বাংলাদেশ একসময় টিকাদান কর্মসূচির সাফল্যের জন্য বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত ছিল। গ্রাম থেকে শহর, চর থেকে পাহাড়—স্বাস্থ্যকর্মীদের হাতে পৌঁছে যেত শিশুদের জীবনরক্ষাকারী টিকা। হাম, পোলিও, ডিপথেরিয়ার মতো রোগ নিয়ন্ত্রণে এনে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় একটি মডেল হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই সাফল্যের গল্পে এখন যোগ হয়েছে উদ্বেগ, আতঙ্ক আর প্রশ্ন। ২০২৬ সালের ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাব শুধু জনস্বাস্থ্যের দুর্বলতাকেই প্রকাশ করেনি, বরং সরকারি তথ্য ও বাস্তবতার মধ্যকার ভয়ঙ্কর ফারাকও সামনে নিয়ে এসেছে।
দেশজুড়ে হামে আক্রান্ত শিশুদের কান্না, হাসপাতালের ভিড়, মায়ের অসহায় অপেক্ষা আর একের পর এক মৃত্যুর খবর মানুষের মনে নতুন এক শঙ্কা তৈরি করেছে। অথচ সরকারি হিসাব বলছে এক সংখ্যা, আর স্থানীয় হাসপাতাল, প্রশাসন ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের তথ্য বলছে অন্য কিছু। এই বৈপরীত্য এখন শুধু পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; এটি হয়ে উঠেছে জনআস্থার সংকট।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা ডিরেক্টরেট জেনারেল অব হেলথ সার্ভিসেস—ডিজিএইচএস—যে তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করছে, তা নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের বড় অংশ প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের অভিযোগ, প্রকৃত পরিস্থিতি আড়াল করতে সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা কম দেখানো হচ্ছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী যেসব বিভাগে কোনো মৃত্যুই হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে, স্থানীয় হাসপাতাল ও প্রশাসনের নথিতে সেখানে একাধিক শিশুর মৃত্যুর তথ্য রয়েছে। এই পার্থক্য শুধু সংখ্যার নয়, এটি রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিরও একটি প্রতিচ্ছবি।
রংপুর বিভাগের ঘটনাই ধরা যাক। ডিজিএইচএস বলছে সেখানে হামে কোনো মৃত্যুর ঘটনা নেই। অথচ স্থানীয় হাসপাতাল ও প্রশাসনিক সূত্র জানাচ্ছে, অন্তত চারজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বরিশালেও একই চিত্র। সরকারি তথ্য বলছে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে এবং নয়জন নিশ্চিতভাবে হামে মারা গেছে। কিন্তু স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের হিসাবে উপসর্গসহ মৃত্যুর সংখ্যা ২৮ এবং ল্যাব পরীক্ষায় নিশ্চিত মৃত্যু তিনজন। ময়মনসিংহে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। সেখানে ডিজিএইচএসের তথ্য অনুযায়ী তিন শিশুর মৃত্যু হলেও, শুধু ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই স্থানীয় সূত্রে মৃত্যুর সংখ্যা ২৭।
এই অসঙ্গতি মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলছে—তাহলে প্রকৃত চিত্র কোনটি? দেশের মানুষ কি পুরো সত্য জানছে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি মহামারি বা সংক্রামক রোগ মোকাবিলার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো স্বচ্ছ তথ্য। কারণ মানুষ যদি প্রকৃত পরিস্থিতি না জানে, তবে তারা সতর্ক হয় না, চিকিৎসা নেয় না, এমনকি টিকাদান সম্পর্কেও উদাসীন হয়ে পড়ে। তথ্য গোপন বা কম দেখানো হলে সংকট আরও গভীর হয়। জনস্বাস্থ্য আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই মনে করেন, প্রশাসনিক ব্যর্থতা ঢাকতেই প্রায়শই এমন প্রবণতা দেখা যায়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ফয়জুল হাকিম লালার বক্তব্য বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করে। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ব্যর্থতা লুকানোর সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। যখন কক্সবাজারে প্রথম হাম শনাক্ত হয়েছিল, তখন যথাযথভাবে মানুষকে সতর্ক করা হয়নি। পরে রাজশাহীতে শিশু মৃত্যুর খবর গণমাধ্যমে আসার পর বিষয়টি জাতীয়ভাবে আলোচনায় আসে। অর্থাৎ সংকট শুরু হওয়ার পরও জনসচেতনতা তৈরিতে বড় ধরনের ঘাটতি ছিল।
তবে ডিজিএইচএস এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, এটি ইচ্ছাকৃত তথ্য গোপন নয়; বরং তথ্য সংগ্রহ ব্যবস্থার দুর্বলতার ফল। বিভাগীয় পরিচালক, সিভিল সার্জন ও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলো নিয়মিত তথ্য দেয় না বলেও দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, একটি জাতীয় স্বাস্থ্য সংকটে যদি তথ্য সংগ্রহ ব্যবস্থাই এত দুর্বল হয়, তাহলে জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তা কতটা ঝুঁকিতে রয়েছে?
