ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে কয়েকজন শিশু ও কিশোরকে প্রকাশ্যে কান ধরে ওঠবস করানোর দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে শিশু নিপীড়নের প্রশ্ন। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে, যেখানে মানবিক মূল্যবোধ, যুক্তিবোধ ও গণতান্ত্রিক চর্চার কথা সবচেয়ে বেশি বলা হয়, সেখানে হাতে লাঠি নিয়ে শিশুদের ভয় দেখিয়ে শাস্তি দেওয়ার ঘটনা অনেককেই বিস্মিত করেছে। সমালোচনার মুখে ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য সর্বমিত্র চাকমা দায় স্বীকার করে পদত্যাগের ঘোষণা দিলেও মূল প্রশ্নটি থেকেই গেছে—এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটছে কেন, আর কেনই বা শিশু নিপীড়ন থামানো যাচ্ছে না।
এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ঢাকার নয়াপল্টনে একটি স্কুলে শিশুকে নির্মমভাবে নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হয়। স্কুলের ভেতরে একজন শিশুকে চড় মারা, গলা চেপে ধরা, মুখ চেপে রাখা এবং স্ট্যাপলার দিয়ে ভয় দেখানোর দৃশ্য দেশবাসীকে নাড়িয়ে দেয়। পরে জানা যায়, ওই নারী স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক এবং পুরুষ ব্যক্তি তাঁর স্বামী ও স্কুলের ব্যবস্থাপক। মামলার পর একজন কারাগারে গেলেও প্রশ্ন থেকে যায়—এ ধরনের নির্যাতন কি হঠাৎ ঘটে যাওয়া বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি এর পেছনে আছে দীর্ঘদিনের অবহেলা, সামাজিক স্বীকৃতি আর রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা?
শিশু নিপীড়নের এই দুই ঘটনা আলাদা প্রেক্ষাপটে ঘটলেও ভেতরের বাস্তবতা প্রায় একই। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠ, অন্যটি একটি স্কুল—দুটি ক্ষেত্রেই শিশুদের শাসনের নামে অপমান, ভয় ও শারীরিক নির্যাতনকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট। অনেকেই এসব ঘটনায় মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, ‘শাসন না করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে না’, ‘এভাবে ছাড়া মাঠ বা স্কুল নিরাপদ রাখা যায় না’। এই মানসিকতাই শিশু নিপীড়নের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক, যেখানে নির্যাতনকে দায়িত্ব, শাসন কিংবা নিরাপত্তার মোড়কে বৈধতা দেওয়া হয়।
আইন অনুযায়ী এই ধরনের শাস্তি স্পষ্টতই অপরাধ। শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী ১৮ বছরের নিচে সবাই শিশু এবং শিশুর প্রতি যেকোনো ধরনের শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন শাস্তিযোগ্য। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০১১ সালেই দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্পোরাল পানিশমেন্ট নিষিদ্ধ করেছে। জাতীয় শিশু নীতিতে শিশুর মর্যাদা, সুরক্ষা ও বিকাশের কথা বলা আছে। বাংলাদেশ জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষর করে আন্তর্জাতিকভাবেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এত নীতি, এত আইন থাকার পরও বাস্তবে কেন শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে না—এই প্রশ্নটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা কর্মী ও আইনজীবীরা বলছেন, সমস্যাটা আইনের অভাবে নয়, সমস্যাটা হলো কার্যকর কাঠামোর অনুপস্থিতি। আইন আছে, কিন্তু আইন মানা হচ্ছে কি না তা দেখার কোনো শক্ত মনিটরিং ব্যবস্থা নেই। পরিবার, স্কুল, খেলার মাঠ কিংবা সমাজের অন্য কোনো জায়গায় শিশুর ওপর নির্যাতন হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার মতো কার্যকর ও সহজলভ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে নির্যাতন অনেক সময় স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবেই থেকে যায়, বড় কোনো ভিডিও বা আলোচনার জন্ম না দিলে তা আইনের আওতায়ই আসে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠের ঘটনাতেই বিষয়টি স্পষ্ট। প্রকাশ্যে শিশুদের কান ধরে ওঠবস করানো হলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কী আইনি বা শৃঙ্খলাভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বরং দায়িত্বের সীমানা, প্রশাসনিক জটিলতা আর অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়েছে। অথচ প্রশ্ন হলো—শিশুদের অপমান ও ভয় দেখানো যখন প্রকাশ্যে ঘটছে, তখন ভুক্তভোগী বা অভিভাবকের অভিযোগের অপেক্ষায় থাকা কি নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য?
