবারে কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে চিকিৎসা ব্যয় সামাল দিতে অনেক সময় জমিজমা বিক্রি পর্যন্ত করতে হয়। শিক্ষা ব্যয়, বাড়িভাড়া এবং নিত্যব্যবহার্য গৃহস্থালি পণ্যের দামও দ্রুত বাড়ছে। ফলে প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক সময় সরকারি মূল্যস্ফীতির হিসাবের চেয়েও বেশি অনুভূত হয়।
বাজেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঘাটতি অর্থায়ন। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই বাজেট ঘাটতি পূরণে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু প্রায়ই দেখা যায়, প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায় হয় না এবং বৈদেশিক ঋণ বা অনুদানও পরিকল্পনা অনুযায়ী পাওয়া যায় না। ফলে অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে সংশোধিত বাজেট করতে হয়। এ অবস্থায় উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে কাটছাঁট করা হয় এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যাহত হয়।
রাজস্ব আহরণ বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা। করদাতার সংখ্যা সীমিত এবং কর আদায়ের পদ্ধতিও এখনো পুরোপুরি আধুনিক হয়নি। প্রতি বছর কর আদায়ের লক্ষ্য বাড়ানো হলেও বাস্তব অর্জন তুলনামূলক কম থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, করব্যবস্থাকে ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করা গেলে রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে কর ফাঁকি ও দুর্নীতিও কমবে।
স্থানীয় সরকার খাতেও দীর্ঘদিন ধরে অপচয় এবং অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অনেক সময় এমন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়, যার প্রয়োজনীয়তা প্রশ্নবিদ্ধ। কোথাও অপ্রয়োজনীয় রাস্তা, কোথাও ব্যবহারহীন কালভার্ট বা নিম্নমানের নির্মাণকাজের অভিযোগ পাওয়া যায়। রাজনৈতিক প্রভাব, ঠিকাদারি স্বার্থ এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে এসব প্রকল্প জনগণের প্রত্যাশিত সুফল দিতে ব্যর্থ হয়। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও জনগণের জীবনমানের উন্নতি সীমিত থেকে যায়।
বাজেটে পরিচালন ব্যয় কমানোর কথাও বলা হয়েছে। পরিচালন ব্যয়ের মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা, বিদেশ সফর, প্রশাসনিক ব্যয় এবং বিভিন্ন আনুষঙ্গিক খরচ অন্তর্ভুক্ত থাকে। সমালোচকদের মতে, এই খাতে অনেক অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হয়, যা কমানো গেলে উন্নয়ন খাতে আরও বেশি অর্থ বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব। তবে বাস্তবে এ ধরনের ব্যয় কমাতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কঠোর সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
ইতিবাচক দিক হলো, এবারের বাজেটে সামাজিক অবকাঠামো খাতে তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ বাড়লে দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদের উন্নয়ন ঘটে। উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, মানসম্মত শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে এর সুফল সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছেও পৌঁছাতে পারে। তবে এই খাতে বরাদ্দকৃত অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা না গেলে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।
বাজেটের সফলতা কেবল বরাদ্দের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা যায় না। গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই অর্থ কতটা কার্যকরভাবে ব্যয় করা হচ্ছে এবং তার ফল জনগণ পাচ্ছে কি না। বাংলাদেশের বাস্তবতায় প্রায়ই দেখা যায়, বাজেটের আকার বাড়লেও সেবার মান একই থাকে। গণপরিবহন, সরকারি হাসপাতাল এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়ন এখনো মানুষের বড় প্রত্যাশা। কিন্তু সাধারণ নাগরিকদের মতো নীতিনির্ধারকেরা এসব সেবা ব্যবহার না করায় সমস্যাগুলো অনেক সময় অগ্রাধিকার পায় না।
একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য জনগণের কর দেওয়ার আগ্রহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মানুষ তখনই কর দিতে উৎসাহিত হয়, যখন তারা দেখে তাদের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে। যদি করের অর্থ অপচয় হয়, দুর্নীতিতে নষ্ট হয় অথবা জনগণের কল্যাণে কাজে না লাগে, তাহলে কর প্রদানের আগ্রহ কমে যায়। ফলে রাজস্ব আদায়ও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বৃদ্ধি পায় না।
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও কার্যকর ও টেকসই করতে হলে অপচয় কমানো, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, করব্যবস্থার সংস্কার এবং উন্নয়ন প্রকল্পের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং গণপরিবহন খাতে বাস্তব উন্নয়ন ঘটাতে হবে। কারণ বাজেটের প্রকৃত সাফল্য তখনই আসবে, যখন তার সুফল সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনে প্রতিফলিত হবে।
সবশেষে বলা যায়, বাজেটের আকার বৃদ্ধি অবশ্যই একটি ইতিবাচক দিক। কিন্তু শুধু বড় অঙ্কের বাজেটই উন্নয়নের নিশ্চয়তা নয়। প্রয়োজন দক্ষ ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা এবং জনগণের কল্যাণকে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন। অন্যথায় বাজেটের সংখ্যা বাড়লেও মানুষের জীবনযাত্রার মানে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। তাই বাজেট কত বড় হলো, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো—সাধারণ মানুষ এর কতটা সুবিধা পেল।
আপনার মতামত জানানঃ