মরুভূমির দেশগুলো মানেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে তপ্ত বালি, দিগন্তজোড়া শুষ্কতা আর প্রচণ্ড রোদের ছবি। সৌদি আরব, কাতার কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাত—এই নামগুলোর সঙ্গে ‘বরফ’ শব্দটি সাধারণত যায় না। অথচ সাম্প্রতিক দিনে সেই চিরচেনা ধারণাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে প্রকৃতি। সৌদি আরব ও কাতারের বিভিন্ন এলাকায় বিরল তুষারপাত শুধু স্থানীয় মানুষকেই নয়, গোটা বিশ্বের মানুষকে বিস্মিত করেছে। সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও আর ছবিতে দেখা গেছে—মরুভূমির বুকে সাদা চাদর, পাহাড়চূড়ায় বরফের আস্তরণ, বরফের ওপর দাঁড়িয়ে উটের দল, আবার কোথাও শিশু-কিশোরদের উচ্ছ্বাসে নাচ-গান। এই দৃশ্যগুলো যেন বাস্তব নয়, বরং কোনো কল্পবিজ্ঞানের সিনেমার অংশ।
ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ উঁচুনিচু পাথুরে অঞ্চল ঢেকে গেছে সাদা বরফে। কোথাও রাস্তার দুই পাশে বরফের স্তূপ, কোথাও আবার পাহাড়ের গায়ে ঝুলে থাকা সাদা আস্তরণ। মরুভূমির তপ্ত বালির ওপর অবলীলায় হাঁটা উটগুলো বরফের ওপর থমকে দাঁড়িয়েছে—এই দৃশ্যই বলে দেয়, ঘটনাটি কতটা অস্বাভাবিক। উৎসাহী মানুষ মহাসড়কের পাশে গাড়ি থামিয়ে বরফ ছুঁয়ে দেখছেন, কেউ কেউ পেঁজা তুলার মতো ঝরে পড়া বরফকণায় ‘গা জুড়িয়ে’ নিচ্ছেন। ঐতিহ্যবাহী আরব পোশাকের ওপর জ্যাকেট-জাম্পার পরে তরুণদের নাচের দৃশ্য যেমন আনন্দের, তেমনি বিস্ময়েরও।
এই ঘটনাগুলো ঘটেছে গত ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে। দুবাইভিত্তিক সংবাদমাধ্যম খালিজ টাইমস একে শিরোনাম করেছিল—‘মরুভূমিতে বরফ?’। সৌদি আরব ও কাতার, দুই দেশই ওই সময় দুর্লভ এক শীতল অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়। সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে, বিশেষ করে মিশরের সিনাই ও জর্ডান সীমান্তসংলগ্ন জাবাল আল লাউজ এলাকায় তুষারপাত উপভোগ করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বহু মানুষ দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসেন এই অপ্রত্যাশিত দৃশ্য দেখতে। বরফ উদযাপনের সেই মুহূর্তগুলো সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই বিষয়টি বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে আসে।
কাতারের ক্ষেত্রেও অভিজ্ঞতাটি ছিল প্রায় একই রকম বিস্ময়কর। তিন দিকে পানিবেষ্টিত, বালুময় এই ছোট কিন্তু তেলসমৃদ্ধ দেশটিতে তুষারপাত কার্যত অকল্পনীয়। অথচ আকাশে কালো মেঘ, নিচে ধূসর ভূমি আর তার ওপর সাদা বরফের আস্তরণ—এই দৃশ্য কাতারবাসীকে অবাক করে দেয়। অনেকেই জীবনে প্রথমবার বরফ দেখার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন নিজেদের দেশেই। মরুভূমির দেশ যে এমন দৃশ্যও উপহার দিতে পারে, তা কল্পনাতেও ছিল না।
রিয়াদভিত্তিক সংবাদমাধ্যম অ্যারাব নিউজ জানায়, ১৭ ও ১৮ ডিসেম্বর সৌদি আরবের একাধিক অঞ্চলে ভারী তুষারপাত হয়েছে। মধ্যাঞ্চলের আল-মাজমাহ ও আল-ঘাট এলাকাতেও মানুষ জড়ো হয়েছিল এই বিরল দৃশ্য দেখতে। সৌদি আরবের জাতীয় আবহাওয়া কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, রিয়াদ অঞ্চলের উত্তরের পাহাড়ি ও সমতল এলাকাগুলোতে সকালের দিকে তুষারপাত লক্ষ্য করা যায়। পাহাড়ের চূড়াগুলো বরফে ঢেকে গিয়ে মরুভূমির মাঝে একেবারে নতুন এক প্রাকৃতিক দৃশ্যপট তৈরি করে।
এই ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—এ কি জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি ফল? কেউ কেউ আরও এক ধাপ এগিয়ে বলছেন, ‘বরফ যুগ’ কি তবে শুরু হয়ে গেল? যদিও বিশেষজ্ঞরা বিষয়টি নিয়ে কিছুটা সংযত। গালফ নিউজের বরাতে করাচিভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডন জানিয়েছে, সৌদি আরবের শীর্ষ জ্যোতির্বিদ মোহাম্মদ বিন রেদ্দাহ আল থাকাফির মতে শীতকালে তুষারপাত পুরোপুরি অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে সৌদি আরবের উত্তরাঞ্চলে মাঝেমধ্যেই এমন ঘটনা ঘটে। তবে তা নিয়মিত নয় এবং নির্ভর করে আবহাওয়া ও জলবায়ুর সাময়িক তারতম্যের ওপর।