এই ধরনের ঘটনার পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো সমাজে শাসন ও নির্যাতনের মধ্যকার পার্থক্য না বোঝা। বহু পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো মনে করা হয়, কড়া শাসন মানেই ভালো শাসন। শিশুকে ভয় দেখানো, মারধর করা বা অপমান করাকে ‘শিক্ষার অংশ’ হিসেবে বৈধতা দেওয়া হয়। এই মানসিকতা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। ফলে যারা বড় হয়ে ক্ষমতা বা কর্তৃত্বের জায়গায় পৌঁছায়, তারাও একই আচরণকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়।
শিশুদের নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, এই সমস্যার শিকড় পরিবার থেকেই শুরু হয়। পরিবারে শিশুর কথা শোনা হয় না, তার মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মা নিজেরাই শারীরিক বা মানসিক শাস্তিকে শাসন বলে মনে করেন। স্কুলে গিয়ে সেই শিশুই আবার একই ধরনের আচরণের শিকার হয়। এরপর খেলার মাঠ, কোচিং সেন্টার বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে একই চর্চা চলতে থাকে। পুরো ব্যবস্থাটাই যেন শিশুর বিরুদ্ধে নীরব সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে তুলেছে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব। আইনজীবীরা বলছেন, শিশু নির্যাতনের ঘটনায় খুব কম ক্ষেত্রেই কঠোর ও দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত হয়। অনেক মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, আবার অনেক অভিযুক্ত আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে আসে। ফলে সমাজে একটি বার্তা যায়—এই ধরনের অপরাধ করেও পার পাওয়া যায়। এই দায়মুক্তির সংস্কৃতিই নির্যাতনকে আরও উৎসাহিত করে।
নয়াপল্টনের স্কুলের ঘটনায় একজন অভিযুক্ত গ্রেপ্তার হলেও বাস্তবে দেশের অসংখ্য স্কুল, মাদ্রাসা ও কোচিং সেন্টারে শিশুদের ওপর কী ধরনের আচরণ চলছে, তার সঠিক চিত্র খুব কমই সামনে আসে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অভিভাবকরা ভয়, সামাজিক চাপ বা সম্মানের কথা ভেবে অভিযোগ করতে চান না। অনেক সময় শিশুরাও ভয় পায় বা বুঝতেই পারে না যে তাদের সঙ্গে যা হচ্ছে, তা অপরাধ।
শিশুদের সুরক্ষার দায়িত্ব কেবল একটি মন্ত্রণালয় বা একটি প্রতিষ্ঠানের নয়। এটি একটি সমন্বিত রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবে শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী—সবার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট। কে কোথায় দায়িত্ব নেবে, কোথায় অভিযোগ যাবে, কীভাবে দ্রুত ব্যবস্থা হবে—এই প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট উত্তর নেই সাধারণ মানুষের কাছে।
শিশু অধিকারকর্মীরা সতর্ক করে বলছেন, শিশু নির্যাতনের এই ধারাবাহিকতা যদি এখনই থামানো না যায়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মানসিকভাবে বিকলাঙ্গ হয়ে বেড়ে উঠবে। নির্যাতনের শিকার শিশুরা বড় হয়ে নিজেরাও সহিংস আচরণে অভ্যস্ত হতে পারে, সমাজে সহনশীলতা কমে যেতে পারে। একটি জাতির ভবিষ্যৎ তখনই বিপন্ন হয়, যখন তার শিশুরা নিরাপদ নয়।
এই বাস্তবতায় সবচেয়ে জরুরি হলো শিশুদের মানুষ হিসেবে দেখা, কেবল নিয়ন্ত্রণযোগ্য বস্তু হিসেবে নয়। তাদের ভুল হবে, তারা শিখবে—এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে ভয় ও শাস্তির মাধ্যমে দমন না করে সহমর্মিতা ও যুক্তির মাধ্যমে পরিচালনা করাই সভ্য সমাজের পরিচয়। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজে এই মানসিক পরিবর্তন না এলে শিশু নিপীড়ন বন্ধ করা সম্ভব নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠ কিংবা নয়াপল্টনের স্কুলের ঘটনা আমাদের সামনে একটাই প্রশ্ন রেখে যায়—শিশুদের জন্য আমরা আসলে কেমন সমাজ তৈরি করছি? যেখানে শাসনের নামে অপমান স্বাভাবিক, নাকি যেখানে শিশুর মর্যাদা ও নিরাপত্তা অগ্রাধিকার পায়? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু আইন দিয়ে নয়, আমাদের সম্মিলিত বিবেক দিয়েই দিতে হবে।
আপনার মতামত জানানঃ