খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য ও দীর্ঘ অধ্যায়। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে এই দুই নেত্রীকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে দেশের রাজনীতি, ক্ষমতা, আন্দোলন, সংঘাত, সহনশীলতা ও বৈরিতার গল্প। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সেই অধ্যায়ের একটি প্রান্ত যেন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। যদিও রাজনীতি কখনোই হঠাৎ শেষ হয় না, তবু অনেকের কাছেই এটি দুই বেগমের যুগের একটি প্রতীকী সমাপ্তি।
ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে খালেদা জিয়ার জানাজায় মানুষের ঢল সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন। দলীয় পরিচয়ের বাইরে বহু মানুষ সেখানে উপস্থিত হন, যারা কখনো সক্রিয় রাজনীতি করেননি, আবার কেউ কেউ ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারী ছিলেন। দীর্ঘদিন অসুস্থতা, কারাবাস ও রাজনৈতিক নিঃসঙ্গতার কারণে খালেদা জিয়ার প্রতি এক ধরনের মানবিক সহানুভূতি তৈরি হয়েছিল সমাজের বড় অংশের মধ্যে। তার জানাজায় সেই অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিদায় নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক যুগের স্মরণীয় মুহূর্ত।
খালেদা জিয়া কখনো রাজনীতিতে আসার পরিকল্পনা করেননি। স্বামী ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর হঠাৎ করেই তাকে রাজনীতির কঠিন বাস্তবতায় প্রবেশ করতে হয়। বিপর্যস্ত একটি দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে তিনি ধীরে ধীরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। সামরিক শাসক এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মধ্য দিয়েই তার রাজনৈতিক পরিচিতি স্পষ্ট হয়। আপসহীন অবস্থানের কারণে তিনি দ্রুতই আলাদা করে নজরে পড়েন এবং বিএনপিকে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে রূপ দেন। এই পথচলাতেই তার মুখোমুখি দাঁড়ান আরেক রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহনকারী নেত্রী শেখ হাসিনা।
শেখ হাসিনাও রাজনীতিতে আসেন পারিবারিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব নেন তিনি। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে দুই নেত্রী একই লক্ষ্যে থাকলেও তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ছিল আলাদা, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। তখনো সম্পর্ক বৈরিতায় পৌঁছায়নি। বরং আন্দোলনের প্রয়োজনে একসঙ্গে বসতে হয়েছে, আলোচনা করতে হয়েছে, সমন্বয় করতে হয়েছে। সেই সময়ের রাজনীতিতে সহনশীলতার কিছু জায়গা ছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
এরশাদের পতনের পর গণতান্ত্রিক ধারায় ফেরার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও তীব্র হতে থাকে। ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে। সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা হলেও রাজনীতির ভেতরে অবিশ্বাস ও সংঘাত বাড়তে থাকে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে আন্দোলন, একতরফা নির্বাচন, সংসদ ভাঙা ও পুনর্নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দুই দলের সম্পর্ক ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসে, যা ছিল বঙ্গবন্ধু হত্যার দুই দশকেরও বেশি সময় পর দলের জন্য বড় রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন।
নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ থেকে দুই নেত্রীর সম্পর্ক আরও কঠোর রূপ নেয়। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এলে রাজনীতির বিভাজন গভীর হয়। সংখ্যালঘু নির্যাতন, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও অপারেশন ক্লিনহার্ট নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। একই সময়ে র্যাব গঠন হয়, যা পরবর্তীতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে বিতর্কিত হয়ে ওঠে। এসব ঘটনাই রাজনৈতিক আস্থাহীনতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলা দুই নেত্রীর সম্পর্ককে কার্যত চরম বৈরিতায় পরিণত করে। এই ঘটনার পর আর কোনো স্বাভাবিক রাজনৈতিক সম্পর্ক ফিরে আসেনি বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। প্রতিহিংসার রাজনীতি, মামলা, গ্রেপ্তার ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ রাজনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে। ২০০৭ সালে সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসে এবং দুই নেত্রীই কারাবন্দী হন। তখন ‘মাইনাস টু’ ধারণা আলোচনায় এলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
২০০৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে আসেন এবং টানা প্রায় দেড় দশক রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। এই দীর্ঘ শাসনামলে উন্নয়ন, অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি বিরোধী মত দমনের গুরুতর অভিযোগ ওঠে। বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর ওপর মামলা, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ রাজনৈতিক পরিবেশকে সংকুচিত করে। বিতর্কিত নির্বাচনগুলো নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট করে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
এই সময়েই খালেদা জিয়াকে দুর্নীতির মামলায় কারাবন্দী করা হয়। অসুস্থতা ও বয়সজনিত কারণে তিনি ধীরে ধীরে রাজনীতি থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। তার দীর্ঘ কারাবাস ও সীমিত মুক্তি মানবিক প্রশ্নও সামনে আনে। বিএনপি দাবি করে, এই বন্দিত্বই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটায়। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ বিএনপির বিরুদ্ধে অতীতের সহিংসতার অভিযোগ তুলে ধরে। এই পারস্পরিক দোষারোপের রাজনীতিই দীর্ঘদিন ধরে দেশকে বিভক্ত করে রেখেছিল।
শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি ও দেশত্যাগের পর রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন মোড় আসে। গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের পতন অনেকের কাছে অপ্রত্যাশিত হলেও বিশ্লেষকেরা মনে করেন, দীর্ঘদিনের ক্ষোভই এর ভিত্তি তৈরি করেছিল। এমন প্রেক্ষাপটে খালেদা জিয়ার মৃত্যু রাজনৈতিক ইতিহাসকে নতুনভাবে মূল্যায়নের সুযোগ এনে দেয়। তিনি ব্যক্তিগতভাবে কখনো নির্বাচনে হারেননি, সহনশীল আচরণ ও স্বল্পভাষী স্বভাবের কারণে একটি আলাদা ব্যক্তিত্ব তৈরি করেছিলেন। দলকে বারবার ভাঙনের মুখ থেকে রক্ষা করে তিনি বিএনপিকে প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ধরে রাখতে সক্ষম হন।
তার মৃত্যুর পর প্রশ্ন উঠছে, দুই দলীয় রাজনীতির এই দীর্ঘ ধারা কি ভাঙবে। নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের আলোচনা থাকলেও বাস্তবে পুরোনো কাঠামোই আবার দৃশ্যমান হচ্ছে বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা সামনে আসছে। আসন্ন নির্বাচন ও পরবর্তী রাজনৈতিক সমীকরণই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যৎ পথ।
খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতিকে যেমন নিয়ন্ত্রণ করেছেন, তেমনি তাদের ব্যক্তিগত বৈরিতাও রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছে গভীরভাবে। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা কখনো গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শক্তি জুগিয়েছে, আবার কখনো প্রতিহিংসার রাজনীতিকে উসকে দিয়েছে। খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সেই দীর্ঘ অধ্যায়ের একটি প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে দেশ। কিন্তু সেই ইতিহাসের ছায়া ও প্রভাব আরও অনেকদিন বাংলাদেশের রাজনীতিতে রয়ে যাবে বলেই মনে করেন
আপনার মতামত জানানঃ