পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় ও নির্জন ভূখণ্ড অ্যান্টার্কটিকা বরাবরই বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু। সাদা বরফে ঢাকা এই মহাদেশকে আমরা সাধারণত চরম শীত, প্রাণহীনতা ও অনন্ত নীরবতার প্রতীক হিসেবেই কল্পনা করি। কিন্তু সাম্প্রতিক এক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার সেই চিরচেনা ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে। প্রায় চার হাজার ফুট পুরু বরফের নিচে হাজার হাজার বছর আগের নদী ও ঘন জঙ্গলের অস্তিত্বের প্রমাণ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এই আবিষ্কার শুধু চাঞ্চল্যকরই নয়, বরং পৃথিবীর জলবায়ু ইতিহাস, ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন এবং ভবিষ্যৎ জলবায়ু ঝুঁকি বোঝার ক্ষেত্রে এক নতুন জানালা খুলে দিয়েছে।
এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন যুক্তরাজ্যের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়-এর একদল গবেষক। তাঁরা সরাসরি বরফ খুঁড়ে নিচে নামেননি; বরং আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে পাওয়া রাডার ও ভূ-তাত্ত্বিক তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। সেই তথ্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তারা দেখতে পান, অ্যান্টার্কটিকার একটি বিশাল অংশের নিচে এমন ভৌগোলিক গঠন রয়েছে, যা কোনোভাবেই কেবল বরফের চলাচলে তৈরি হওয়া সম্ভব নয়। বরং এগুলো নদীর ক্ষয়, প্রবাহ ও বনভূমির ভূমিরূপের সঙ্গে বিস্ময়করভাবে মিলে যায়।
বিজ্ঞানীদের ধারণা অনুযায়ী, প্রায় ৩ কোটি ৪০ লক্ষ বছর আগে অ্যান্টার্কটিকা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পৃথিবী। আজ যেখানে তাপমাত্রা মাইনাস কয়েক দশক ডিগ্রিতে নেমে যায়, সেখানে একসময় ছিল উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া। নদী প্রবাহিত হতো বিস্তীর্ণ সমতল ও পাহাড়ি অঞ্চল পেরিয়ে, আর সেই নদীর দুই তীরে গড়ে উঠেছিল ঘন বনাঞ্চল। সেই বন হয়তো আজকের অ্যামাজনের মতো নয়, কিন্তু তৎকালীন পৃথিবীর জন্য তা ছিল এক সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের আধার।
এই পরিবর্তনের পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছিল পৃথিবীর মহাদেশগুলোর চলাচল। একসময় অ্যান্টার্কটিকা ছিল প্রাচীন সুপারমহাদেশ গন্ডোয়ানার অংশ। আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও অ্যান্টার্কটিকা তখন একসঙ্গে যুক্ত ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই মহাদেশগুলো আলাদা হতে শুরু করে। গন্ডোয়ানার ভাঙনের ফলে অ্যান্টার্কটিকা ধীরে ধীরে দক্ষিণ মেরুর দিকে সরে যায়। এর ফলেই শুরু হয় জলবায়ুর নাটকীয় পরিবর্তন। উষ্ণ আবহাওয়া ঠান্ডা হতে থাকে, বৃষ্টির জায়গা নেয় তুষারপাত, আর নদী ও বনভূমির ওপর ধীরে ধীরে জমতে থাকে বরফের চাদর।
গবেষকদের মতে, প্রায় ২ কোটি বছর আগে থেকে অ্যান্টার্কটিকায় স্থায়ী হিমবাহ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। বরফের স্তর ধীরে ধীরে পুরু হতে থাকে এবং একসময় সেই প্রাচীন নদী ও জঙ্গল সম্পূর্ণভাবে ঢেকে যায়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, বরফের এই স্তর এতটাই স্থিতিশীল ও ধীরগতির ছিল যে নিচের ভূপ্রকৃতি প্রায় অক্ষত অবস্থায় রয়ে গেছে। সাধারণত নদী বা বনভূমির চিহ্ন সময়ের সঙ্গে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, কিন্তু এখানে বরফই যেন এক প্রাকৃতিক সংরক্ষণাগার হিসেবে কাজ করেছে।