সরকারি হিসাবে মার্চের মাঝামাঝি থেকে এখন পর্যন্ত ৫৪ হাজারের বেশি মানুষ হামে আক্রান্ত হয়েছে এবং মৃত্যুর সংখ্যা ৩৫২। তবে এর মধ্যে মাত্র ৬১ জনের মৃত্যু ল্যাব পরীক্ষায় নিশ্চিত করা হয়েছে। বাকিদের ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে তারা হামসদৃশ উপসর্গে মারা গেছে। এখানেই বিশেষজ্ঞদের আরেকটি বড় উদ্বেগ। কারণ গ্রামাঞ্চল বা জেলা পর্যায়ে অনেক ক্ষেত্রেই ল্যাব টেস্ট করা হচ্ছে না। ফলে প্রকৃত হাম আক্রান্ত বা মৃত্যুর সংখ্যা সরকারি খাতায় যুক্তই হচ্ছে না।
বাংলাদেশে হামের এই পুনরুত্থান একদিনে হয়নি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি কিছু সংকট। কোভিড-১৯ মহামারির সময় টিকাদান কর্মসূচি বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছিল। অনেক এলাকায় নিয়মিত টিকা কার্যক্রম বন্ধ ছিল। আবার কোথাও মানুষের মধ্যে ভয় কাজ করেছিল স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে। সেই প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটেনি। একইসঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে অর্থসংকট, জনবল ঘাটতি, মাঠপর্যায়ে সমন্বয়হীনতা এবং কিছু ক্ষেত্রে টিকা নিয়ে গুজবও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ বহু আগেই সতর্ক করেছিল যে, হাম প্রতিরোধে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হবে। এর নিচে নেমে গেলে যে কোনো সময় বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশে সেই নিরাপদ সীমা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে দুর্গম অঞ্চল, বস্তি, নদীভাঙন এলাকা এবং দরিদ্র পরিবারগুলোর শিশুদের অনেকেই নিয়মিত টিকা পায়নি।
এই বাস্তবতায় সরকার জরুরি ভিত্তিতে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। এপ্রিলের শুরুতে সীমিত পরিসরে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি পরে সারা দেশে বিস্তৃত করা হয়। সরকারের দাবি, ছয় মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী ৯০ শতাংশের বেশি শিশুকে ইতোমধ্যে টিকা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই সংখ্যাও কতটা নির্ভুল, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কারণ মাঠপর্যায়ে এখনো অনেক অভিভাবক জানাচ্ছেন, তারা টিকাদান সম্পর্কে সময়মতো তথ্য পাননি কিংবা স্বাস্থ্যকর্মীরা তাদের এলাকায় পৌঁছাননি।
একজন মায়ের জন্য সন্তানের জ্বর কখনোই শুধু একটি অসুখ নয়; সেটি ভয়, উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তার আরেক নাম। হামে আক্রান্ত শিশুরা কয়েকদিনের মধ্যেই নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট কিংবা মস্তিষ্কের জটিলতায় আক্রান্ত হতে পারে। চিকিৎসকেরা বলছেন, অনেক শিশুকে হাসপাতালে আনার আগেই অবস্থার অবনতি হয়ে যাচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে এখনো অনেকে হামকে সাধারণ জ্বর ভেবে অবহেলা করেন। ফলে চিকিৎসা নিতে দেরি হয়।