ইন্টারনেটে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও নতুন করে প্রযুক্তি ও সামরিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, মানুষের মতো দেখতে হিউম্যানয়েড রোবট হাতে অ্যাসল্ট রাইফেল নিয়ে চলাফেরা করছে। দাবি করা হয়, চীন নাকি যুদ্ধের জন্য রোবট সৈন্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেছে। এমন দৃশ্য স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল ও উদ্বেগ—দুটোই তৈরি করে। কিন্তু প্রযুক্তির যুগে ভাইরাল মানেই সত্য—এ ধারণা এখন আর নিরাপদ নয়। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে, আলোচিত ভিডিওটি সম্ভবত কৃত্রিমভাবে তৈরি বা বিভ্রান্তিকর।
প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, ততই বাস্তব আর কৃত্রিমের সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। এআই-জেনারেটেড ভিডিও, ডিপফেক এবং ভিজ্যুয়াল ম্যানিপুলেশন এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সাধারণ দর্শকের পক্ষে সত্যতা যাচাই করা কঠিন। ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিওটিও ঠিক এই ধোঁয়াশার সুযোগ নিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এখন পর্যন্ত চীনের সামরিক বাহিনী মানুষের মতো হিউম্যানয়েড রোবটকে লাইভ ফায়ার পরীক্ষায় ব্যবহার করেছে—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তবে এটাও সত্য যে চীন রোবোটিকস, বিশেষ করে হিউম্যানয়েড প্রযুক্তিতে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই শিল্প রোবট ব্যবহারে বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। উৎপাদন খাতে স্বয়ংক্রিয়তা বাড়ানো, শ্রম ব্যয় কমানো এবং জনসংখ্যাগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য বেইজিং ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। ফলে হিউম্যানয়েড রোবট নিয়ে চীনের আগ্রহকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই, যদিও তা সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের পর্যায়ে পৌঁছেছে—এমন দাবি এখনও প্রমাণিত নয়।
রোবট প্রযুক্তির সামরিক ব্যবহার নতুন কোনো ধারণা নয়। বহু বছর ধরেই বিভিন্ন দেশ ড্রোন, স্বয়ংক্রিয় যান, রোবোটিক বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিট এবং চার পায়ের রোবট ব্যবহার করে আসছে। বিশেষ করে নজরদারি, লজিস্টিক সাপোর্ট এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অভিযান পরিচালনায় রোবট ইতিমধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু মানুষের মতো দেখতে, স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া সক্ষম “রোবট সৈন্য”—এই ধারণা এখনও প্রযুক্তিগত ও নৈতিক উভয় দিক থেকেই বিতর্কিত।
চীনের বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হিউম্যানয়েড রোবট উন্নয়নে সক্রিয়। টেলিভিশন অনুষ্ঠানে রোবটদের মার্শাল আর্ট প্রদর্শন, নাচ, বা দৈনন্দিন কাজ করার ভিডিও ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে নজর কেড়েছে। এসব প্রদর্শনী দেখায় যে যান্ত্রিক ভারসাম্য, গতিশীলতা এবং এআই-ভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে প্রদর্শনী আর যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা এক জিনিস নয়। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রয়োজন নির্ভুলতা, টেকসই শক্তি, জটিল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং কঠোর পরিবেশে দীর্ঘসময় কাজ করার সামর্থ্য—যা এখনো হিউম্যানয়েড রোবটের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শক্তি সরবরাহ বা পাওয়ার ম্যানেজমেন্ট। মানুষের মতো চলাফেরা করতে সক্ষম রোবটের জন্য প্রচুর শক্তি প্রয়োজন হয়। সাম্প্রতিক কিছু উন্নত মডেল নিজে নিজে ব্যাটারি পরিবর্তনের সক্ষমতা দেখালেও, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নিরবচ্ছিন্ন শক্তি সরবরাহ নিশ্চিত করা এখনও বড় প্রযুক্তিগত বাধা। পাশাপাশি রয়েছে যোগাযোগ নিরাপত্তা, হ্যাকিংয়ের ঝুঁকি এবং ইলেকট্রনিক জ্যামিংয়ের মতো সমস্যা।
