
ঠাকুরগাঁওয়ের সকালের আলো তখনো পুরোপুরি ঝলমলে হয়ে ওঠেনি। কালীবাড়ি এলাকার এক শান্ত বাড়ির সামনে ভিড় জমেছে সাংবাদিক, কর্মী আর কৌতূহলী মানুষের। সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফল ঘিরে দেশজুড়ে উত্তেজনা, হিসাব–নিকাশ আর রাজনৈতিক ব্যাখ্যার ঢেউ। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। অন্যদিকে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি আসন জিতে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বিশেষ করে ৭০টি আসন জয় করে দলটি জাতীয় রাজনীতির সমীকরণে নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন উঠছে—এই উত্থানের পেছনে কী কারণ কাজ করেছে?
বাংলাদেশের গত দেড় দশকের রাজনৈতিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে একটি বড় প্রবণতা স্পষ্ট হয়: দীর্ঘমেয়াদি একদলীয় আধিপত্য, বিরোধী রাজনীতির সংকোচন এবং নির্বাচনী প্রতিযোগিতার সীমাবদ্ধতা। এই প্রেক্ষাপটে বিরোধী দলগুলোর ওপর দমন–পীড়ন, মামলা–হামলা, গ্রেপ্তার এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধা একটি নিয়মিত অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছিল। রাজনৈতিক বিজ্ঞানের একটি সুপরিচিত তত্ত্ব বলছে, যখন মূলধারার গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা সংকুচিত হয়, তখন রাজনৈতিক ক্ষেত্রের প্রান্তিক বা আদর্শিকভাবে দৃঢ় সংগঠনগুলো বিকল্প শক্তি হিসেবে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনে জামায়াতের ৭০ আসন জয় সেই তত্ত্বেরই একটি বাস্তব প্রতিফলন হিসেবে দেখা যাচ্ছে।
দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনৈতিক পরিসরকে যে মাত্রায় সংকুচিত করেছে, তাতে মূলধারার প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর সাংগঠনিক কাঠামো নানা সময় চাপে পড়েছে। বড় দল হিসেবে বিএনপি সংগঠন টিকিয়ে রাখলেও মাঠপর্যায়ে অনেক জায়গায় রাজনৈতিক কার্যক্রম সীমিত হয়ে যায়। এই শূন্যতার ভেতর আদর্শভিত্তিক, কাঠামোগতভাবে শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং তৃণমূলভিত্তিক নেটওয়ার্কসমৃদ্ধ সংগঠন হিসেবে জামায়াত নিজেদের পুনর্গঠনের সুযোগ পায়।
রাজনীতিতে দমন–পীড়ন কখনো কখনো প্রত্যাশিত ফল দেয় না। বরং উল্টোভাবে কাজ করে। যখন বিরোধী মতপ্রকাশের পথ সংকুচিত হয়, তখন অসন্তোষ জমতে থাকে। সেই অসন্তোষ যদি সাংগঠনিকভাবে সুসংহত কোনো প্ল্যাটফর্ম খুঁজে পায়, তাহলে তা ভোটে রূপান্তরিত হতে পারে। গত নির্বাচনে অনেক এলাকায় ভোটারদের মধ্যে এমন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া কাজ করেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। তারা মনে করছেন, দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিযোগিতাহীন পরিবেশ একধরনের ‘প্রতিক্রিয়াশীল ভোট’ তৈরি করেছে, যার একটি বড় অংশ জামায়াতের দিকে গেছে।
বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের কিছু জেলায় দেখা গেছে, যেখানে প্রধান বিরোধী শক্তির সাংগঠনিক উপস্থিতি দুর্বল ছিল বা দীর্ঘদিন মাঠে সক্রিয় রাজনীতি চালানো সম্ভব হয়নি, সেখানে জামায়াতের সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক দৃশ্যমান ছিল। মসজিদভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ, শিক্ষা–প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক কার্যক্রম, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ—এসবের মাধ্যমে তারা নিজেদের একটি সামাজিক উপস্থিতি ধরে রেখেছিল। রাজনৈতিক চাপের সময়গুলোতে এই নেটওয়ার্কগুলো নীরব থাকলেও সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েনি।
আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—রাজনৈতিক পরিচয়ের পুনর্গঠন। দীর্ঘদিন ধরে বিরোধী রাজনীতি যদি দমনমূলক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়, তাহলে সেই অভিজ্ঞতা দলীয় সমর্থকদের মধ্যে ‘অবিচারের বোধ’ তৈরি করে। এই বোধ কখনো কখনো আদর্শিকভাবে দৃঢ় দলগুলোর প্রতি সহানুভূতি সৃষ্টি করে। জামায়াতের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, অতীতের নিষেধাজ্ঞা, নিবন্ধন বাতিল, গ্রেপ্তার ও সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতার অভিজ্ঞতা তাদের সমর্থকভিত্তিকে একধরনের ‘সংকট–সংহতি’ দিয়েছে।