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক জানিয়েছেন, শিশু ওয়ার্ডে প্রতিদিনই নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছে। অনেক শিশুর শরীরে লাল দাগ ছড়িয়ে পড়ছে, জ্বর কমছে না, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। হাসপাতালের সীমিত শয্যা আর জনবল নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসকদের।
এই সংকট কেবল স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা নয়, বরং সামাজিক বৈষম্যেরও প্রতিফলন। শহরের মধ্যবিত্ত পরিবার হয়তো দ্রুত হাসপাতালে যেতে পারছে, টিকা সম্পর্কে সচেতন হচ্ছে। কিন্তু দরিদ্র বা প্রান্তিক পরিবারগুলো এখনো তথ্য ও চিকিৎসা—দুই দিক থেকেই পিছিয়ে। ফলে মৃত্যুর ঝুঁকিও তাদের ক্ষেত্রেই বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন সবচেয়ে জরুরি হলো আস্থা ফিরিয়ে আনা। মানুষকে সত্য জানাতে হবে। কোথায় কত সংক্রমণ, কত মৃত্যু, কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে—সবকিছু স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করতে হবে। কারণ তথ্য গোপন করে মহামারি থামানো যায় না। বরং এতে গুজব বাড়ে, আতঙ্ক ছড়ায় এবং মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি হয়।
একসময় বাংলাদেশ যেভাবে টিকাদান কর্মসূচিকে জাতীয় আন্দোলনে রূপ দিয়েছিল, আবারও সেই ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শুধু সরকারি প্রচারণা নয়, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ইমাম, গণমাধ্যম এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকেও সম্পৃক্ত করতে হবে। মানুষকে বোঝাতে হবে, হাম কোনো সাধারণ রোগ নয়। এটি প্রাণঘাতী হতে পারে।
ভাইরোলজি বিশেষজ্ঞ ড. সাইফ উল্লাহ মুনশি বলেছেন, টিকা কার্যকর হতে সময় লাগে। একটি শিশুর শরীরে প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে উঠতে প্রায় ২০ দিন সময় প্রয়োজন। তাই এখনই সংক্রমণ কমে না গেলেও, কার্যকর টিকাদান অব্যাহত থাকলে মে মাসের মাঝামাঝি থেকে পরিস্থিতির উন্নতি দেখা যেতে পারে। তবে সেই আশার সঙ্গে সতর্কতাও জরুরি। কারণ শুধু টিকা দিলেই হবে না; নিশ্চিত করতে হবে যেন কোনো শিশুই বাদ না পড়ে।
বাংলাদেশের বর্তমান হাম সংকট আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, জনস্বাস্থ্য শুধু হাসপাতাল বা ওষুধের বিষয় নয়; এটি আস্থা, তথ্য, সচেতনতা এবং দায়িত্বশীলতার বিষয়ও। যখন বাস্তবতা ও সরকারি তথ্যের মধ্যে বড় ফারাক তৈরি হয়, তখন মানুষ শুধু রোগেই ভোগে না—তারা আস্থাহীনতাতেও আক্রান্ত হয়।
এই সংকট থেকে শিক্ষা নেওয়ার এখনই সময়। কারণ একটি শিশুর মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়; সেটি পুরো রাষ্ট্রের জন্যও একটি ব্যর্থতার
আপনার মতামত জানানঃ