
বাংলাদেশে আবারও হামের ভয়াবহ প্রত্যাবর্তন যেন এক অপ্রত্যাশিত বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে রোগকে একসময় প্রায় নির্মূলের পথে মনে করা হচ্ছিল, সেটিই এখন নতুন করে জনস্বাস্থ্য সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক গবেষণা ও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এই প্রাদুর্ভাব কেবল একটি স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়, বরং এটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নীতিগত পরিবর্তন, এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার সম্মিলিত প্রতিফলন।
গত কয়েক মাসে দেশে হামের সংক্রমণ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্চের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে অল্প সময়ের মধ্যেই আক্রান্তের সংখ্যা ৩২ হাজার ছাড়িয়ে যায়, আর মৃত্যুর সংখ্যা ২৫০-এর বেশি—যাদের বেশিরভাগই শিশু। এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়, বরং প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি অপূর্ণ ভবিষ্যৎ এবং একটি প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর করুণ বাস্তবতা। ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে শিশুদের ভিড়, শয্যা সংকট, এমনকি মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নেওয়ার দৃশ্য—এসবই পরিস্থিতির গভীরতা বোঝাতে যথেষ্ট।
বিশ্বব্যাপী হামের পুনরুত্থান নতুন কোনো ঘটনা নয়। উন্নত দেশগুলোর মধ্যেও এই রোগ আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে একসময় বছরে প্রায় ১০০ জন আক্রান্ত হতো, সেখানে এখন এই সংখ্যা বেড়ে ১,৭০০ ছাড়িয়েছে। ইউরোপ, কানাডা, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা গ্রহণে অনীহা, করোনা মহামারির সময় টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্ন এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই রোগ আবার ছড়িয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই সংকটের পেছনে আরও নির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের টিকাদান কর্মসূচি আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত ছিল। শিশুদের ৯ ও ১৫ মাস বয়সে হাম-রুবেলা টিকার দুটি ডোজ দেওয়ার মাধ্যমে দেশটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছিল। প্রতি চার বছর পরপর জাতীয় পর্যায়ে সম্পূরক টিকাদান কর্মসূচি চালিয়ে ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যও ছিল কার্যকর। কিন্তু সেই ধারাবাহিকতায় হঠাৎ ব্যাঘাত ঘটে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর টিকা সংগ্রহ পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়। আগে যেখানে আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে দ্রুত এবং নির্ভরযোগ্যভাবে টিকা সংগ্রহ করা হতো, সেখানে নতুন করে ‘উন্মুক্ত দরপত্র’ পদ্ধতি চালু করা হয়। এই পরিবর্তনকে স্বচ্ছতার দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হলেও বাস্তবে এটি জটিল আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে পড়ে যায়। ফলে টিকার সরবরাহে বিলম্ব ঘটে এবং এক পর্যায়ে মজুত ফুরিয়ে যায়।
এই বিলম্বের প্রভাব সরাসরি পড়ে টিকাদান কর্মসূচির ওপর। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী টিকা দেওয়া সম্ভব হয়নি, এমনকি কিছু সম্পূরক কর্মসূচি পিছিয়ে যায় বা বাতিল হয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মাত্র ৫৯ শতাংশ শিশু হামের টিকা পেয়েছে, যা জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এই ফাঁক তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাইরাসটি দ্রুত বিস্তার লাভ করে।
সংক্রমণের বিস্তার আরও ত্বরান্বিত হয় সীমান্তবর্তী এলাকায়। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রথম প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর তা দ্রুত দেশের ৫৪ জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। এই ধরনের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা সীমিত এবং পুষ্টিহীনতার হার বেশি হওয়ায় রোগের প্রভাব আরও মারাত্মক হয়। শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় সংক্রমণ দ্রুত জটিল আকার ধারণ করে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভিটামিন ‘এ’ কর্মসূচির ব্যাঘাত। হামের ক্ষেত্রে ভিটামিন ‘এ’ শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু এই কর্মসূচি তিন দফা বন্ধ থাকায় শিশুদের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। অর্থাৎ, শুধু টিকার অভাব নয়, বরং সহায়ক স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতাও এই সংকটকে গভীর করেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি একটি বৃহত্তর কাঠামোগত সমস্যার প্রতিফলন। স্বাস্থ্যখাতে পরিকল্পনার অভাব, নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রভাব মূল্যায়নের ঘাটতি এবং দ্রুত বাস্তবায়নের অক্ষমতা—এসব মিলেই সংকটকে জটিল করেছে। একদিকে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা, অন্যদিকে কার্যকারিতা বজায় রাখার প্রয়োজন—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এমন বিপর্যয় ঘটতে পারে।
এদিকে, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো আগেই সতর্ক করেছিল যে টিকা সংগ্রহ পদ্ধতির পরিবর্তন ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাদের মতে, জরুরি স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে সময়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। একটি ছোট বিলম্বও বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের কারণ হতে পারে। কিন্তু সেই সতর্কতা যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার আবার আগের পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি ইতোমধ্যে যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা নিয়ন্ত্রণে আনতে সময় লাগবে। কারণ ভাইরাসটি ইতোমধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং অনেক শিশু এখনও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
এই সংকটের আরেকটি দিক হলো দায় নির্ধারণের প্রশ্ন। রাজনৈতিক নেতৃত্ব একে অপরের ওপর দায় চাপালেও বাস্তবতা হলো, জনস্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। একটি সরকারের সিদ্ধান্তের প্রভাব পরবর্তী সময়েও বহাল থাকে, তাই এই খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং সমন্বয় অপরিহার্য।
হাম একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগ—এই সত্যটি এখানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। একটি কার্যকর টিকাদান কর্মসূচি থাকলে এই রোগে কোনো শিশুর মৃত্যুর কথা নয়। অথচ বাস্তবতায় আমরা দেখছি, শত শত শিশু জীবন হারাচ্ছে। এটি কেবল একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়, বরং একটি নৈতিক ব্যর্থতাও বটে।
এখন প্রয়োজন দ্রুত, সমন্বিত এবং বিজ্ঞানভিত্তিক পদক্ষেপ। টিকার সরবরাহ নিশ্চিত করা, টিকাদান কর্মসূচি পুনরুজ্জীবিত করা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত উন্নয়ন—এসব একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি, ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি যাতে না ঘটে, তার জন্য নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং বিশেষজ্ঞ মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশ একসময় টিকাদান কর্মসূচিতে একটি সফল উদাহরণ ছিল। সেই অবস্থানে ফিরে যেতে হলে এখনই সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। কারণ প্রতিটি বিলম্ব মানে আরও একটি শিশু ঝুঁকির মুখে পড়া। আর এই বাস্তবতা যত দ্রুত উপলব্ধি করা যাবে, তত দ্রুতই হয়তো এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে।
আপনার মতামত জানানঃ