এবারের নির্বাচনে ৭০টি আসন জয়কে শুধু সংখ্যার বিচারে দেখলে পুরো চিত্র বোঝা যাবে না। এটি আসলে একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফল। ১৫ বছরের রাজনৈতিক চাপে যারা সংগঠন টিকিয়ে রেখেছে, তারা হঠাৎ করেই উত্থান ঘটায়নি; বরং জমে থাকা সমর্থন, স্থানীয় সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস এবং ভোটারদের মানসিক পরিবর্তনের সমন্বয়ে এই ফল এসেছে।
রাজনৈতিক বিজ্ঞানের আরেকটি ধারণা হলো—‘সাপ্রেশন অ্যান্ড র্যাডিকালাইজেশন’। অর্থাৎ, যখন মূলধারার রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সীমিত হয়, তখন আদর্শিকভাবে তীক্ষ্ণ বা নীতিগত অবস্থানে অটল দলগুলো তুলনামূলকভাবে লাভবান হতে পারে। কারণ তাদের সমর্থকরা সাধারণত বেশি সংগঠিত এবং উচ্চমাত্রার রাজনৈতিক আনুগত্যে বিশ্বাসী। বাংলাদেশের বাস্তবতায় দীর্ঘ দমন–পীড়নের পরিবেশ এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে আদর্শিক দলগুলো তাদের ঘাঁটি মজবুত করতে পেরেছে।
তবে এটিও সত্য, সব এলাকায় একই চিত্র দেখা যায়নি। বৃহত্তর দিনাজপুর অঞ্চলে জামায়াত একটি আসনও পায়নি, সেখানে বিএনপি একাধিক আসনে জয়ী হয়েছে। এর মানে হলো, উত্থানটি সার্বিক নয়; বরং অঞ্চলভেদে রাজনৈতিক ইতিহাস, সাংগঠনিক শক্তি এবং স্থানীয় ইস্যুর ওপর নির্ভর করেছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে ৭০ আসন একটি প্রতীকী শক্তি—যা দেখায়, দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক দমন একটি বিকল্প শক্তিকে প্রাসঙ্গিক করে তুলতে পারে।
এখানে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাও গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট। তারা সরকার গঠন করতে যাচ্ছে, কিন্তু একই সঙ্গে সংসদে একটি শক্তিশালী আদর্শিক বিরোধী উপস্থিতি তৈরি হয়েছে। ফলে আগামী সংসদে নীতিগত বিতর্ক, সামাজিক প্রশ্ন এবং রাষ্ট্র কাঠামো নিয়ে মতভেদ আরও স্পষ্ট হতে পারে।
রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা যখন দীর্ঘ সময় একপাক্ষিক হয়ে পড়ে, তখন ভোটাররা বিকল্প খোঁজে। কখনো সেই বিকল্প মূলধারার বড় দল, কখনো ছোট কিন্তু আদর্শিকভাবে সুসংহত সংগঠন। বাংলাদেশের এই নির্বাচনে দুটো প্রবণতাই একসঙ্গে দেখা গেছে—একদিকে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা, অন্যদিকে জামায়াতের উল্লেখযোগ্য উত্থান।
৭০টি আসন জয় শুধু সাংগঠনিক সক্ষমতার প্রমাণ নয়; এটি রাজনৈতিক পরিবেশেরও প্রতিফলন। বিরোধী দলকে কর্মসূচি পালনে বাধা, নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধতা, মামলা–হামলা ও গ্রেপ্তার—এসবের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ভোটের বাক্সে গিয়ে ধরা পড়েছে। ভোটারদের একটি অংশ হয়তো মনে করেছে, রাজনৈতিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে শক্তিশালী বিকল্প প্রয়োজন।
রাজনীতিতে প্রতিক্রিয়া কখনো সরলরেখায় চলে না। দমন–পীড়ন দিয়ে স্বল্পমেয়াদে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে তা উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনে জামায়াতের ৭০ আসন জয় সেই উল্টো ফলাফলের একটি উদাহরণ হিসেবে বিশ্লেষিত হচ্ছে।
এখন প্রশ্ন—এই উত্থান কি স্থায়ী হবে, নাকি এটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের প্রতিক্রিয়া? ইতিহাস বলছে, যদি রাজনৈতিক পরিসর উন্মুক্ত থাকে এবং প্রতিযোগিতা স্বাভাবিক হয়, তাহলে ভোটের প্রবণতাও বদলায়। কিন্তু যদি আবারও সংকোচন তৈরি হয়, তাহলে আদর্শিক ও সংগঠিত শক্তিগুলোই তুলনামূলকভাবে সুবিধা পায়।
এই নির্বাচনের ফল তাই কেবল একটি দল কতটি আসন পেল তার হিসাব নয়; এটি রাজনৈতিক পরিবেশ, রাষ্ট্রীয় আচরণ এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের মানদণ্ডেরও মূল্যায়ন। দীর্ঘ ১৫ বছরের দমন–পীড়ন যে একটি আদর্শিক দলকে ৭০ আসনের শক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারে, সেটিই এখন বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত বাস্তবতা।
রাজনীতির মঞ্চে ক্ষমতার পালাবদল ঘটছে। নতুন সরকার গঠনের প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু সংসদের ভেতরে যে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে, তা ভবিষ্যতের রাজনীতিকে ভিন্ন মাত্রা দেবে। দমন–পীড়নের রাজনীতি যে কখনো কখনো বিপরীত শক্তিকে শক্তিশালী করে তোলে, এই নির্বাচন তার একটি স্পষ্ট উদাহরণ হয়ে থাকবে।
আপনার মতামত জানানঃ