ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির মানচিত্রে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ এক গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প–এর নির্দেশে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন এলাকায় সামরিক হামলা, এরপর দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করে নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া—এই ঘটনা শুধু লাতিন আমেরিকায় নয়, গোটা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই অভিযানের পর ভেনেজুয়েলার বিরোধী দলের নেতা ও শান্তিতে নোবেলজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদো প্রকাশ্যে ট্রাম্পের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, এই পদক্ষেপ মানবতার জন্য এক যুগান্তকারী ঘটনা এবং এর মাধ্যমে ট্রাম্প প্রমাণ করেছেন যে তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের যোগ্য।
কারাকাসের আকাশে যখন বিস্ফোরণের শব্দ ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন ভেনেজুয়েলার মানুষের প্রতিক্রিয়া ছিল দ্বিমুখী। একাংশ এটিকে দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসনের অবসান হিসেবে দেখেছে, অন্য অংশ একে দেখেছে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের ওপর নগ্ন আগ্রাসন হিসেবে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার জানিয়েছে, মাদুরো ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে মাদক চোরাচালান ও সন্ত্রাসে জড়িত থাকার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতেই এই অভিযান চালানো হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ প্রশ্ন তুলেছেন—কোনো রাষ্ট্র কি অন্য রাষ্ট্রের ভেতরে সামরিক অভিযান চালিয়ে তার প্রেসিডেন্টকে তুলে নিয়ে যেতে পারে।
এই জটিল বাস্তবতায় মারিয়া কোরিনা মাচাদোর অবস্থান বিশেষভাবে আলোচিত। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী টেলিভিশন চ্যানেল ফক্স নিউজে সাক্ষাৎকার দিয়ে তিনি বলেন, মাদুরো সরকার ভেনেজুয়েলার নির্বাচনী ব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস করেছে, বিরোধী কণ্ঠ রোধ করেছে এবং দেশকে ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকটে ঠেলে দিয়েছে। তাঁর মতে, এই অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ ভেনেজুয়েলার জনগণের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। তিনি বিশ্বাস করেন, এর মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার স্বাধীনতার দ্বার খুলে গেছে এবং খুব শিগগিরই জনগণ নিজেদের ভূমিতে সেই স্বাধীনতা উদ্যাপন করবে।
তবে এই বক্তব্যের বিপরীতে বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনাও উঠেছে। রাশিয়া ও চীন যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযানকে অবৈধ ও গুন্ডামি আখ্যা দিয়েছে। তারা বলছে, এটি আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি ভয়ংকর নজির। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার নীতিকে উপেক্ষা করলে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই অভিযানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছে, যা দেখাচ্ছে বিষয়টি কেবল দ্বিপাক্ষিক সংকট নয়, বরং একটি বৈশ্বিক নৈতিক প্রশ্ন।
মাচাদোর রাজনৈতিক জীবনের দিকে তাকালে তাঁর অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি মাদুরোর সরকারের সবচেয়ে দৃঢ় সমালোচকদের একজন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে তাঁকে প্রার্থী হতে দেওয়া হয়নি, যা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সিদ্ধান্ত। এরপরও তিনি বিরোধী প্রার্থী এদমুন্দো গোনসালেসের পক্ষে সক্রিয়ভাবে প্রচারণা চালান। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর সরকারি হিসাব ও ভোটকেন্দ্রের তথ্যের মধ্যে ব্যাপক গরমিল ধরা পড়ে, যা নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলে। এই পরিস্থিতিতে মাচাদোকে আত্মগোপনে যেতে হয় এবং নিরাপত্তার জন্য তাঁর সন্তানদের বিদেশে পাঠাতে হয়।
২০২৫ সালে ভেনেজুয়েলায় স্বৈরতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে শান্তিপূর্ণ উত্তরণের সংগ্রামে ভূমিকার জন্য তাঁকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। পুরস্কার গ্রহণের জন্য নরওয়ে যাওয়ার সময় তাঁর নাটকীয় যাত্রা—ছদ্মবেশ, একের পর এক সেনা তল্লাশিচৌকি অতিক্রম, উপকূলীয় গ্রাম থেকে নৌযাত্রা—তাঁকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে। এই অভিজ্ঞতা তাঁর দৃষ্টিতে মাদুরো সরকারের চরিত্রকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে তিনি দেখছেন সেই দীর্ঘ সংগ্রামের একটি চূড়ান্ত মোড়।
