সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের নাম। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে তাকে ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ, সম্পদ অর্জনের গুজব এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা ছড়িয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই তিনি নিজেই ফেসবুকে দীর্ঘ একটি স্ট্যাটাস দিয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করার চেষ্টা করেছেন। ‘আসিফ নজরুলের দুর্নীতি?’ শিরোনামে দেওয়া সেই পোস্টে তিনি একদিকে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোকে গুজব ও মিথ্যাচার বলে দাবি করেছেন, অন্যদিকে নিজের কর্মজীবন, ব্যক্তিগত সততা এবং দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে ড. আসিফ নজরুল দীর্ঘদিন ধরে একটি আলোচিত নাম। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে পরিচিত হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষক, লেখক এবং সরকারের উপদেষ্টা হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় আইন উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর তার কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা আরও বেড়ে যায়। দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিভিন্ন নীতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যা অনেকের কাছে প্রশংসিত হলেও সমালোচনার মুখেও পড়েছে।
সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে যে গুজবটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে, সেটি হলো তিনি নাকি যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ি কিনেছেন এবং পরিবারসহ সেখানে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। এই অভিযোগকে তিনি সরাসরি ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় এক বছর আগে ইউটিউবের একটি চ্যানেলে প্রথম এই ধরনের খবর ছড়ানো হয়। সেই ভিডিওটি অনেক মানুষ দেখেন এবং ধীরে ধীরে কিছু মানুষ সেটিকে সত্য বলে বিশ্বাসও করতে শুরু করেন। বিষয়টি নিয়ে এক পর্যায়ে একটি টেলিভিশন আলোচনায় প্রশ্ন ওঠে, যেখানে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন যে যুক্তরাষ্ট্রে কেউ বাড়ি কিনলে তার সরকারি রেকর্ড থাকে এবং সেটি লুকানো সম্ভব নয়।
তিনি তখনই একটি প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন—যদি সত্যিই তার যুক্তরাষ্ট্রে কোনো বাড়ি থাকে, তাহলে তার প্রমাণ প্রকাশ করতে। তিনি বলেন, এই চ্যালেঞ্জ দেওয়ার পর আট মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত কেউ কোনো ঠিকানা, দলিল বা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ দেখাতে পারেনি। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র তো দূরের কথা, বাংলাদেশের বাইরে পৃথিবীর কোনো দেশেই তার কোনো বাড়ি বা সম্পত্তি নেই। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো অনেক তথ্যই যাচাই-বাছাই ছাড়াই মানুষ বিশ্বাস করে ফেলছে।
ড. আসিফ নজরুল মনে করেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় দায়িত্ব পালন করার পর তার বিরুদ্ধে নতুন করে নানা ধরনের অভিযোগ ছড়ানো শুরু হয়েছে। তার মতে, প্রথমে কিছু অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এসব অভিযোগ প্রকাশিত হয়, পরে অন্য কিছু অনলাইন মাধ্যমে সেগুলো কপি-পেস্ট হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে এমন কিছু সংবাদমাধ্যমও এই ধরনের খবর প্রচার করেছে, যেগুলো তার ভাষায় ‘কুখ্যাত অপরাধীদের মালিকানাধীন’ এবং যারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় খুব একটা সুবিধাজনক অবস্থায় ছিল না।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, তার অনেক সহকর্মী এসব অভিযোগকে গুরুত্ব দিতে চান না। তিনিও ব্যক্তিগতভাবে এগুলোকে তেমন গুরুত্ব দিতে চান না, কিন্তু তিনি মনে করেন তার অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী আছেন যারা তাকে ভালোবাসেন এবং তার জন্য দোয়া করেন। তাদের কেউ যদি এসব গুজবে কষ্ট পেয়ে থাকেন, তাহলে তাদের উদ্দেশ্যে সত্যটা পরিষ্কার করা প্রয়োজন। তাই তিনি সামাজিক মাধ্যমে নিজের বক্তব্য ‘অন রেকর্ড’ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
নিজের বক্তব্যের অংশ হিসেবে তিনি কয়েকটি বিষয় স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। প্রথমত, তিনি দাবি করেন যে জীবনে কখনো কোনো দুর্নীতি করেননি। সরকারে দায়িত্ব পালন করার সময় কিংবা তার আগে-পরে কোনো সময়েই তিনি অবৈধভাবে কোনো অর্থ বা সম্পদ অর্জন করেননি। তার ভাষায়, তিনি এক টাকাও দুর্নীতি করেননি। তিনি বলেন, দায়িত্বে থাকার সময় তিনি কোনো নতুন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলেননি, কোনো নতুন সম্পদ অর্জন করেননি এবং আয়কর প্রদানের সময় কোনো সম্পদ গোপন করেননি। তার মতে, দুর্নীতি করা তো দূরের কথা, এমন চিন্তাও তার জীবনে কখনো ছিল না।
