
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে টিকা সংকটের বিষয়টি সাম্প্রতিক সময়ে একটি বড় জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ হিসেবে সামনে এসেছে। বিশেষ করে শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় টিকার ঘাটতি এবং তার ফলে হামের মতো সংক্রামক রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি—এসব ঘটনা শুধু একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং একটি জটিল নীতিগত পরিবর্তনের ফল, যার শিকড় রয়েছে অতীতের সিদ্ধান্ত এবং বাস্তবায়নের দুর্বলতায়। এই প্রেক্ষাপটে টিকা কেনা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার পদক্ষেপগুলো বিশ্লেষণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে, কারণ এই সিদ্ধান্তগুলোর সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের লাখো শিশুর জীবনে।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে টিকাদান কর্মসূচিতে আন্তর্জাতিকভাবে একটি সফল দেশের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই-এর মাধ্যমে প্রতি বছর প্রায় ৪০ লাখ শিশুকে বিভিন্ন রোগের বিরুদ্ধে টিকা দেওয়া হতো। এই কর্মসূচির বড় একটি অংশ পরিচালিত হতো আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে, বিশেষ করে ইউনিসেফ ও গ্যাভির সহায়তায়। ফলে টিকা সংগ্রহের প্রক্রিয়া ছিল তুলনামূলকভাবে সহজ, দ্রুত এবং ঝুঁকিমুক্ত। সরকারকে সরাসরি জটিল আন্তর্জাতিক ক্রয় প্রক্রিয়ার মধ্যে যেতে হতো না, এবং সময়মতো টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করা যেত।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সরকারের নীতিতে পরিবর্তন আসে। দাতানির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে সরকার ধীরে ধীরে সেক্টর প্রোগ্রাম থেকে বেরিয়ে আসার পরিকল্পনা নেয়। এই পরিকল্পনার পেছনে যুক্তি ছিল—নিজেদের আর্থিক ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়িয়ে টিকা ক্রয় প্রক্রিয়াকে আরও স্বনির্ভর করা। তত্ত্বগতভাবে এটি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ, কারণ দীর্ঘমেয়াদে কোনো দেশই সম্পূর্ণভাবে বাইরের সহায়তার ওপর নির্ভর করে থাকতে পারে না। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় এই পরিবর্তনের বাস্তবায়ন পদ্ধতিতে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এই পরিবর্তন দ্রুত কার্যকর করার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ছাড়াই। ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনার যে প্রতিষ্ঠিত ও পরীক্ষিত ব্যবস্থা ছিল, সেটিকে হঠাৎ করে বাদ দিয়ে সরাসরি টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজার থেকে টিকা সংগ্রহ করা একটি জটিল প্রক্রিয়া, যেখানে দরপত্র, যাচাই-বাছাই, অর্থ ছাড়, সরবরাহ চেইন—সবকিছুই সুপরিকল্পিতভাবে করতে হয়। এই ক্ষেত্রে সেই প্রস্তুতি যথাযথভাবে নেওয়া হয়নি বলেই অভিযোগ উঠেছে।
ফলাফল ছিল ভয়াবহ। টিকা কেনার প্রক্রিয়ায় বিলম্ব ঘটে, যা কয়েক মাস ধরে চলতে থাকে। এই সময়ের মধ্যে নতুন টিকা কেনা কার্যত বন্ধ থাকে। ফলে দেশের বিভিন্ন জেলায় টিকার সংকট দেখা দেয়। অনেক অভিভাবক তাদের শিশুদের নিয়ে টিকাকেন্দ্রে গিয়ে ফিরে আসেন টিকা না পেয়ে। এই পরিস্থিতি শুধু একটি প্রশাসনিক সমস্যা ছিল না, বরং এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের ওপর আঘাত হানে।
এই সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে শিশুদের ওপর। হামের মতো একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগের প্রকোপ হঠাৎ করে বেড়ে যায়। বিভিন্ন জেলায় শত শত শিশু আক্রান্ত হয় এবং মৃত্যুর ঘটনাও সামনে আসে। যদিও সব মৃত্যুই সরাসরি হামজনিত কিনা তা নিশ্চিত নয়, তবুও টিকা ঘাটতি যে এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশেষ করে নয় মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বাড়া একটি নতুন উদ্বেগ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—টিকাদান কর্মসূচির ধারাবাহিকতা। এই কর্মসূচি এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে কোনো ধরনের ব্যাঘাত মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। একটি নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী শিশুদের টিকা দিতে হয়। যদি কোনো কারণে সেই সময়সূচি ভেঙে যায়, তাহলে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকা কেনার প্রক্রিয়ায় যে বিলম্ব হয়েছে, তা এই ধারাবাহিকতাকে ভেঙে দিয়েছে।
অন্যদিকে, এই সংকট শুধু টিকা কেনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সেক্টর প্রোগ্রাম বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা, এইডসসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য কর্মসূচিও প্রভাবিত হয়েছে। অর্থাৎ, একটি নীতিগত পরিবর্তনের প্রভাব পুরো স্বাস্থ্যখাতে ছড়িয়ে পড়েছে। এটি দেখায় যে স্বাস্থ্যখাতের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং পর্যাপ্ত প্রস্তুতি কতটা জরুরি।
যায
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার নতুন করে টিকা সংগ্রহ এবং টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে হামের টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ টিকা সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি টিকা দেওয়ার বয়সসীমাও কিছুটা পরিবর্তন করা হয়েছে, যাতে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের দ্রুত সুরক্ষার আওতায় আনা যায়। এই পদক্ষেপগুলো ইতিবাচক হলেও, এগুলো মূলত সংকট মোকাবিলার তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা। দীর্ঘমেয়াদে এমন সংকট এড়াতে হলে নীতিগত ও কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন।
এই পুরো ঘটনার একটি বড় শিক্ষা হলো—নীতি পরিবর্তন যতই ভালো উদ্দেশ্যে নেওয়া হোক না কেন, তার বাস্তবায়ন যদি সঠিকভাবে না হয়, তাহলে তা বিপরীত ফল বয়ে আনতে পারে। দাতানির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়, কিন্তু সেটি ধীরে ধীরে, পরিকল্পিতভাবে এবং পর্যাপ্ত প্রস্তুতির মাধ্যমে করা উচিত ছিল। হঠাৎ করে একটি প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাকে বাদ দিয়ে নতুন ব্যবস্থা চালু করার ফলে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, সেটিই আজকের এই সংকটের মূল কারণ।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জবাবদিহিতা। স্বাস্থ্যখাতের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কোনো সিদ্ধান্তের ফলে যদি জনজীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ এবং দায়িত্ব নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এতে ভবিষ্যতে একই ধরনের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া সম্ভব হবে।
সবশেষে বলা যায়, টিকা সংকট শুধু একটি স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়, এটি একটি নীতিগত ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রতিফলন। এই সংকট আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে জনস্বাস্থ্য রক্ষায় ধারাবাহিকতা, পরিকল্পনা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই। একটি ছোট ভুল বা অবহেলা লাখো মানুষের জীবনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ভবিষ্যতে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রয়োজন হবে সুপরিকল্পিত কৌশল, যথাযথ প্রস্তুতি এবং সর্বোপরি জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
আপনার মতামত জানানঃ