তবে সমালোচকেরা বলছেন, একজন গণতন্ত্রপন্থী নেতার পক্ষে সামরিক আগ্রাসনকে মানবতার জয় হিসেবে দেখা একটি গভীর নৈতিক প্রশ্নের জন্ম দেয়। তাদের মতে, আজ ভেনেজুয়েলায় যদি এমন অভিযান বৈধ হয়, কাল অন্য দেশেও একই যুক্তি দেখিয়ে শক্তিধর রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করতে পারে। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে সামরিক হস্তক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে আরও অস্থিরতা ও সহিংসতা ডেকে এনেছে।
নিউইয়র্কের আদালতে নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে হাজির করার দৃশ্য বিশ্বজুড়ে প্রচারিত হয়েছে। নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে তাঁদের কপালে আঘাতের চিহ্ন ও ক্লান্ত মুখভঙ্গি অনেকের চোখে শক্তির রাজনীতির প্রতীক হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই ঘটনা ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থকদের কাছে তাঁকে আরও শক্ত অবস্থানে বসিয়েছে। তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে ট্রাম্প বিশ্বে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করছেন। মারিয়া কোরিনা মাচাদোর নোবেল প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্পের জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কারের দাবি সেই সমর্থনকে আরও জোরালো করেছে।
অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলার ভেতরের বাস্তবতা এখনো অনিশ্চিত। অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া দেলসি রদ্রিগেজের ওপর আস্থা নেই বলে প্রকাশ্যে বলেছেন মাচাদো। সাংবাদিক আটক, বিরোধী কণ্ঠে দমন এবং প্রশাসনিক অনিশ্চয়তার কারণে তিনি মনে করেন, প্রকৃত ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ এখনো সুস্পষ্ট নয়। নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকলেও যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন তিনি। তাঁর প্রত্যাবর্তন ভেনেজুয়েলার রাজনীতিতে নতুন সম্ভাবনা নাকি নতুন সংঘাত তৈরি করবে, তা নিয়ে জল্পনা চলছে।
এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ দেখিয়ে দিয়েছে, আধুনিক বিশ্বে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সার্বভৌমত্বের ধারণা কতটা জটিল ও পরস্পরবিরোধী হয়ে উঠেছে। একদিকে একটি দেশের জনগণের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে শক্তিধর রাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ—এই দুই বাস্তবতার মধ্যে সহজ কোনো সমাধান নেই। মাচাদোর চোখে এটি মুক্তির অভিযান, ট্রাম্পের সমর্থকদের চোখে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা, আবার বহু মানুষের কাছে এটি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।
ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ এখন এক গভীর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। মাদুরোর অনুপস্থিতিতে ক্ষমতার শূন্যতা, আন্তর্জাতিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ বিভাজন মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। মারিয়া কোরিনা মাচাদোর মতো নেতাদের ওপর এখন বড় দায়িত্ব—তাঁরা কি সত্যিই একটি শান্তিপূর্ণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতান্ত্রিক ভেনেজুয়েলা গড়ে তুলতে পারবেন, নাকি দেশ আরও অস্থিরতার পথে যাবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও প্রশ্ন থেকে যায়—শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বিশ্বে ন্যায় ও শান্তি প্রতিষ্ঠা আদৌ সম্ভব কি না।
একটি বিষয় স্পষ্ট, ভেনেজুয়েলার এই অধ্যায় কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট নয়; এটি বৈশ্বিক রাজনীতিতে শক্তি, নৈতিকতা ও আইনের সীমা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। মারিয়া কোরিনা মাচাদোর কণ্ঠে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি কৃতজ্ঞতা যেমন ইতিহাসে জায়গা করে নেবে, তেমনি এই অভিযানের বিরুদ্ধে ওঠা প্রতিবাদও ভবিষ্যতের বিশ্ব রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে থাকবে।
আপনার মতামত জানানঃ