বর্তমানে বিজ্ঞানীরা বলছেন, বরফের নিচে প্রায় ৩ হাজার ৯০০ ফুট গভীরে সেই প্রাচীন ভূদৃশ্য এখনো শনাক্তযোগ্য। উপগ্রহচিত্রে দেখা যাচ্ছে, সেখানে সুস্পষ্ট নদীপথের মতো বাঁক, উপত্যকা এবং উঁচু-নিচু ভূমির গঠন। এগুলো কেবল বরফের চাপ বা গতির ফলে তৈরি হয়নি; বরং দীর্ঘ সময় ধরে প্রবাহিত পানির ক্ষয়েরই স্পষ্ট প্রমাণ বহন করে।
এই আবিষ্কারের গুরুত্ব এখানেই শেষ নয়। অ্যান্টার্কটিকার অতীত জলবায়ু বোঝা মানে পৃথিবীর সামগ্রিক জলবায়ু ব্যবস্থাকে আরও গভীরভাবে বোঝা। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই জানার চেষ্টা করছেন—কখন, কীভাবে এবং কেন অ্যান্টার্কটিকা বরফে ঢাকা পড়ল। কারণ এই পরিবর্তনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, বৈশ্বিক তাপমাত্রা এবং বর্তমান জলবায়ু সংকটের শিকড়।
যখন বিজ্ঞানীরা বলেন, একসময় অ্যান্টার্কটিকায় বন ছিল, তখন সেটি নিছক কল্পকাহিনি নয়; বরং শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক বাস্তবতা। সেই বনাঞ্চল ছিল কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণের বড় উৎস। বন হারিয়ে যাওয়ার অর্থ হলো বায়ুমণ্ডলে কার্বনের ভারসাম্য বদলে যাওয়া। সেই পরিবর্তনই হয়তো পৃথিবীর শীতল হওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।
আজকের দিনে এই আবিষ্কার নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে—বর্তমান বৈশ্বিক উষ্ণায়ন যদি নিয়ন্ত্রণে না আনা যায়, তাহলে ভবিষ্যতে কী হতে পারে? যদি কোটি কোটি বছর আগে একটি উষ্ণ মহাদেশ বরফে ঢাকা পড়তে পারে, তাহলে বিপরীত প্রক্রিয়ায় কি বরফে ঢাকা অঞ্চল আবার উষ্ণ হয়ে উঠতে পারে না? বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এই ধরনের গবেষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকটি দিক হলো, বরফের নিচে লুকিয়ে থাকা এই নদী ও বনভূমি ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য এক বিশাল ভাণ্ডার। সেখানে জমে থাকা মাটি, পাথর ও জীবাশ্ম বিশ্লেষণ করে জানা যেতে পারে প্রাচীন উদ্ভিদ ও প্রাণীর বিবর্তনের ইতিহাস। এমনকি সেখানকার কার্বন ও রাসায়নিক উপাদান বিশ্লেষণ করে বোঝা সম্ভব, সেই সময়ের বায়ুমণ্ডল কেমন ছিল।
এই গবেষণা প্রমাণ করে, আধুনিক বিজ্ঞান কেবল বর্তমান বা ভবিষ্যৎ নিয়েই নয়, অতীতের গভীরতম স্তরেও চোখ রাখতে সক্ষম। কৃত্রিম উপগ্রহ, রাডার প্রযুক্তি ও ডেটা বিশ্লেষণের সমন্বয়ে এমন সব জায়গার রহস্য উন্মোচিত হচ্ছে, যেখানে মানুষের পা পড়ার সম্ভাবনাই নেই। অ্যান্টার্কটিকার বরফের নিচে লুকিয়ে থাকা এই জঙ্গল তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
সাধারণ মানুষের কাছে এই খবর রোমাঞ্চকর গল্পের মতো শোনালেও, বিজ্ঞানীদের কাছে এটি একটি সতর্কবার্তা। পৃথিবীর জলবায়ু কখনোই স্থির ছিল না। এটি বদলেছে, বদলাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও বদলাবে। প্রশ্ন হলো, আমরা সেই পরিবর্তনের সঙ্গে কতটা মানিয়ে নিতে পারব, আর কতটা ক্ষতির মুখে পড়ব।
সবশেষে বলা যায়, বরফের প্রায় চার হাজার ফুট নিচে জঙ্গলের অস্তিত্বের সন্ধান আমাদের মনে করিয়ে দেয়—পৃথিবী তার ইতিহাস গোপন করে রাখে গভীর স্তরে, আর বিজ্ঞান সেই ইতিহাস ধীরে ধীরে উন্মোচন করে। অ্যান্টার্কটিকার সাদা নীরবতার নিচে লুকিয়ে থাকা সবুজ অতীত শুধু বিস্ময় জাগায় না, বরং আমাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আরও দায়িত্বশীল ও সচেতন হওয়ার আহ্বানও জানায়।
আপনার মতামত জানানঃ