
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই জটিল শক্তির ভারসাম্য, ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব ও বৈশ্বিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই অঞ্চলের প্রতিটি বড় সংঘাত কেবল আঞ্চলিক সীমার মধ্যে আটকে থাকে না; বরং তা দ্রুত বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। সাম্প্রতিক সময়ের উত্তেজনা ও সংঘাতের প্রেক্ষাপটে আবারও প্রশ্ন উঠছে—মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা আসলে কী এবং সেই ভূমিকা কীভাবে ইসরায়েলের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে মিলে গিয়ে নতুন সংঘাতের জন্ম দিচ্ছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক কৌশলের ফলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও এমন এক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে, যা ভবিষ্যতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র একাধিকবার মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণ সেই উদাহরণের অন্যতম। তখন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে একটি শক্তিশালী মতবাদ কাজ করছিল, যা ‘নিউ আমেরিকান সেঞ্চুরি’ ধারণার সঙ্গে যুক্ত ছিল। এই ধারণার মূল লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রভাবকে সামরিক শক্তির মাধ্যমে আরও সুসংহত করা। ইরাকে হামলার পর প্রথমদিকে মনে হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত বিজয় অর্জন করেছে। সাদ্দাম হোসেনের সরকার পতন ঘটে এবং বাগদাদে মার্কিন সেনাদের উপস্থিতি নতুন এক যুগের সূচনা করবে বলে ধারণা করা হয়েছিল।
কিন্তু বাস্তবতা দ্রুত ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। ইরাক যুদ্ধ একটি দীর্ঘ বিদ্রোহ, অস্থিরতা ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার জন্ম দেয়। হাজার হাজার মার্কিন সেনা প্রাণ হারান, ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, সেই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ভুলগুলোর অন্যতম ছিল। এর ফলে মার্কিন রাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নিয়ে গভীর বিতর্ক শুরু হয়। পরে বারাক ওবামা ক্ষমতায় এসে ইরাক যুদ্ধকে ভুল বলে স্বীকার করার প্রতিশ্রুতি দেন। একই ধরনের জনঅসন্তোষের ঢেউ থেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্পও রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। নির্বাচনী প্রচারে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্র আর মধ্যপ্রাচ্যের অন্তহীন যুদ্ধে জড়াবে না।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন রূপ নেয়। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি এমনভাবে গড়ে উঠেছে যে, বড় শক্তিগুলো অনেক সময় নিজেদের ঘোষিত নীতির বিপরীত পথে হাঁটতে বাধ্য হয়। ট্রাম্প প্রশাসনের সময় থেকেই ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে ইরানকে তার প্রধান নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। এই ধারণা থেকে ইসরায়েলের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ওয়াশিংটনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে যাতে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়।
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই কৌশল বাস্তবায়নে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। নিয়মিত কূটনৈতিক যোগাযোগ, রাজনৈতিক চাপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মাধ্যমে তিনি ওয়াশিংটনে প্রভাব বিস্তার করেন। ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মাধ্যমেও এই প্রভাব কাজ করেছে বলে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন। ধীরে ধীরে এমন একটি ধারণা তৈরি করা হয় যে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক আঘাত হানলে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য বদলে যাবে এবং ইসরায়েলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দুর্বল হয়ে পড়বে।
এই ধারণা থেকেই সংঘাতের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অনুমোদন দেয় এবং পরিস্থিতি দ্রুত উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু যুদ্ধের বাস্তবতা প্রায়ই রাজনৈতিক কল্পনার সঙ্গে মেলে না। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই সংঘাত এমন পরিস্থিতি থেকে জন্ম নেয়নি যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সরাসরি কোনো নিরাপত্তা হুমকি ছিল। বরং এটি এসেছে কৌশলগত হিসাব-নিকাশ থেকে, যেখানে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তনের লক্ষ্য ছিল প্রধান।
২০১৫ সালের ইরান পারমাণবিক চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল। সেই চুক্তির মাধ্যমে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত করা হয়েছিল এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো তখন বলেছিল, ইরান মূলত সেই চুক্তির শর্ত মেনে চলছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সেই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আবার জটিল হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে ইরানের সঙ্গে নতুন আলোচনার সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছিল, কিন্তু সামরিক উত্তেজনা সেই সম্ভাবনাকে দুর্বল করে দেয়।
এই সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের ঘনিষ্ঠতা। আগে ইসরায়েলের যুদ্ধগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে তার নিজস্ব যুদ্ধ হিসেবে দেখা হতো এবং যুক্তরাষ্ট্র সেখানে অস্ত্র, গোয়েন্দা তথ্য ও কূটনৈতিক সমর্থন দিত। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে দুই দেশের সামরিক কার্যক্রম প্রায় একসঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলোও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে সংবেদনশীল। বহু বছর ধরে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামো একটি সহজ বোঝাপড়ার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে বিপুল বিনিয়োগ করবে এবং নিজেদের ভূখণ্ডে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি দেবে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। এই সম্পর্ক অর্থনৈতিক ও সামরিক দুই দিক থেকেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
সাম্প্রতিক সময়ের উত্তেজনা সেই কাঠামোকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। কারণ, অনেক ক্ষেত্রে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে পরামর্শ ছাড়াই বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যুদ্ধ শুরু হলে সেই অঞ্চলের দেশগুলোই প্রথম ঝুঁকির মুখে পড়ে। তাদের ভূখণ্ডে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকায় তারা সম্ভাব্য প্রতিশোধমূলক হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।
এই পরিস্থিতি উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন ধরনের উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। অনেক ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলছেন—এই সংঘাতের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কি যথেষ্টভাবে বিবেচনা করা হয়েছে? কারণ, মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি বড় যুদ্ধই সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে।
মধ্যপ্রাচ্যের বিশৃঙ্খলা নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তর্ক রয়েছে। অনেক ইসরায়েলি কৌশলবিদ মনে করেন, অঞ্চলের অন্যান্য রাষ্ট্র দুর্বল হলে ইসরায়েলের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী হয়। শক্তির শূন্যতা তৈরি হলে ইসরায়েল তুলনামূলকভাবে বেশি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। তবে এই ধারণা সব সময় যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সঙ্গে মিলবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে যে ভূরাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে বড় সুবিধাভোগী ছিল। উপসাগর অঞ্চল তার বৈশ্বিক প্রভাবের অন্যতম কেন্দ্র। এখানেই রয়েছে বিশ্ব জ্বালানি বাজারের বড় অংশ, গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি এবং মার্কিন অর্থনীতিতে বড় বিনিয়োগের উৎস। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ সেই কাঠামোকে দুর্বল করে দিতে পারে।
যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয়, ততই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে প্রতিটি সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক মূল্য রয়েছে। ইসরায়েলের কৌশল অনুসরণ করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যদি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে, তবে তা শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের নিজের অবস্থানকেই দুর্বল করতে পারে। এই বাস্তবতা এখন অনেক উপসাগরীয় দেশের কাছেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকট তাই শুধু একটি সামরিক সংঘাত নয়; এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক জটিল সমীকরণ। এখানে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বৈশ্বিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং কূটনৈতিক কৌশল—সবকিছু একসঙ্গে কাজ করছে। এই সংঘাতের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে একটি বিষয় ক্রমেই পরিষ্কার হচ্ছে—মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো যুদ্ধের প্রভাব কেবল সেই অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা বিশ্বরাজনীতির ভারসাম্যকেও গভীরভাবে প্রভাবিত
আপনার মতামত জানানঃ