
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জোট, বিরোধ, সমঝোতা ও সংঘাত—এই চারটি শব্দ বহু বছর ধরেই একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শিক পার্থক্য যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ক্ষমতার সমীকরণ, মাঠের বাস্তবতা এবং সময়ের প্রয়োজন। সেই বাস্তবতায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্ক বরাবরই একটি আলোচিত অধ্যায়। কখনও কৌশলগত মিত্র, কখনও দূরত্বে থাকা অংশীদার, আবার কখনও নীরব প্রতিদ্বন্দ্বী—এই সম্পর্কের উত্থান-পতন দেশের রাজনৈতিক গতিপথকে বহুবার প্রভাবিত করেছে। সম্প্রতি এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু যে মন্তব্য করেছেন, সেটি শুধু একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; বরং দেশের চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে একটি সতর্ক সংকেত হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত এবি পার্টির সংগঠক সমাবেশে তিনি বলেন, বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে দূরত্ব যদি সংঘাতে রূপ নেয়, তাহলে তার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সুবিধাভোগী হবে আওয়ামী লীগ। এই বক্তব্যের ভেতরে বাংলাদেশের গত তিন দশকের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার প্রতিফলন রয়েছে। কারণ, বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরোধী শক্তিগুলোর বিভক্তি প্রায়ই ক্ষমতাসীন শক্তিকে আরও শক্তিশালী করেছে। ইতিহাস বলছে, বিরোধী শিবির যত বেশি খণ্ডিত হয়েছে, ক্ষমতার কেন্দ্র তত বেশি স্থিতিশীল হয়েছে।
১৯৯১ সালের নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ছিল। দীর্ঘ স্বৈরশাসনের পর সেই নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করে জামায়াতের সমর্থনে। তখনকার রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই সমর্থন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু রাজনৈতিক জোট সবসময় আদর্শের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; অনেক সময় পরিস্থিতি ও প্রয়োজনই তাকে নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রসংগঠনগুলোর আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে যে সংঘর্ষ তৈরি হয়েছিল, তা দুই দলের সম্পর্কের ভেতরে গভীর অবিশ্বাসের জন্ম দেয়। একসময় এই বৈরিতা রাজপথ থেকে ক্যাম্পাস পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ছাত্রসংগঠনগুলো শুধু সাংগঠনিক শক্তির প্রতীক নয়, বরং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্রও। ফলে ছাত্র রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ অনেক সময় মূল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার সম্পর্কেও প্রভাব ফেলে। বিএনপি ও জামায়াতের ক্ষেত্রেও সেটি হয়েছিল। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে দুই দলের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত বৃহত্তর বিরোধী রাজনীতিকে দুর্বল করেছিল। সেই সুযোগে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে।
তবে বাংলাদেশের রাজনীতি কখনও স্থির থাকে না। রাজনৈতিক স্বার্থ, আন্দোলনের প্রয়োজন এবং ক্ষমতার বাস্তবতা আবারও বিএনপি ও জামায়াতকে কাছাকাছি নিয়ে আসে। ২০০১ সালের নির্বাচনে তারা জোটবদ্ধ হয়ে অংশ নেয় এবং বিপুল বিজয় অর্জন করে। এরপর দীর্ঘ সময় দুই দল একে অপরের রাজনৈতিক সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে। শুধু নির্বাচনে নয়, সরকারবিরোধী আন্দোলনেও তারা একসঙ্গে ছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই সম্পর্কেও ফাটল দেখা দিতে শুরু করে।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্ক আবারও আলোচনায় এসেছে। একদিকে রাজনৈতিক মাঠে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করার চেষ্টা, অন্যদিকে নতুন রাজনৈতিক শক্তির আবির্ভাব—সব মিলিয়ে বিরোধী রাজনীতির ভেতরে একটি পুনর্বিন্যাসের প্রক্রিয়া চলছে। এই পরিস্থিতিতে দুই দলের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে কি না, সেটি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা রয়েছে। মজিবুর রহমান মঞ্জুর বক্তব্য সেই আলোচনাকেই নতুন মাত্রা দিয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার কারণে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে প্রায়ই একটি অভিন্ন লক্ষ্য কাজ করেছে—ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করা। কিন্তু যখন বিরোধী দলগুলো নিজেদের মধ্যেই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, তখন সেই লক্ষ্য দুর্বল হয়ে যায়। রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন উদাহরণ শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের বহু দেশেই রয়েছে। বিরোধী শক্তির বিভক্তি সাধারণত ক্ষমতাসীনদের জন্য সুবিধাজনক পরিস্থিতি তৈরি করে।
