সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। প্রতি বছর এখানকার কৃষকেরা বোরো ধান চাষ করে দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তন, অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামোগত উন্নয়নের কারণে হাওরাঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থা নতুন সংকটের মুখে পড়েছে। এবারের পরিস্থিতি সেই সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এবার বড় ধরনের পাহাড়ি ঢল কিংবা বাঁধভাঙার ঘটনা না ঘটলেও হাজার হাজার একর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—হাওর রক্ষার জন্য নির্মিত বাঁধগুলো কি সত্যিই কার্যকর, নাকি উল্টো সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে?
দীর্ঘদিন ধরে হাওরে ফসল রক্ষার প্রধান উপায় হিসেবে মাটির বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রতি বছর শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন বাঁধ নির্মাণ ও পুরোনো বাঁধ সংস্কার করা হয়। ২০২৬ সালে সুনামগঞ্জ জেলায় ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭১০টি প্রকল্পের আওতায় ৬০২ কিলোমিটার ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়েছে। কিন্তু এত বিপুল ব্যয়ের পরও কৃষকেরা ফসল রক্ষা করতে পারেননি। কারণ এবার সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়। পানি প্রবেশের চেয়ে পানি বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়াই বড় সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাওরের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নানা কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নদী-নালা ভরাট হয়ে যাওয়া, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, রাস্তা ও স্থাপনা তৈরি এবং দীর্ঘদিন খনন না হওয়ার কারণে পানি দ্রুত নিষ্কাশন হতে পারছে না। ফলে অতিবৃষ্টি হলেই হাওরে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। একসময় যে পানি দ্রুত নদীপথে নেমে যেত, এখন সেই পানি দীর্ঘদিন আটকে থাকছে এবং ফসল ডুবিয়ে দিচ্ছে।
স্থানীয় প্রবীণ কৃষকদের অভিজ্ঞতাও একই কথা বলে। তাঁদের মতে, কয়েক দশক আগেও এত বাঁধের প্রয়োজন হতো না। নদীগুলো গভীর ছিল এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহ অব্যাহত থাকত। কোথাও সাময়িক সমস্যা দেখা দিলে স্থানীয় কৃষকেরা নিজেরাই ছোটখাটো বাঁধ নির্মাণ করে সমাধান করতেন। কিন্তু বর্তমানে প্রায় সর্বত্র মাটির বাঁধ তৈরি হওয়ায় পানি আটকে যাচ্ছে এবং হাওরের স্বাভাবিক চরিত্র পরিবর্তিত হচ্ছে।
জোয়ালভাঙ্গা ও দেখার হাওরের অভিজ্ঞতা এ সমস্যার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। এসব এলাকায় কৃষকেরা পানি নিষ্কাশনের জন্য নিজ উদ্যোগে বাঁধ কেটে দিয়েছেন। কারণ তাঁদের মতে, বাঁধ অক্ষত থাকলেও জমির পানি বের হওয়ার সুযোগ ছিল না। ফলে প্রশাসন ও কৃষকদের মধ্যে মতবিরোধও দেখা দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই দেরি হয়ে গেছে এবং ফসল রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
হাওর গবেষক ও পরিবেশকর্মীরা বলছেন, সমস্যা শুধু বাঁধের নয়; বরং পুরো হাওর ব্যবস্থাপনার। বছরের পর বছর উজান থেকে নেমে আসা পলি নদী ও হাওরের তলদেশ ভরাট করে ফেলছে। অন্যদিকে প্রতিবছর নির্মিত মাটির বাঁধ বর্ষাকালে ভেঙে গিয়ে সেই মাটিও আবার হাওরে জমা হচ্ছে। ফলে পানিধারণ ক্ষমতা কমছে এবং জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়ছে।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের কর্মীরা হিসাব করে দেখিয়েছেন যে গত কয়েক বছরে হাজার হাজার কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। তাঁদের মতে, এই ব্যয়ের বড় অংশই দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের বদলে সাময়িক ব্যবস্থার পেছনে চলে যাচ্ছে। ফলে প্রতি বছর একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। অনেকের অভিযোগ, বাঁধ নির্মাণ এখন এক ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রকৃত প্রয়োজনের চেয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের দিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, হাওরের সংকট মোকাবিলায় শুধু বাঁধ নির্মাণ যথেষ্ট নয়। পানি নিষ্কাশনের জন্য কার্যকর স্লুইসগেট, রাবার ড্যাম এবং অন্যান্য আধুনিক অবকাঠামো প্রয়োজন। পাশাপাশি নদী ও খাল নিয়মিত খনন করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। যেসব স্থানে পলি জমে নাব্যতা কমে গেছে, সেগুলো পুনরুদ্ধার করা জরুরি।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা বিভাগের বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের ধরণ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত এখন স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে উঠছে। ফলে পুরোনো পরিকল্পনা ও কাঠামো দিয়ে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা কঠিন হবে। হাওর ব্যবস্থাপনায় নতুন চিন্তা ও আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করতে হবে।
এক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণের অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ হাওরের কৃষকেরাই সবচেয়ে ভালো জানেন কোথায় পানি জমে, কোথায় নিষ্কাশনের পথ বন্ধ এবং কোন স্থানে অবকাঠামো প্রয়োজন। প্রকল্প গ্রহণের আগে স্থানীয় জনগণ, বিশেষজ্ঞ এবং প্রশাসনের সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করলে অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব।
হাওর শুধু কৃষির উৎস নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক অঞ্চল। এখানে মাছ, জলজ প্রাণী, পাখি এবং জীববৈচিত্র্যের বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে। ফলে হাওর রক্ষার পরিকল্পনা করতে গিয়ে শুধু ধানের কথা ভাবলেই চলবে না। পরিবেশ, মৎস্যসম্পদ এবং জলপ্রবাহের স্বাভাবিক ভারসাম্যও বিবেচনায় নিতে হবে।
বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে প্রতিবছর শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে মাটির বাঁধ নির্মাণ কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। বরং প্রয়োজন সমন্বিত হাওর ব্যবস্থাপনা, নদী ও খাল পুনরুদ্ধার, পানি নিষ্কাশনের আধুনিক ব্যবস্থা এবং প্রকৃতিবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ। তা না হলে কৃষকেরা প্রতিবছর নতুন কোনো সংকটের মুখোমুখি হবেন, আর হাওরাঞ্চলের খাদ্য উৎপাদনও ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।
সুনামগঞ্জের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা তাই শুধু একটি জেলার সমস্যা নয়; এটি দেশের হাওর ব্যবস্থাপনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। এখনই পরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতা, ফসলহানি এবং পরিবেশগত সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। হাওরকে বাঁচাতে হলে শুধু বাঁধ নয়, পানির স্বাভাবিক চলাচলের পথও বাঁচাতে হবে।
আপনার মতামত জানানঃ