সৌদি আবহাওয়া কেন্দ্রও জানাচ্ছে, সাধারণত ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে সৌদি আরবের কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলে তুষারপাতের সম্ভাবনা থাকে। ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ুর প্রভাব রয়েছে এমন তাবুক, আল-জওফ ও আরার অঞ্চলে এই সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি। কিন্তু সেখানেও প্রতিবছর নিয়ম করে বরফ পড়ে না। অর্থাৎ, এটি বিরল হলেও পুরোপুরি নজিরবিহীন নয়। তাই ‘বরফ যুগ’ শুরু হয়ে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে এখনই সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবু এই তুষারপাতের প্রভাব সীমাবদ্ধ থাকেনি সৌদি আরব ও কাতারে। প্রতিবেশী সংযুক্ত আরব আমিরাতেও এই দৃশ্য নিয়ে কৌতূহল ছড়িয়েছে। সৌদি আরব ও কাতারে বরফ পড়ার ভিডিও দেখে অনেক আমিরাতির মনে প্রশ্ন জেগেছে—তাদের দেশেও কি কোনো একদিন তুষারপাত হতে পারে? ওই সময় আমিরাতেও আবহাওয়া ছিল অস্থির। বজ্রসহ ভারী বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি আর ঝোড়ো হাওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছিল দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে।
খালিজ টাইমস এর আগেও এই প্রশ্ন তুলেছিল—আমিরাতে তুষারপাত কি আদৌ সম্ভব? সৌদি আরবের সাম্প্রতিক তুষারপাত সেই প্রশ্নকে নতুন করে উসকে দিয়েছে। সৌদি আবহাওয়া কেন্দ্রের কর্মকর্তা ড. আহমেদ হাবিব বলেন, তুষারপাতের জন্য বায়ুমণ্ডলে কিছু নির্দিষ্ট শর্ত প্রয়োজন—বিশেষ করে ভৌগোলিক উচ্চতা এবং হঠাৎ তাপমাত্রা কমে যাওয়া। তাঁর মতে, আমিরাতে এই শর্তগুলো পূরণ হওয়া তুলনামূলক কঠিন। সেখানে শিলাবৃষ্টির সম্ভাবনাই বেশি।
তবু বাস্তবতা হলো, সাম্প্রতিক শীতে আমিরাতের কিছু এলাকায় তাপমাত্রা শূন্যের কাছাকাছি নেমে গিয়েছিল। আল আইন ও রাস আল খাইমাহর পাহাড়ি অঞ্চলে অনেক মানুষ বরফের মতো বস্তু দেখেছেন। সেগুলো পুরোপুরি তুষার না হলেও বালুভূমি শিলায় ঢেকে গিয়ে দূর থেকে বরফে ঢাকা মনে হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা আমিরাতিদের মনে ‘বরফ পড়ার’ অনুভূতি তৈরি করেছে।
ইতিহাস বলছে, আরব আমিরাতেও একেবারে তুষারপাত হয়নি—এমন নয়। ২০০৪ ও ২০০৯ সালে রাস আল খাইমাহর জাবাল জাইস এলাকায় তুষারপাত হয়েছিল। ২০০৯ সালের ঘটনাটি ছিল তুলনামূলক বেশি তীব্র এবং কয়েক দিন স্থায়ী। এমনকি ২০২০ সালেও জাবাল জাইসে তুষারপাতের খবর পাওয়া যায়। অর্থাৎ, আরব উপদ্বীপে তুষারপাত একেবারে অসম্ভব কিছু নয়, বরং অত্যন্ত বিরল।
এই প্রেক্ষাপটে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। আরব অঞ্চল মানেই যেখানে প্রচণ্ড তাপমাত্রা ও পানির সংকট—সেখানে এখন বৃষ্টি ও বন্যা প্রায় নিয়মিত দুর্যোগ হয়ে উঠেছে। এর সঙ্গে যদি তুষারপাতও যোগ হয়, তাহলে জলবায়ুর আচরণ যে ক্রমেই আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে, তা বলাই বাহুল্য। আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংস্থাগুলো বলছে, ভবিষ্যতে আরব অঞ্চলের গড় তাপমাত্রা আরও বাড়বে। তারা তুষারপাতের কোনো দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস দিচ্ছে না। কিন্তু একই সঙ্গে স্বীকার করছে—জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আবহাওয়ার আচরণ আগের মতো স্থির নেই।
এই অনিশ্চয়তাই মানুষকে ভাবাচ্ছে। মরুভূমির দেশে বরফ পড়া একদিকে যেমন আনন্দ ও কৌতূহল জাগায়, অন্যদিকে তেমনি ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগও বাড়ায়। প্রকৃতি যেন বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে—সে কোনো নির্দিষ্ট ছকে চলে না। তপ্ত বালির দেশেও হঠাৎ নেমে আসতে পারে সাদা বরফের চাদর। এই দৃশ্য হয়তো ক্ষণস্থায়ী, হয়তো আবার বহু বছর দেখা যাবে না। কিন্তু এটি নিশ্চিতভাবেই জলবায়ু পরিবর্তনের আলোচনায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সৌদি আরব ও কাতারের এই তুষারপাত তাই শুধু একটি আবহাওয়াজনিত ঘটনা নয়। এটি আমাদের সময়ের প্রতিচ্ছবি—যেখানে চরম উষ্ণতা আর অপ্রত্যাশিত শীত একই সঙ্গে উপস্থিত হতে পারে। ‘বরফ যুগ’ শুরু হয়েছে কি না, সেই বিতর্কে না গিয়েও বলা যায়, প্রকৃতি তার ভাষায় মানুষকে সতর্ক করছে। আর সেই সতর্কবার্তা মরুভূমির বুকে সাদা বরফ হয়ে নেমে এসেছে, বিস্ময় আর প্রশ্ন দুটোই রেখে গেছে মানুষের মনে।
আপনার মতামত জানানঃ