নৈতিক প্রশ্নটিও এখানে বড় হয়ে দাঁড়ায়। যদি সত্যিই স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রধারী রোবট সৈন্য তৈরি হয়, তবে যুদ্ধের দায়ভার কে নেবে—প্রোগ্রামার, নির্মাতা, নাকি ব্যবহারকারী রাষ্ট্র? আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও যুদ্ধ আইন এই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খাওয়াতে এখনো প্রস্তুত নয়। অনেক বিশেষজ্ঞ ইতিমধ্যেই “কিলার রোবট” বা সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় মারাত্মক অস্ত্রের ওপর বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণের দাবি তুলেছেন।
চীনের বর্তমান কৌশল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা হিউম্যানয়েড রোবটকে আপাতত বেসামরিক ও শিল্পক্ষেত্রে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। সীমান্ত পারাপারে সহায়তা, ভিড় নিয়ন্ত্রণ, লজিস্টিক ব্যবস্থাপনা, গুদাম পরিচালনা—এসব ক্ষেত্রে রোবট ব্যবহারের পরীক্ষা চলছে। উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং শ্রমঘাটতি মোকাবিলাই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য বলে মনে করা হয়। আন্তর্জাতিক ফেডারেশন অব রোবোটিকসের তথ্যও দেখায় যে শিল্প রোবট স্থাপনে চীন বিশ্বে শীর্ষে রয়েছে।
তবু প্রশ্নটা থেকে যায়—ভবিষ্যতে কি যুদ্ধক্ষেত্রে হিউম্যানয়েড রোবট দেখা যাবে? প্রযুক্তির গতিপথ বলছে, সম্পূর্ণ অসম্ভব নয়। সামরিক প্রযুক্তির ইতিহাসে দেখা গেছে, যা একসময় পরীক্ষাগারে সীমাবদ্ধ ছিল, তা ধীরে ধীরে বাস্তব ব্যবহারে এসেছে। ড্রোন তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। একসময় নজরদারির সীমিত যন্ত্র হিসেবে শুরু হলেও আজ ড্রোন আধুনিক যুদ্ধের কেন্দ্রে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই অনেকে আশঙ্কা করছেন, হিউম্যানয়েড রোবটও হয়তো ধীরে ধীরে সামরিক প্রয়োগের দিকে এগোতে পারে।
তবে বর্তমান বাস্তবতায় ভাইরাল ভিডিও দেখে আতঙ্কিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই। যাচাইযোগ্য তথ্য বলছে, চীন এখনো মানুষের মতো রোবট সৈন্যকে যুদ্ধের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে মোতায়েন করেনি। বরং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, শিল্প স্বয়ংক্রিয়তা এবং এআই সক্ষমতা বৃদ্ধিই তাদের প্রধান ফোকাস। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অতিরঞ্জিত বা ভুয়া কনটেন্ট এই বাস্তবতাকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করছে।
ডিজিটাল যুগে তথ্য যাচাইয়ের গুরুত্ব এখানেই সবচেয়ে বেশি। ভাইরাল ভিডিও, চমকপ্রদ দাবি বা নাটকীয় দৃশ্য—সবকিছুই সমানভাবে বিশ্বাসযোগ্য নয়। বিশেষ করে এআই প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, ততই ভিজ্যুয়াল বিভ্রান্তির ঝুঁকি বাড়ছে। তাই প্রযুক্তি-সংক্রান্ত খবরের ক্ষেত্রে উৎস, প্রমাণ এবং স্বাধীন যাচাই—এই তিনটি বিষয় গুরুত্ব দিয়ে দেখা জরুরি।
সব মিলিয়ে বলা যায়, চীন হিউম্যানয়েড রোবট উন্নয়নে দ্রুত এগোচ্ছে—এটা সত্য। কিন্তু তারা ইতিমধ্যেই যুদ্ধক্ষেত্রে রোবট সৈন্য নামিয়ে দিয়েছে—এ দাবি এখনো প্রমাণিত নয়। ভাইরাল ভিডিওটি বরং আমাদের সামনে অন্য এক বাস্তবতা তুলে ধরেছে: ভবিষ্যতের যুদ্ধ যেমন প্রযুক্তিনির্ভর হতে পারে, তেমনি তথ্যযুদ্ধও হয়ে উঠছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তব ও কৃত্রিমের এই নতুন যুগে সতর্ক বিশ্লেষণই হতে পারে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য
আপনার মতামত জানানঃ