মঞ্জু শুধু বিএনপি-জামায়াত সম্পর্ক নিয়েই কথা বলেননি; তিনি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উত্তপ্ত হয়ে উঠছে এবং রাজনৈতিক সংঘাত ক্রমেই বাড়ছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই জাতীয় রাজনীতির প্রতিফলন হয়ে ওঠে। ক্যাম্পাসে সংঘাত মানে শুধু ছাত্রদের মধ্যে বিরোধ নয়; এর পেছনে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রভাবও কাজ করে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়লে তার দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রভাব পড়ে। শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হয়, তরুণদের মধ্যে সহিংস সংস্কৃতি তৈরি হয় এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা কমে যায়। মঞ্জুর বক্তব্যে সেই উদ্বেগই উঠে এসেছে। তিনি মনে করছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও পারস্পরিক সংঘাত যদি বাড়তে থাকে, তাহলে সেটি দেশের সার্বিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তার বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল পুলিশ ও বিচারব্যবস্থা নিয়ে মন্তব্য। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, পুলিশকে দলীয় বাহিনী হিসেবে ব্যবহারের পুরোনো প্রবণতা আবার ফিরে আসতে পারে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। প্রায় সব রাজনৈতিক দলই বিরোধী অবস্থানে থাকাকালে প্রশাসনের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেছে। ফলে পুলিশ সংস্কার ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থার প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে।
মঞ্জু বলেছেন, পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠন এবং দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে সরকারের পশ্চাদপসরণ ভবিষ্যতে আরও জটিল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। এই বক্তব্য মূলত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ও স্বাধীনতা নিয়ে জনমনে থাকা উদ্বেগের প্রতিফলন। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শক্তিশালী ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম শর্ত হিসেবে দেখা হয়। যখন মানুষ মনে করে প্রতিষ্ঠানগুলো নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে না, তখন রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও বেড়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বর্তমানে একটি বড় প্রশ্ন হলো—বিরোধী রাজনীতির ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাচ্ছে। একদিকে পুরোনো জোট রাজনীতির বাস্তবতা, অন্যদিকে নতুন রাজনৈতিক দলগুলোর উত্থান—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে পাওয়া সহজ নয়। এবি পার্টির মতো দলগুলো নিজেদের বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে। তারা একদিকে পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির সমালোচনা করছে, অন্যদিকে নতুন ধরনের রাজনৈতিক ভাষ্য তৈরির চেষ্টা করছে। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় বড় দলগুলোর প্রভাব এতটাই শক্তিশালী যে, নতুন দলগুলোর জন্য জায়গা তৈরি করা সহজ নয়।
তবু রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জনঅসন্তোষের সময় নতুন রাজনৈতিক শক্তির আবির্ভাবের সুযোগ তৈরি হয়। এবি পার্টি সেই সুযোগকে কাজে লাগাতে চাইছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। মঞ্জুর বক্তব্যেও সেই কৌশলের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তিনি সরাসরি কোনো পক্ষ না নিয়ে বরং বিরোধী রাজনীতির ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। একইসঙ্গে তিনি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারের প্রশ্নও সামনে এনেছেন।
রাজনীতিতে সংঘাত নতুন কিছু নয়। কিন্তু সেই সংঘাত যখন দীর্ঘমেয়াদি বৈরিতায় রূপ নেয়, তখন তার প্রভাব শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; পুরো সমাজ তার প্রভাব অনুভব করে। অর্থনীতি, শিক্ষা, বিনিয়োগ, সামাজিক স্থিতিশীলতা—সবকিছুই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে জড়িত। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব শুধু নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি নয়, বরং এমন পরিবেশ তৈরি করা যেখানে মতপার্থক্য থাকলেও সহিংসতা ও প্রতিহিংসা জায়গা না পায়।
বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে বিরোধী শক্তিগুলো নিজেদের সম্পর্ক কীভাবে পরিচালনা করে তার ওপর। যদি তারা পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সংঘাতের পথ বেছে নেয়, তাহলে রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও বাড়বে। আর যদি তারা কৌশলগত সমঝোতা ও সহনশীলতার পথে হাঁটে, তাহলে রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা সহজ হতে পারে। মজিবুর রহমান মঞ্জুর বক্তব্য মূলত সেই বাস্তবতার প্রতিফলন—যেখানে বিরোধী রাজনীতির বিভক্তি শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন শক্তিকেই আরও শক্তিশালী করে তোলে।
বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই একটি সহনশীল, স্থিতিশীল ও অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেখতে চায়। কিন্তু বাস্তবে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা প্রায়ই সংঘাতমুখী হয়ে ওঠে। ফলে প্রতিটি রাজনৈতিক বক্তব্য, প্রতিটি জোট ও প্রতিটি দূরত্ব নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্ক নিয়ে মঞ্জুর মন্তব্যও সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক আলোচনারই অংশ, যা আগামী দিনের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