দ্বিতীয়ত, তিনি স্বজনপ্রীতির অভিযোগও অস্বীকার করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারে দায়িত্ব পালন করার সময় তিনি তার পরিবার বা আত্মীয়স্বজনকে কোনো ধরনের বিশেষ সুবিধা দেননি। এমনকি আইন কর্মকর্তা নিয়োগের সময়ও তিনি কোনো আত্মীয়কে সুযোগ দেননি। তিনি দাবি করেন যে প্রায় পাঁচ হাজার আইন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়ার সময়ও তিনি একজন আত্মীয়কেও নিয়োগ দেননি। তার আত্মীয়রা কারও পক্ষে তদবির করার সুযোগও পাননি।
তৃতীয়ত, তিনি এলাকাপ্রীতির অভিযোগের জবাব দিয়েছেন। অনেক সময় দেখা যায় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা নিজেদের এলাকা বা জন্মস্থানকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনি দাবি করেন, দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তিনি তার গ্রামের বাড়ি বা ঢাকায় যেখানে বড় হয়েছেন সেখানে একবারও যাননি। তবে তিনি স্বীকার করেছেন যে লালবাগ শাহী মসজিদের জরুরি উন্নয়নের জন্য ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কিছু আর্থিক সহায়তা পেতে সহযোগিতা করেছিলেন। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ও ডাকসুর আবেদনের ভিত্তিতে ক্রিকেট বোর্ডের কাছে অনুরোধ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠ উন্নয়নের জন্য কিছু অনুদান আনার চেষ্টা করেছিলেন। এর বাইরে তিনি কারও জন্য কোনো অনুদানের অনুরোধ করেননি বলে দাবি করেছেন।
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে তিনি বলেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরেই নানা ধরনের মিথ্যাচার ও অপবাদের মুখোমুখি হচ্ছেন। তার মতে, ইতিহাসে অনেক বড় মানুষও মিথ্যা অভিযোগের শিকার হয়েছেন। ইসলামের ইতিহাসে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-সহ অনেক আলেম ও ব্যক্তিত্বও অপবাদের সম্মুখীন হয়েছেন। তিনি নিজেকে তাদের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য মানুষ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, মিথ্যাচার সহ্য করার শক্তি তারও রাখতে হবে। তবে তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন যে চুরি করে বা অন্যের অধিকার হরণ করে বেঁচে থাকার জন্য তার জন্ম হয়নি।
তার বক্তব্যে ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয়টিও উঠে আসে। তিনি বলেন, যারা তার বিরুদ্ধে অপবাদ ছড়াচ্ছেন তাদের সঙ্গে তিনি ঝগড়ায় জড়াতে চান না। তবে তার বিশ্বাস আছে যে শেষ পর্যন্ত তারা তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। গত বিশ বছরে তার বিরুদ্ধে অনেক অপবাদ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তার মতে, আল্লাহর ওপর তার আস্থা আছে এবং তিনি বিশ্বাস করেন সত্য শেষ পর্যন্ত প্রকাশিত হবেই।
এদিকে আরেকটি ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখক জাকির তালুকদারের সমালোচনার জবাব দিয়েছেন। তার অভিযোগ, জাকির তালুকদার মাঝেমধ্যে তাকে নিয়ে পোস্ট দেন এবং সেখানে কোনো বিশ্লেষণ বা আলোচনা না করে শুধু তাকে নিম্নমানের লেখক বলে মন্তব্য করেন। ড. আসিফ নজরুল বলেন, তিনি নিজে জাকির তালুকদারের লেখার ভক্ত নন, তবে তার একটি বই কিনে পড়ার চেষ্টা করেছিলেন। তার মতে, সেই বইয়ে তথ্যভিত্তিক বিবরণের মধ্যে দুর্বল কাহিনি যুক্ত করার চেষ্টা ছিল এবং সেটি পড়া শেষ করা কঠিন ছিল।
তিনি আরও বলেন, একজন লেখক কী আত্মবিশ্বাসে অন্য একজনকে প্রকাশ্যে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন, সেটি তার বোধগম্য নয়। তিনি উল্লেখ করেন যে সংস্কৃতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় তিনি সৈয়দ জামিল আহমেদ, মোহাম্মদ আজম, আফসানা বেগম এবং লতিফুল ইসলাম শিবলীর মতো ব্যক্তিদের বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তার প্রশ্ন, কেন এই ব্যক্তিরা কারও কাছে তুচ্ছ বা অযোগ্য মনে হবে।
এই প্রসঙ্গে তিনি ধারণা প্রকাশ করেন যে কিছু মানুষ বঞ্চনা ও ঈর্ষা থেকে এমন মন্তব্য করেন। তার মতে, এ ধরনের মানুষরা অনেক সময় নিজেদের খুব বেশি গুরুত্ব দেন এবং অন্যদের ছোট করে দেখানোর প্রবণতা রাখেন। তবে তিনি বলেন, কেউ যদি নিজের প্রশংসা করতে চান, তাতে তার আপত্তি নেই। কিন্তু অপ্রাসঙ্গিকভাবে অন্যদের ছোট করা ঠিক নয়।
সবশেষে তিনি বলেন, তিনি সাধারণত অন্য কারও লেখা ভালো লাগলে তার প্রশংসা করেন এবং না লাগলে নীরব থাকেন। কিন্তু তাকে নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা করার কারণে তিনি এবার জবাব দিতে বাধ্য হয়েছেন। এই পুরো ঘটনাটি আবারও দেখিয়ে দিয়েছে যে বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কত দ্রুত গুজব, অভিযোগ এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ ছড়িয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে এটি একটি বড় প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে—জনপ্রিয় বা আলোচিত ব্যক্তিদের সম্পর্কে ছড়ানো তথ্য কতটা যাচাই করা হচ্ছে এবং মানুষ কতটা সচেতনভাবে সেগুলো গ্রহণ করছে।
আপনার মতামত জানানঃ